দীর্ঘদিনের মন্দার মধ্যেই নতুন করে করের বোঝা, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের বাড়তি খরচে দেশের আবাসন খাত গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আবাসন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পে কর্মরত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই আবাসন বাজারে স্থবিরতা নেমে আসে। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও প্রত্যাশিত হারে বাজারে গতি ফেরেনি। বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা এবং দেশের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এর মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন কর আরোপ এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি আবাসন খাতের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঐশী প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান মো. আইয়ূব আলী বলেন, চলতি বছরে বেশ কয়েকটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হলেও গত পাঁচ মাসে একটি ফ্ল্যাটও বিক্রি হয়নি। সাধারণ সময়ে প্রতি মাসে কয়েকটি ইউনিট বিক্রি হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে বাজার প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে।

অন্যদিকে দেশের অন্যতম আবাসন প্রতিষ্ঠান শেলটেকের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মো. শাহজাহান জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। তিনি বলেন, নতুন করের কারণে ফ্ল্যাটের মূল্য বাড়লে নিবন্ধনের সংখ্যা আরও কমে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

নির্মাণ খাতের প্রধান কাঁচামাল রডের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে রড উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর শুল্ক-কর বৃদ্ধি এবং প্রতি টন রডের ভ্যাট ২ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) বলছে, কর বৃদ্ধি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি টন রড উৎপাদনে অতিরিক্ত ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা ব্যয় হতে পারে।

এ বিষয়ে বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে রডের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হবে। তবে বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হবে।

আবাসন উদ্যোক্তাদের মতে, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ফ্ল্যাটের দাম প্রতি বর্গফুটে প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে জমির মালিকদের জন্যও নতুন করের বিধান রাখা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জমি উন্নয়ন চুক্তির আওতায় সাইনিং মানির পাশাপাশি ডেভেলপারের কাছ থেকে প্রাপ্ত ফ্ল্যাট বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধার ওপর ১৫ শতাংশ ‘ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স’ বা মূলধনি লাভ কর দিতে হবে।

রিহ্যাব নেতারা বলছেন, এ ধরনের কর আরোপের ফলে জমির মালিকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে তারা বলছেন, ২৪ ইউনিটের একটি প্রকল্পে জমির মালিক ১২টি ফ্ল্যাট পেলে এবং সেগুলোর বাজারমূল্য ১২ কোটি টাকা হলে তাকে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর পরিশোধ করতে হবে।

তাদের দাবি, নতুন করব্যবস্থা কার্যকর হলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমবে, প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে এবং মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসন শিল্পের সঙ্গে নির্মাণসামগ্রী, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, রং, পরিবহনসহ প্রায় ২৬৯টি শিল্প খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। ফলে আবাসন খাতের স্থবিরতা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *