ছবির উৎস, Getty Images
পর্তুগিজ ফুটবলের ইতিহাস আসলে কোনো সরলরেখা নয়, এটা এক বিষাদসিন্ধু, যার এক কূলে পরম প্রাপ্তি আর অন্য কূলে আটলান্টিক মহাসাগরের মতো বিশাল দীর্ঘশ্বাস- এই কথা একবার লিখেছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিক জোনাথন উইলসন।
লিসবনের বেলেম টাওয়ার থেকে আটলান্টিকের দিকে তাকালে একটা বিষণ্নতা আসে। এই সমুদ্রপথেই একসময় পর্তুগিজ নাবিকরা অজানার দিকে বেরিয়ে পড়েছিলেন, এনেছিলেন জয়। গড়েছিলেন সাম্রাজ্য।
কিন্তু ফুটবলের মাঠে? সেখানে পর্তুগালের ইতিহাস অনেকটা সেই নাবিকের মতোই, দিগন্ত ছুঁতে ছুঁতে ফিরে আসা।
আজ আবার বিশ্বকাপ মঞ্চে নামছে পর্তুগাল। আর ৪১ বছরের একজন মানুষ নামছেন শেষবারের মতো। ছয়টি বিশ্বকাপ, একটিও ট্রফি নেই।
এটা কি শেষবার? নাকি শেষের শুরু?
১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে যখন ‘কালো চিতা’ ইউসেবিও ডি-বক্সের বাইরে থেকে বুলেটের মতো শটে জাল ছিঁড়ে ফেলতেন, তখন পর্তুগাল প্রথম চিনেছিল তাদের ফুটবলীয় পরিচয়।
মোজাম্বিক থেকে আসা ছেলে, লিসবনে বেড়ে ওঠা। কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ০-৩ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল পর্তুগাল। তারপর ইউসেবিও একাই চার গোল করলেন। ৫-৩। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হার। তৃতীয় স্থান।
ইউসেবিও কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছিলেন। সেই ছবিটা পর্তুগিজ ফুটবলের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্তগুলোর একটি। কিন্তু সেই পরিচয় দীর্ঘকাল আটকে ছিল লিসবনের পশমি চাদরের ওমে আর পোর্তোর কুয়াশায়।
এর পর ২৪ বছর বিশ্বকাপে নেই পর্তুগাল।
নব্বইয়ের দশকে লুইস ফিগো, রুই কোস্তা, দেকো — নামগুলো শুনলে আজও ইউরোপীয় ফুটবলের নস্টালজিক রোমান্টিকদের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়। একেই বলা হতো পর্তুগালের ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’। তারা খেলতেন এক ধরনের কাব্যিক ফুটবল, যেখানে বল পজেশন ছিল শিল্পের পর্যায়ে।
কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস। ১৯৯৪-এ বাছাই পর্বেই বিদায়। ১৯৯৮-এ কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়। ২০০২-এ গ্রুপ পর্বেই শেষ।
তারপর ২০০৪ সালের ইউরো ফাইনাল। ঘরের মাঠে গ্রিসের রক্ষণাত্মক ফুটবলের কাছে সেই হার লিসবনের আকাশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ফিগো-কোস্তাদের সেই না পাওয়ার বেদনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক নতুন জেদ। আর সেই জেদের নাম — ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।
ছবির উৎস, Getty Images
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ। পর্তুগালের ইতিহাসে এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ। একদিকে ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে থাকা লুইস ফিগো, অন্যদিকে ২১ বছরের এক তরুণ, যার পায়ে স্টেপ-ওভারের জাদু আর চোখে বিশ্বজয়ের ক্ষুধা।
সেই আসরেই পর্তুগাল খেলেছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত ম্যাচটি।
নুরেমবার্গের সেই ম্যাচটিকে ফুটবল ইতিহাস চেনে ‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গ’ নামে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ ষোলোর সেই ম্যাচে ফুটবল রূপ নিয়েছিল এক আদিম যুদ্ধক্ষেত্রে।
রেফারি ভ্যালেন্টিন ইভানভকে পকেট থেকে কার্ড বের করতে হয়েছিল ১৬ বার, যার মধ্যে ৪টি ছিল লাল কার্ড। রোনালদো সেদিন ডাচ ডিফেন্ডারের ভয়ঙ্কর ট্যাকলে চোখের জল ফেলতে ফেলতে মাঠ ছেড়েছিলেন। কিন্তু পর্তুগাল মচকায়নি।
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড। ওয়েইন রুনির লাল কার্ড। রোনালদোর সেই বিখ্যাত ‘উইঙ্ক’। রিকার্দোর অবিশ্বাস্য পেনাল্টি সেভ। পর্তুগাল সেমিফাইনালে, ইউসেবিওর পর ৪০ বছর পর।
কিন্তু জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের কাছে হেরে অবসান ঘটল ফিগো যুগের।
পরের গল্পগুলো শুধুই রোনালদোর একার কাঁধে এক দলকে টেনে নেওয়ার গল্প।
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ ষোলোতে স্পেনের টিকিটাকার গোলকধাঁধায় বিদায়। ২০১৪ ব্রাজিলে গ্রুপ পর্বেই জার্মানির কাছে ৪-০। রোনালদো তখন আহত। ২০১৮ রাশিয়ায় কাভানির উরুগুয়ের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায়, তবে যাওয়ার আগে স্পেনের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে রেখে গেলেন। সেই ম্যাচটা একাই ইতিহাস।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা। মরক্কোর রূপকথার কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে যখন রোনালদো কাঁদতে কাঁদতে টানেল দিয়ে মাঠ ছাড়ছেন, ফুটবল বিশ্ব ভেবেছিল এটাই শেষ।
কিন্তু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তো সাধারণ কোনো মানুষ নন। পাঁচটি ব্যালন ডি’অর। পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ। একটি ইউরো। এখন একটি নেশনস লিগ। রেকর্ড গোল। রেকর্ড ক্যাপ।
কিন্তু বিশ্বকাপ?
মেসি পেয়েছেন। রোনালদো পাননি। তুলনাটা তাকে হয়তো তাড়া করে। ছয়টি বিশ্বকাপ। আট গোল। কিন্তু সেই ট্রফি নেই।
তবে ২০২৬ সালের এই পর্তুগাল দলটির ভেতরের আবেগটা শুধু রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপকে ঘিরে নয়।
গত জুলাইয়ে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় লিভারপুলের ২৮ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড ডিওগো জোতা চিরতরে হারিয়ে গেলেন। পুরো পর্তুগাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং বিশ্ব ফুটবল সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কোচ রবার্তো মার্তিনেজ যখন বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করতে সিদাদ দো ফুতবোলের জনাকীর্ণ অডিটোরিয়ামে দাঁড়ালেন, বললেন — “এটি আমাদের ২৭ প্লাস এক জনের দল। ডিওগো জোতা আমাদের শক্তি, আমাদের আনন্দ। তাকে হারানো আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি, কিন্তু তার স্বপ্নটাই এখন আমাদের লড়াইয়ের জ্বালানি।”
এই ‘প্লাস ওয়ান’ তত্ত্বটি দলটিকে মানসিকভাবে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছে। ফুটবল মাঝে মাঝে মাঠের বাইরে গিয়ে জীবনের মুখোমুখি হয়।
ছবির উৎস, Getty Images
মার্তিনেজের কৌশল ও ইউরোপের সবচেয়ে ‘এলিট’ মিডফিল্ড
বিখ্যাত ফুটবল লেখক মাইকেল কক্স দেখিয়েছেন, আধুনিক ফুটবলে ম্যাচ জেতা বা হারা এখন আর শুধু উইঙ্গারদের গতিতে নয়, বরং মাঝমাঠের ট্যাকটিক্যাল কৌশলে নির্ধারিত হয়। আর এই জায়গাতেই রবার্তো মার্তিনেজের পর্তুগাল ইউরোপের অন্যতম সেরা।
ফার্নান্দো সান্তোসের রক্ষণাত্মক ‘প্র্যাগমেটিক’ ফুটবল থেকে পর্তুগালকে বের করে এনেছেন মার্তিনেজ। তার ৪-৩-৩ ফরমেশনটি মূলত পজিশনাল ইন্টারচেঞ্জের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে মিডফিল্ডাররাই মূল চালিকাশক্তি।
পর্তুগালের এবারের মাঝমাঠকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে ‘এলিট’ মিডফিল্ড। এখানে যেমন আছে প্রিমিয়ার লিগের আগুনে ফর্ম, তেমনি আছে ফ্রান্স থেকে শুরু করে পুরো ইউরোপের ফুটবলে রাজত্ব করা দুই তরুণ তুর্কির নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ম্যাচিউরিটি।
এই মাঝমাঠের প্রধান সেনাপতি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ব্রুনো ফার্নান্দেজ। সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে থিয়েরি অঁরির এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ২০টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড ভেঙেছেন তিনি। এফডব্লিউএ ফুটবলার অব দ্য ইয়ার। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে আবার চ্যাম্পিয়নস লিগে ফেরানোর মূল কারিগর।
মার্তিনেজের সিস্টেমে ব্রুনো খেলবেন ফ্রি রোল বা নাম্বার টেন পজিশনে। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণভাগে বলের জোগান দেওয়া, হাফ-স্পেস তৈরি করা এবং আচমকা দূরপাল্লার শটে গোল করার ক্ষেত্রে ব্রুনো দারুণ কার্যকর। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য ডি-বক্সে বল ঠেলে দেওয়ার মূল দায়িত্বটি থাকবে তার কাঁধেই।
ব্রুনো যখন ওপরে উঠে আক্রমণে ধার বাড়াবেন, তখন নিচে মাঝমাঠের টেম্পো ও গতি নিয়ন্ত্রণ করার গুরুদায়িত্ব প্যারিস সেন্ট জার্মেই সতীর্থ ও বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই মিডফিল্ডার ভিতিনিয়া এবং হোয়াও নেভেসের।
ভিতিনিয়া মূলত একজন ‘বক্স-টু-বক্স’ মিডফিল্ডার, যার সাম্প্রতিক রেকর্ড বলছে চাপের মুখেও তিনি বল পজেশন ধরে রাখতে অনন্য। প্রতিপক্ষের হাই-প্রেসিং গেমের মুখেও বল পায়ে ওপরে ওঠার সহজাত ক্ষমতা আছে তার।
জোনাল মার্কিংয়ের আধুনিক ব্যাকরণ মেনে হোয়াও নেভেস খেলবেন ‘ডিপ-লাইয়িং’ বা হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে। টটেনহ্যামের হোয়াও পালহিনহার মতো প্রথাগত ‘ডেস্ট্রয়ার’ ফর্মে না থাকায় বাদ পড়েছেন, আর সেই শূন্যতা একাই পূরণ করছেন নেভেস। নিখুঁত ট্যাকল, ইন্টারসেপশন এবং ব্যাকলাইন থেকে বল রিসিভ করে তা উইংয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে এই মৌসুমে তিনি পিএসজির সেরা পারফর্মার। মার্তিনেজের কৌশলে নেভেস দলের আক্রমণ ও রক্ষণকে একসঙ্গে ধরে রাখার ভূমিকাই পাবেন।
এই ত্রয়ীর সাথে যোগ হচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে পেপ গার্দিওলার অন্যতম প্রধান ভরসা বের্নার্দো সিলভা। সিটির হয়ে এই মৌসুমেও লিগ শিরোপা জয়ের পথে বের্নার্দোর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। উইং থেকে কাট ইন করে মাঝমাঠে ঢুকে পড়া কিংবা রাইট উইং ব্যাক পজিশনে নেমে এসে ডিফেন্সকে সাহায্য করা, এক কথায় গার্দিওলার অধীনে পিচের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে বের্নার্দোর পায়ের ছাপ পড়ে না।
ঘরোয়া ফুটবলের বিপ্লব, ‘বিগ থ্রি’ এবং মরিনহোর উত্তরাধিকার
পর্তুগাল দলের আজকের এই ট্যাকটিক্যাল ম্যাচিউরিটি এবং একের পর এক বিশ্বমানের মিডফিল্ডার ও ডিফেন্ডার উঠে আসার গল্পটা কিন্তু রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস ও পরিকাঠামোগত রূপান্তর।
মাইকেল কক্স তার ‘জোনাল মার্কিং’ বইয়ের ‘ফ্রান্স-পর্তুগাল ট্রানজিশন’ অধ্যায়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে ২০০৪ সালটি ছিল পর্তুগিজ ফুটবলের আধুনিকায়নের মূল টার্নিং পয়েন্ট।
২০০৪ সালের সেই বিখ্যাত চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে গেলসেনকির্খেনের অনভিজাত ভেন্যুতে দিদিয়ে দেশমের মোনাকোকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল হোসে মরিনহোর এফসি পোর্তো। মরিনহোর সেই পোর্তো রূপকথা কেবল একটি ক্লাবের ট্রফি জয় ছিল না; এটি পর্তুগিজ ফুটবলকে শিখিয়েছিল কীভাবে ‘আন্ডারডগ’ হয়েও কৌশল দিয়ে ইউরোপের পরাশক্তিদের চোখ রাঙানো যায়।
এই ঐতিহাসিক জয়ের ঠিক তিন সপ্তাহ পর পর্তুগালের মাটিতে বসেছিল ইউরো ২০০৪-এর আসর। সীমিত সম্পদের দেশ হওয়া সত্ত্বেও স্পেনের মতো প্রতিবেশীকে ভোটাভুটিতে হারিয়ে এই টুর্নামেন্ট এককভাবে আয়োজন করা ছিল এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ।
এই মহাযজ্ঞকে কেন্দ্র করেই পর্তুগালের ঘরোয়া ফুটবলের ‘বিগ থ্রি’—বেনফিকা, স্পোর্টিং সিপি এবং এফসি পোর্তোর স্টেডিয়াম ও একাডেমিগুলোকে সম্পূর্ণ আধুনিকায়ন ও বিশ্বমানের করে গড়ে তোলা হয়। ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন প্রধান জিলবার্তো মাদাইলের সেই দূরদর্শী অবকাঠামোগত বিপ্লবই মূলত পর্তুগিজ ফুটবলে এক নতুন আধুনিক মানসিকতার জন্ম দেয়।
সেই আধুনিক একাডেমিগুলো থেকে উঠে এসেই ২০০৮ সালে রোনালদো জেতেন তার প্রথম ব্যালন ডি’অর। আর আজ ২০২৬ সালেও পোর্তোর সেই লড়াকু মানসিকতার প্রতীক হয়ে গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন দিওগো কস্তা।
কোচ মার্তিনেজ এবার এই রূপান্তরের ফসলকেই কাজে লাগাচ্ছেন।
ছবির উৎস, Getty Images
দলটি কেমন?
দিওগো কোস্তা পর্তুগালের এক নম্বর গোলরক্ষক। পোর্তোর সেই লড়াকু মানসিকতার ধারক। পায়ে বলের দক্ষতা মার্তিনেজের বিল্ড আপ ফুটবলের জন্য আদর্শ।
রক্ষণে রুবেন দিয়াস ম্যানচেস্টার সিটিতে বছরের পর বছর ইউরোপের সেরা সেন্টার ব্যাকের মর্যাদা ধরে রেখেছেন। গঞ্জালো ইনাসিও স্পোর্টিং সিপিতে দুর্দান্ত। বাম দিকে নুনো মেন্ডেস। পিএসজিতে লুইস এনরিকের অধীনে তার উত্থান অভূতপূর্ব।
হোয়াও কানসেলো, দিওগো দালত এবং নুনো মেন্ডেসের মতো বিশ্বমানের ফুলব্যাক থাকার পরও মার্তিনেজ পেপ গার্দিওলার ট্যাকটিক্স ধার করেছেন। ম্যানচেস্টার সিটিতে এই মৌসুমে ম্যাথিউস নুনেসকে রাইট ব্যাকে খেলিয়েছিলেন গার্দিওলা।
মার্তিনেজও নুনেসকে ইনভার্টেড ফুলব্যাক হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা ডিফেন্স করার সময় চারজনের ব্যাকলাইন তৈরি করে, আবার আক্রমণের সময় নুনেস মাঝমাঠে এসে ওভারলোড তৈরি করেন। এই কৌশলটি তখনই সফল হয়, যখন মাঝমাঠে ভিতিনিয়া ও নেভেসের মতো ট্যাকটিক্যালি সচেতন খেলোয়াড়রা নুনেসকে স্পেস তৈরি করে দিতে পারেন।
তবে এই তারকাখচিত দলের ভেতরেও কিছু ফাটল বা দুর্বলতা রয়েছে, যা জোনাথন উইলসনের মতো ফুটবল বিশ্লেষকরা বারবার মনে করিয়ে দেন।
মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সরাসরি ধ্বংস করার মতো শারীরিক শক্তিসম্পন্ন প্রথাগত ‘ডেস্ট্রয়ারের’ অভাব রয়েছে এ দলে। ভিতিনিয়া বা নেভেসরা টেকনিক্যালি দুর্দান্ত হলেও ফিজিক্যাল ফুটবলে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো বা কলম্বিয়ার মতো শারীরিক শক্তির দলের বিরুদ্ধে চিত্রটা কেমন দাঁড়াবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
রাফায়েল লেয়াও, ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও, পেদ্রো নেতো — উইংয়ে গতি আর সৃজনশীলতার অভাব নেই।
ছবির উৎস, Getty Images
এবং রোনালদো
আল-নাসরে গোলের পর গোল করছেন। ২০২৫ নেশনস লিগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। সমালোচকরা বলেন সৌদি লিগ ইউরোপের মান নয়। কিন্তু গোলের ক্ষুধা কমেনি।
তবে জোনাথন উইলসনের মতো বিশ্লেষকরা একটা কঠিন প্রশ্ন তোলেন। ৪১ বছর বয়সে রোনালদোকে যখন নাম্বার নাইন হিসেবে খেলাবেন মার্তিনেজ, তখন লেয়াও আর কনসেইসাওকে উইংয়ে প্রচুর ট্র্যাকিং ব্যাক করতে হবে। কারণ আধুনিক ফুটবলের হাই-প্রেসিং গেম ৪১ বছরের রোনালদোর পক্ষে খেলা সম্ভব নয়।
হোয়াও ফেলিক্স, গঞ্জালো রামোসের মতো ফরোয়ার্ডরা ডাগআউটে বসে থাকবেন। এটা ড্রেসিংরুমের ইগো ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে মার্তিনেজের জন্য বড় পরীক্ষা।
পর্তুগাল পড়েছে গ্রুপ কে-তে। ১৭ই জুন হিউস্টনে কঙ্গো, ২৩শে জুন একই ভেন্যুতে উজবেকিস্তান, ২৭শে জুন মায়ামিতে কলম্বিয়া।
আপাতদৃষ্টিতে সহজ। কিন্তু কঙ্গোর ফিজিক্যাল ফুটবল সবসময়ই ইউরোপীয় দলগুলোর জন্য অস্বস্তির কারণ। আর হামেস রদ্রিগেজ ও লুইস দিয়াজের কলম্বিয়া মোটেই সহজ নয়।
এই টুর্নামেন্টের আরেকটি বড় প্রতিপক্ষ হলো উত্তর আমেরিকার আবহাওয়া এবং ভিন্ন টাইম জোন। মার্তিনেজ তাই পাঁচ দিন আগে ফ্লোরিডার পাম বিচে কন্ডিশনিং ক্যাম্প করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চিলি এবং নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলে দল তাদের চূড়ান্ত কম্বিনেশন ঠিক করবে।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পর্তুগালের একনায়ক আন্তোনিও সালাজার দেশের মানুষকে শান্ত রাখতে ‘থ্রি এফ’ নীতি ব্যবহার করতেন—ফাদো (সঙ্গীত), ফাতিমা (ধর্ম) এবং ফুতবল (ফুটবল)। সেই রাজনৈতিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে পর্তুগিজ ফুটবল আজ কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি তাদের জাতীয় গৌরবের প্রতীক।
ইউসেবিও পারেননি, লুইস ফিগো হাতছোঁয়া দূরত্ব থেকে ফিরে এসেছেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ২০১৬ সালে ইউরো জিতেছেন, নেশনস লিগ জিতেছেন। কিন্তু সোনার হরিণ সেই বিশ্বকাপ ট্রফিটা এখনো অধরা।
সচরাচর যেমন দেখা যায় এই বয়সে যখন একজন ফুটবলারের বুট জোড়া তুলে রেখে ধারাভাষ্য কক্ষে বসার কথা, তখন রোনালদো বুক চিতিয়ে লড়ছেন। পাশে জোতার অদৃশ্য স্মৃতি, শক্তিশালী মিডফিল্ড আর মার্তিনেজের কৌশল।
জোনাথন উইলসন যে বিষাদসিন্ধুর কথা লিখেছিলেন, সেই সিন্ধু পার হওয়ার এটাই হয়তো শেষ সুযোগ।
লিসবনের পশমি চাদরের ওম আর পোর্তোর কুয়াশা পেরিয়ে পর্তুগাল কি এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মহাকাব্যটি লিখতে পারবে?
