তাঁরা কেউই ‘এক-অন্নে’ দিনযাপন করেননি ঠিকই, তবু বরাবর ‘সংসার’ বা ‘পরিবার’ বলতেই পছন্দ করেছেন দলনেত্রী। সেই পরিবারই কখন যেন ‘পরিবারতন্ত্রে’র তকমা দিয়ে দিয়েছে। বাসনের ঠোকাঠুকি আগেও ছিল, তবে যাঁর গুণে সংসার ‘সুখের’ ছিল, তাঁর অলক্ষ্যেই কখন যেন বাঁধন আলগা হয়েছে। ঝড়ের ঝাপটায় সব ভেঙে তছনছ। যৌথ পরিবারে সম্পর্কের ভাঙা-গড়ার গল্প তো সিরিয়ালের চিত্রনাট্য়েই জায়গা পায়, কিন্তু এই গল্প চেনা-ছকের বাইরে। কেউ ‘ভাই’, কেউ ‘বোন’, কেউ ‘বন্ধু’! সবই এখন অতীত। আবার কোনও কোনও ‘দুঃসম্পর্কে’ কমছে দূরত্ব। ৪ মে-র পর যে সব সম্পর্ক রাতারাতি বদলে গেল!
মমতা-ফিরহাদ
দলে মুকুল-শোভন-পার্থ ‘অতীত’ হয়ে যাওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের পাশে প্রথম সারিতেই থাকতেন ফিরহাদ হাকিম। ববির পুজোয় উদ্বোধনে মমতা, ববির সঙ্গে ইফতারের অনুষ্ঠানে মমতা। ২৬-এর নির্বাচনে নিজের কেন্দ্র ছেড়ে ভবানীপুরে পড়ে থেকে মমতার কাজ করছেন ববিই। যেন আপন দিদি। প্রাক্তন ‘মেয়র’ বলতেন, ‘মমতাদি আমায় সব দিয়েছেন। যা হয়েছি, সবই মমতাদির জন্য।’ ৪ মে। মমতার হয়ে গলা ফাটালেন তাঁর এজেন্ট, ফিরহাদের মেয়ে প্রিয়দর্শিনী। তারপর সব চুপচাপ। ঠিক ৪ দিন পর সেই প্রিয়দর্শিনী লিখলেন ‘চোখে ঠুলি বেঁধে থেকো না’। তারপর ‘দিদি’কে না বলেই নবান্নের মিটিং-এ ববি। পুরনিগমে শুভেন্দুর অনুষ্ঠানে ববি, বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরে ববি। শেষ পর্যন্ত মমতাকে বাদ দিয়ে তৈরি হওয়া তৃণমূলের পদে ববি।
মহুয়া-কল্যাণ
অগস্ট, ২০২৫। মুখ ঘুরিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গটগট করে হেঁটে যাচ্ছেন মহুয়া মৈত্র। ‘দিনটাই খারাপ যাবে’ বলে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় যে ‘এক্সপ্রেশন’ দিয়েছিলেন, তা ভোলার নয়। আয়োজন করে সাংবাদিকদের ডেকে বলেছিলেন, “ভালো ভালো শাড়ি পরলেই তো আর বড় কেউ হওয়া যায় না।” ‘ইংরেজি বলা-সুন্দরী’ (কল্যাণের কথায়) সাংসদ যাঁকে একসময় ‘নারীবিদ্বেষী’ বলেছিলেন, ৪ মে-র পর আজ তাঁকেই বলছেন, ‘কল্যাণদা খুব ইমোশনাল’। আজ মহুয়া-কল্যাণের সুর একই, স্বর একই, গাড়ি একই। সব বাঁধন যখন আলগা হচ্ছে, দুই সাংসদের বাঁধন তখন বেশ পোক্ত।

‘মহারাষ্ট্রে যা হয়েছে, বাংলায় তা হবে না। আমাদের নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়, আমাদের নেতার নাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।’ বক্তা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘কে অভিষেক, যাকে চোরপিটুনি দিয়েছে? নেক্সট কোয়েশ্চন।’ এবারও বক্তা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।’ তাই সম্পর্কটা কী ছিল আর কী হল, তা নিয়ে আলাদা করে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা নিষ্প্রয়োজন। যাঁকে কথায় কথায় যোগ্য সেনাপতি বলতেন, তাঁকেই এখন ‘চার্টার্ড অভিষেক’ বলে ডাকেন।
মমতা ও দেব- (ফাইল ছবি)
‘ভাইয়ের আব্দার’ ফেলতে পারতেন না মমতা। ‘দিদির অনুরোধ’ মাথায় করে নিতেন দেবও। একসময় ‘সন্ন্যাস’ নিতে চাওয়া দেব-কে রাজনীতির মঞ্চে ফিরিয়ে এনেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানে নাকি দেবের আব্দারেই টাকা দিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। এই তো গত জানুয়ারি মাসেই মাস্টারপ্ল্যানের উদ্বোধনে দেব গদগদ হয়ে ধন্যবাদ জানালেন। মাঝে একটা ৪ মে-র তফাৎ। ফলাও করে ‘আজীবন দিদির সঙ্গে থাকব’ বলার আগেই তিনি সইটা করে ফেলেছেন। চিঠিতে দেবের নামটা জ্বলজ্বল করছে দেখে কেউ কেউ বলছেন, দেব অভিনয়টা বেশিই সিরিয়াসলি নিয়েছেন!
একজন অভিজ্ঞ, একজন আনকোরা। একজন কর্পোরেট দুনিয়া থেকে রাজনীতির দুনিয়ায়, একজন অভিনয় ছেড়ে সংসদে। দুজনের পরণে টানটান শাড়ি, খোঁপা, সংসদে ঝাঁঝালো বক্তব্য। যেন ‘ছায়া’ হয়ে উঠেছিলেন সায়নী ঘোষ। সোশ্যাল মিডিয়ায় দুজনের ভূরি ভূরি ছবি। সংসদে একসঙ্গে, প্রচারে একসঙ্গে দেখা যেত তাঁদের। বয়সে ও অভিজ্ঞতায় ছোট সায়নীর উপর অগাধ বিশ্বাস ছিল মহুয়া মৈত্রের। ৪ মে-র পরও সুতোটা পোক্তই ছিল। তাল কাটল কী করে! হঠাৎ শাড়ি উধাও, খোঁপা উধাও। সায়নীও দিনকয়েকের জন্য ‘উধাও’! সই-সাবুদ করে তারপর মাস্ক খুলে ক্যামেরার সামনে এলেন। ‘সন্তানের মতো’, ‘বোনের মতো’ সায়নী ঘোষের এহেন আচরণে ‘আঘাত’ পেয়েছেন মহুয়া।

ছন্দে ছন্দে রং বদলাচ্ছে। ৪ মে-র আগে- হুগলির সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অসিত মজুমদারের তুমুল ঝামেলা। বিধায়ক-সাংসদের মধ্যে ঝামেলা যে খুব একটা ভালো ছবি তৈরি করছিল না, তা টের পেয়েই ছুটে যেতে হয়েছিল কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তারপর ভোট-রেজাল্ট। বদলে গেল ছবি। অসিত মজুমদারকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর হুগলিতে ছুটে গিয়েছিলেন রচনা। আবার সেই রচনা এখন অন্য শিবিরে।
মমতা ও কাজরী
বছর কয়েক পিছিয়ে যাই। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের কেউ ভোটে লড়েননি। সেই পরিবারের সদস্যা তথা মমতার ভ্রাতৃবধূ কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায় পুরভোটে টিকিট পান। তারপর থেকে মমতার বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা যেত কাজরীকে। ভোটে ভবানীপুরে মমতার এজেন্ট ছিলেন কাজরী। ভোট আবহে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নে বারবার এগিয়ে এসেছেন কাজরী। ৪ মে পেরতেই বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের পরিবারেও ভাঙন! শুভেন্দু অধিকারীর সভায় হাজির কাজরী। হাসিমুখে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসায় কাজরী। সত্যিই সংসার বড়ই বিচিত্র।
অনুব্রত-শতাব্দী
মমতার সেই মন্তব্য মনে পড়ে? ‘কেষ্টকে সঙ্গে শতাব্দীকে লাগিয়ে দিচ্ছে’। হ্যাঁ ঝামেলা আদতে লেগেই থাকত। রাঙামাটির জেলায় একে অপরের দিক থেকে একরকম মুখ ঘুরিয়ে রেখেই রাজনীতি করেছেন তাঁরা। পরে জেল ফেরত কেষ্টর সক্রিয়তা কমেছে। তবে পালাবদলের পর সেই কেষ্ট-শতাব্দীর গলায় একই সুর! শতাব্দী যখন বাড়িতে বৈঠক বসাচ্ছেন, এনডিএ-কে সমর্থনের তোড়জোড় করছেন, কথায় কথায় মমতা-অভিষেকের খুঁত ধরছেন, ওদিকে, তখন কেষ্টও বলেন, ‘জেগে ঘুমোলে দলের এই হালই হবে।’
মমতা-রচনা
রচনার হাত ধরে নাচলেন মমতা, মঞ্চে দাঁড়িয়ে রুটি বেললেন মমতা। হু হু করে বাড়ল শো-এর টিআরপি। ‘দিদির কাছে আমি কৃতজ্ঞ’ গদগদ হয়ে বলে ফেললেন ‘দিদি নম্বর ওয়ান।’ তারপর মিলল টিকিট, চোখে শিল্পোন্নয়নের ধোঁয়া দেখে রাজনীতিতে পা রাখলেন রচনা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। ৪ মে পর্যন্ত রচনার অবস্থান এটাই। কিন্তু ৪ মে-র পর আরও বড় ‘রাজনীতিক’ হয়ে উঠলেন অভিনেত্রী রচনা। সংবাদমাধ্যমের সামনে বুঝিয়ে দিলেন, মমতার আমলে তিনি কোনও কাজই করতে পারেননি। আপাতত রচনা দিদি-তেও নেই, দিদি নম্বর ওয়ানেও নেই।
কাকলি-মমতা
যে সম্পর্কের কথা না বললে এই তালিকা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিজে মুখেই বলেছেন, সেই ১৯৮৪ সাল থেকে আলাপ। একসময় অসুস্থ মমতার পাশে রাত জেগেছেন তিনি, চিকিৎসা করেছেন তাঁর স্বামী। মমতাও বারবার বারাসতের টিকিট দিয়েছেন কাকলিকে। পরপর দুবার বিধানসভা ভোটের টিকিট দিয়েছেন কাকলির স্বামী, চিকিৎসক সুদর্শন ঘোষ দস্তিদারকে। প্রথমবারেই মন্ত্রিসভায় জায়গাও দিয়েছিলেন সুদর্শনকে। ৪ মে-র পর ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে হাঁটলেন সেই কাকলি। দূরত্ব এত বাড়ল যে মমতার দেওয়া উপহার ফেরত দিতে সোজা কালীঘাটে হাজির হলেন কাকলি-পুত্র।
