ছবির উৎস, EPA
ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে, যার ফলে গাজা উপত্যকায় গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে- বলছে জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন। অধিকৃত পশ্চিম তীরেও যুদ্ধাপরাধ হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
নতুন একটি প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনী “ইচ্ছাকৃতভাবে হাজারো ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু, তীব্র শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন করার মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছে” এবং গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও এই হত্যাকাণ্ড অব্যাহত ছিল।
কমিশন বলেছে, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য তাদের কাছে যৌক্তিক ভিত্তি আছে যে এসব কর্মকাণ্ড “গাজায় ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার একটি সচেতন কৌশলের অংশ, যেখানে তাদের শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে”।
তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনকে “সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান” করছে এবং একে “মানহানিকর প্রহসন” ও “এর আগেরগুলোর মতোই একে একটি প্রচারমূলক লেখা” বলে অভিহিত করেছে।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বে নজিরবিহীন হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। সেই ঘটনার পর ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে।
গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে এরপর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৩ হাজার ৩৫ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২১ হাজার ২৮০ জনের বেশি শিশু, জাতিসংঘও এই তথ্যকে নির্ভরযোগ্য মনে করছে।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েল বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনটি ২০২১ সালে গঠন করে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ। আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের জন্য এটি গঠন করা হয়। তিন সদস্য বিশিষ্ট এই বিশেষজ্ঞ প্যানেলটি জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র নয়।
গত সেপ্টেম্বরে কমিশনটি গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তোলে। তাদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদে সংজ্ঞায়িত পাঁচটির মধ্যে চারটি গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনী বাস্তবায়ন করেছে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।
ইসরায়েল ওই প্রতিবেদনের তীব্র প্রত্যাখ্যান জানায় এবং একে বিকৃত ও মিথ্যা বলে অভিহিত করে।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
এই কমিশন এর আগেও সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল যে, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী যুদ্ধাপরাধ করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন করেছে; আর গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ করেছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী।
গত অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার যে পরিকল্পনা নেন তার অংশ হিসেবে ইসরায়েল ও হামাস একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এরপর থেকে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এরপর অন্তত এক হাজার ২০জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬৫ জন শিশু।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের চারজন সৈন্যও নিহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে একটি বিবৃতিতে কমিশন বলেছে, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের “তীব্রতা ও পদ্ধতিগত প্রকৃতি” অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে ফিলিস্তিনি শিশুরা “অভূতপূর্ব মৃত্যু, আঘাত ও মানসিক ট্রমার” শিকার হচ্ছে।
ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
কমিশনের চেয়ারম্যান ভারতীয় বিচারবিদ শ্রীনিবাসন মুরালিধর বলেন, “২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও শিশুরা নিহত ও গুরুতরভাবে আহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ফিলিস্তিনি শিশুদের যে সুরক্ষা পাওয়ার কথা এবং যুদ্ধবিরতির বিষয়েও ইসরায়েলের অবহেলা অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ফিলিস্তিনি শিশুদের সুরক্ষা, পরিচর্যা ও বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।”
“শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জাতির অস্তিত্ব বজায় রাখার এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সক্ষমতার ওপরই আক্রমণ করছে।”
কমিশনের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল গাজায় সরাসরি ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কোয়াডকপ্টার ড্রোনের মতো নিখুঁত অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে এবং স্নাইপার ব্যবহার করে গুলি চালিয়েছে। প্রচুর শিশু অবস্থান করছিল এমন আবাসিক ভবন, স্কুল ও বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের শিবিরে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে।
পাশাপাশি, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সৈন্য ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনি শিশুরা লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় ইসরায়েল আইনগতভাবে দায়ী, কারণ তারা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে– এমনটাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনটি আরও বলেছে, গাজা ও পশ্চিম তীরের শিশুদের, বিশেষ করে কিশোর ছেলেদের “গ্রেফতার, নির্যাতন এবং ইসরায়েলি কারাগার ও আটক কেন্দ্রে অমানবিক আচরণের” শিকার হতে হয়েছে, এবং “বিশেষত গ্রেফতার বা আটক অবস্থায় ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্য করে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনাও” নথিভুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে, গাজায় নবজাতক ও শিশু হাসপাতালগুলোর ওপর ইসরায়েলি হামলা “জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে শিশুদের প্রবেশাধিকার পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে দিয়েছে, যা সুরক্ষিত একটি গোষ্ঠী হিসেবে তাদের টিকে থাকার ভিত্তিকে দুর্বল করেছে”— বলা হয় প্রতিবেদনে।
এতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ইসরায়েল যুদ্ধের কৌশল হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার করছে এবং সতর্ক করা হয়েছে যে গাজায় মানবিক সাহায্য ঢোকার ওপর বিধিনিষেধ “শিশুদের মধ্যে তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি সৃষ্টি করেছে, যা তাদের টিকে থাকার মৌলিক শর্তগুলো সরিয়ে দিচ্ছে”।
বলা হয়েছে, স্কুলে হামলা, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও জোরপূর্বক বিভিন্ন সেবা বন্ধের মাধ্যমে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ “শিশুদের শিক্ষার সক্ষমতাকে পদ্ধতিগতভাবে বিঘ্নিত করেছে, যার ফলে ফিলিস্তিনি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক ভিত্তিই নষ্ট হচ্ছে”।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটির নিন্দা জানিয়ে বলেছে, কমিশনটি একটি “মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া, যার উদ্দেশ্যই হলো সত্য অনুসন্ধান না করে ইসরায়েলকে আলাদা করে চিহ্নিত করা ও নিন্দা করা”।
তাদের বক্তব্য, “এটি হামাসের হাতে নির্মমভাবে নিহত, অপহৃত এবং লক্ষ্যবস্তু হওয়া ইসরায়েলি শিশুদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে, পাশাপাশি ফিলিস্তিনি শিশুদের মানবঢাল ও যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও এড়িয়েছে।”
তারা কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে তাদের দাবির জন্য “বিশ্বাসযোগ্য কোনো যাচাই-ব্যবস্থা নেই”।
ইসরায়েলের নেতারা ধারাবাহিকভাবে গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন এবং বলে আসছেন যে গাজায় তাদের সামরিক অভিযান আত্মরক্ষার্থে পরিচালিত হয়েছে, যার লক্ষ্য হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে পরাজিত করা এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করা।
তারা আরও দাবি করেছেন, ইসরায়েলি বাহিনী আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করেছে এবং বেসামরিক ক্ষতি কমাতে সব ধরনের সম্ভাব্য ব্যবস্থা নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার আনা একটি মামলার শুনানি করছে, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে রায় আসতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
ইসরায়েল এই মামলাকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” এবং “পক্ষপাতদুষ্ট ও ভ্রান্ত দাবির ওপর নির্ভরশীল” বলে আখ্যা দিয়েছে।
