ছবির উৎস, Getty Images
মার্কিন র্যাপার ম্যাকলেমোর-কে মঞ্চে ফিলিস্তিনপন্থী মন্তব্য করার কারণে লাইনআপ থেকে বাদ দেওয়ার পর ব্রিটিশ গায়ক এড শিরান-এর মার্কিন সফরের বাকি সব সহশিল্পীরা সফর ছেড়ে দিয়েছে।
তাদের মধ্যে আছেন পপ তারকা বিলি আইলিশ-এর ভাই ফিনিয়াস। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বললে শিল্পীদের চুপ করিয়ে দেওয়া উচিত নয়।”
আইরিশ গায়ক ও গীতিকার অ্যারন রো এবং ড্যানিশ ব্যান্ড লুকাস গ্রাহাম-ও তাদের সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
আইরিশ ফোক ব্যান্ড বিওগা, যারা প্রতি রাতে মঞ্চে শিরানের সঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশন করে, তারাও সফর থেকে সরে গেছে।
শিরান গাজা ইস্যুতে প্রকাশ্য বিতর্কে জড়াতে চান না বলে জানানোর এবং ম্যাকলেমোরকে সফর থেকে সরানোর জন্য তিনি দায়ী নন বলে বিবৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এসব ঘোষণা আসে।
“ম্যাকলেমোরকে সফর থেকে সরানো ছিল প্রোমোটারের সিদ্ধান্ত, আমার নয়,” শিরান ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন।
“যারা (কনসার্ট দেখার) পরিকল্পনা করে রেখেছেন, আমি কখনও সেসব ভক্তদের হতাশ করতাম না । একই সঙ্গে আমি সফরের ক্রু, অন্যান্য সাপোর্ট অ্যাক্ট এবং যেসব সঙ্গীতশিল্পী কাজ ও জীবিকার জন্য আমার ওপর নির্ভর করেন, তাদেরও ছেড়ে যাবো না।”
শনিবার ফিলাডেলফিয়ার লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ড-এ শিরানের পরবর্তী পরিবেশনা করার কথা রয়েছে।
তার ‘লুপ’ সফরের ওয়েবসাইট এখনো হালনাগাদ করা হয়নি এবং সেখানে গ্রাহাম ও রো-কে এখনো বিশেষ অতিথি হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
এই মাসের শুরুতে ম্যাকলেমোর, যার আসল নাম বেনজামিন হ্যাগার্টি, নিউ জার্সিতে দুটি কনসার্টে “ফ্রি প্যালেস্টাইন” (মুক্ত ফিলিস্তিন)- স্লোগান দেন এবং গাজার ধ্বংসযজ্ঞের ছবি প্রদর্শন করেন।
তার মন্তব্যের সমালোচনা করে কয়েকটি ইহুদি সংগঠন। এরপর কিছু ভেন্যু সফরের প্রোমোটারদের ওপর তাকে বাদ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়।
নিজের বিবৃতিতে শিরান বলেন, তিনি ভেন্যুগুলোর সঙ্গে “সপ্তাহজুড়ে দীর্ঘ আলোচনা” করেছেন এবং সমঝোতার চেষ্টা করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত প্রোমোটার মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ-ই তা বাতিল করে।
এই তারকা বলেন, তিনি “ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সংঘাতে মর্মাহত” এবং “উভয় পক্ষের কষ্ট ও যন্ত্রণা একটি মানবিক ট্র্যাজেডি”। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক ইস্যু থেকে দূরত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
“আমি এতে জড়িত নই,” তিনি লেখেন।
“এই ভয়াবহ সংঘাত সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত মতামত আছে। আমি প্রকাশ্যে কথা বলি না বলে এটা বোঝায় না যে আমার কোনো মত নেই, কিংবা আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবি না।
“এটাও বোঝায় না যে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন উদ্যোগকে সমর্থন করি না।”
তিনি আরও বলেন, “আমি কেন আমার পেশাগত প্ল্যাটফর্ম রাজনীতির জন্য ব্যবহার করি না, তার একটি কারণ আছে। আমার দর্শকদের মধ্যে বিভিন্ন পটভূমির তরুণ এবং প্রায়ই শিশুরাও থাকে।
“যারা আমার শোতে আসেন তারা রাজনৈতিক আলোচনা আশা করেন না। ম্যাকলেমোর যে বিশ্বাসের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন এবং তা উচ্চকণ্ঠে বলেছেন, আমি সেটিকে সম্মান করি।
“তবে একই লক্ষ্য, অর্থাৎ শান্তির জন্য, একাধিক পথ থাকতে পারে।
“আমি আমার পরিচিতি ও প্ল্যাটফর্মকে নিরাপদ ও আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে চাই, যেখানে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকে এবং আলোচনা বন্ধ না হয়ে খোলা থাকে। আমরা যদি শুধু সবচেয়ে জোরে চিৎকার করার দিকেই মনোযোগ দিই, তাহলে কিছুই পরিবর্তন হবে না। পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলার বিভিন্ন উপায় আছে।”
শিরান আরও বলেন, “আমার সব সাপোর্ট অ্যাক্টের মতোই” ম্যাকলেমোরও নিজের পরিবেশনার তালিকা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পেয়েছিলেন।
ছবির উৎস, Getty Images
এড শিরানের এই বিবৃতি যদি ভক্ত ও লাইনআপে থাকা শিল্পীদের শান্ত করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা উল্টো ফল দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
ইনস্টাগ্রামে লুকাস গ্রাহাম লিখেছেন, “যুদ্ধ নিয়ে, বেসামরিক মানুষের নিহত হওয়ার বিষয় নিয়ে, বড় হয়ে ওঠার অধিকার থাকা শিশুদের নিয়ে আমাদের কথা বলতে পারা উচিত। তারা যেখানেই থাকুক, তাদের ওপর যে পতাকাই উড়ুক না কেন।”
রো, যিনি চলতি বছরের শুরুতে সফরের অস্ট্রেলিয়া পর্বে অংশ নিয়েছিলেন এবং জুনে মার্কিন সফরে আবার সাপোর্ট অ্যাক্ট হিসেবে যোগ দেন, বলেন তিনি “এই সিদ্ধান্ত হালকাভাবে নেননি”।
তিনি যোগ করেন, “এড আমার বন্ধু। তিনি আমার জীবন বদলে দিয়েছেন। এজন্য আমি কখনও তার প্রতি যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারব না।”
তাদের পোস্টে বিওগা বলেছে, “প্রতি রাতে এমন দর্শকের সামনে পরিবেশন করা একজন সঙ্গীতশিল্পীর স্বপ্ন। কিন্তু এমন ভেন্যুতে পরিবেশন করা, যেখানে মুক্ত ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলা মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, আমাদের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
হাইন্ডস হল পরিবেশনা
৪ঠা সেপ্টেম্বর বিতর্কের শুরু হয়, যখন ম্যাকলেমোর নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম-এ এড শিরানের কনসার্টে করেন।
তিনি দর্শকদের বলেন, “আমি শুরুতেই এই সফরে যোগ দিতে চেয়েছিলাম মূলত একটি বড় কারণে। যেন আমি এমন স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে দুটি শব্দ বলতে পারি, যা আমার হৃদয়ের খুবই কাছের: ‘মুক্ত ফিলিস্তিন’।”
এরপর তিনি তার গান হাইন্ডস হল পরিবেশন করেন, যা কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি-এর ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের উৎসর্গ করা এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে। এ সময় বড় পর্দায় গাজার ধ্বংসযজ্ঞের ভিডিও দেখানো হয়।
দর্শকদের কেউ কেউ উল্লাস প্রকাশ করলেও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অনলাইনে সমালোচনা শুরু হয়।
ইসরায়েলি আমেরিকান কাউন্সিল তাকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে একটি পিটিশন শুরু করে। অন্যদিকে প্রচারাভিযান সংগঠন স্টপ অ্যান্টিসেমিটিজম অভিযোগ করে, এই সঙ্গীতশিল্পী প্রচারণামূলক বার্তা দিয়ে ভক্তদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছেন। পরে পপ তারকা পিংক ইনস্টাগ্রামে সেটি পুনরায় শেয়ার করেন।
পরের রাতে ম্যাকলেমোর একই মঞ্চে ফিরে এসে দর্শকদের মধ্যে থাকা তার “ইহুদি ভাই ও বোনদের” উদ্দেশে সরাসরি কথা বলেন।
তিনি বলেন:
“ইসরায়েলের সমালোচনা করা, বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থার সমালোচনা করা বা গণহত্যার বিরোধিতা করা কোনোভাবেই আপনাদের সমালোচনা নয়।”
তিনি আরও বলেন, তিনি চান গাজা ও পশ্চিম তীরে মানুষ জানুক যে তাদের ভুলে যাওয়া হয়নি।
ইসরায়েল গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
তাদের বক্তব্য, গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে তাদের সেনারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে আত্মরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাস-নেতৃত্বাধীন নজিরবিহীন হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭৩,৭৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে অঞ্চলটির হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।
‘সবচেয়ে সফল সফর’
কয়েক দিন ধরে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার পর সোমবার ম্যাকলেমোর ঘোষণা করেন যে তাকে লাইনআপ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই বয়কটের আয়োজন করেছেন রবার্ট ক্রাফট, যিনি ম্যাসাচুসেটসের জিলেট স্টেডিয়াম-এর বিলিয়নিয়ার মালিক।
ক্রাফট, যিনি একসময় এড শিরানকে তার বিয়েতে গান গাওয়ার জন্য নিয়োগ করেছিলেন, নিশ্চিত করেন যে ম্যাকলেমোরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত তিনিই নিয়েছেন।
তিনি বলেন, তার ভেন্যু “ঘৃণামূলক বক্তব্যের জন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম দেবে না” এবং র্যাপারের বিরুদ্ধে “ইহুদিবিদ্বেষী বক্তব্যের বিস্তৃত ইতিহাসের” অভিযোগ তোলেন।
ক্রাফট বলেন, “ম্যাকলেমোরের সঙ্গে আমি একমত যে অনেক বেশি প্রাণহানি হয়েছে এবং অতিরিক্ত দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু শুধু বাছাই করা তথ্য তুলে ধরা এবং হামাসের কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করা সৎ আচরণ নয়। এটি কেবল আরও বিভাজন এবং ঘৃণা বাড়ায়।”
তবে অন্য ভেন্যুগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
সফরের প্রোমোটার মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ ম্যাগাজিন রোলিং স্টোন-কে জানায়, বিভিন্ন ভেন্যু তাদের জানিয়েছিল যে তারা ম্যাকলেমোরকে পরিবেশন করতে দেবে না।
তাদের ভাষ্য, এতে “সফর বাতিল হয়ে যেতে পারত এবং কয়েক লাখ ভক্ত প্রভাবিত হতেন।”
মঙ্গলবার রাতে সফর ছেড়ে যাওয়া অনেক শিল্পী বলেছেন, ক্রাফটের সম্পৃক্ততা তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
লুকাস গ্রাহাম বলেন, “অর্থ থাকলেই আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অধিকার পাওয়া যায় না”।
“কারও ব্যাংক হিসাব ঠিক করবে না কে কথা বলতে পারবে বা কোন দুর্ভোগকে আমরা স্বীকার করতে পারব।”
নিজের বিবৃতিতে ম্যাকলেমোর বলেন, শিরান যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তার প্রতি তিনি সহানুভূতিশীল। তবে তিনি ইংরেজ এই গায়কের অবস্থান না নেওয়ার সমালোচনা করেন।
তিনি লেখেন, “কোনো পক্ষ নেওয়ার মূল্য দিতে হতে পারে। অর্থ, ব্র্যান্ড চুক্তি, স্পনসরশিপ, উৎসব, ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান, সম্পর্ক এবং সুযোগ হারাতে হতে পারে। আমি এসবই হারিয়েছি।
“কিন্তু নিপীড়ক এবং নিপীড়িতের মাঝখানে কোনো নিরপেক্ষ অবস্থান নেই।”
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, যদিও তিনি সফরে মাত্র দুটি শো সম্পন্ন করতে পেরেছেন, তবু যদি তার বক্তব্য “আবারও ফিলিস্তিনকে আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে” সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে “এটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সফল সফর।”
