তপন মল্লিক চৌধুরী
কার্যত টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় চোখের সামনে মাকে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেতে দেখে ১৪ বছরের ছেলের রোখ চেপে গেল—ডাক্তার তাঁকে হতেই হবে! স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সেই ছেলে একদিন শিয়ালদহের ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলে (পরবর্তীতে এনআরএস) ভর্তি হলেন। বাড়িতে নিদারুণ অভাব। তাই সংসার চালাতে শিক্ষকতা, পরীক্ষার হলে পাহারা দেওয়া, জনগণনার কাজ—সবই করেছেন। এর মধ্যেই এলএমপি পাশ করলেন বেশ ভাল ভাবে।
কিন্তু ব্রিটিশ আমলে মেডিক্যাল শিক্ষায় ছিল দুরকম ব্যবস্থা। দেশীয় ছাত্রদের জন্য বাংলায় পঠনপাঠনের ব্যবস্থা থাকলেও মেডিক্যালের অধিকাংশ বই ছিল ইংরেজিতে। সেগুলির ঠিকঠাক বাংলা অনুবাদও হত না। তাছাড়া বাংলা ভাষায় ডাক্তারি পাশ করা দেশীয় ডাক্তারদের জন্য নির্ধারিত ছিল অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জনের চাকরি। বিষয়টি তাঁকে অপমানিত করেছিল। তাই চলে গেলেন শ্রীরামপুরের কাছে চাতরা হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক হয়ে।
এরপর মেট্রোপলিটন কলেজ থেকে এলএ এবং বিএ পাশ করেন। পরে গ্রে স্ট্রিটের অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত অঘোরনাথ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। অঘোরনাথ ছিলেন সরোজিনী নাইডুর বাবা।
কিন্তু শিক্ষকতায় তাঁর আর বেশিদিন থাকা হল না। ক্যাম্পবেল স্কুলের তৎকালীন সুপার ম্যাকেঞ্জি সাহেবের সুপারিশে ১৮৮৫ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেন। তাঁর ফল এত ভাল ছিল যে, পাঁচ বছরের ডাক্তারি কোর্সে তাঁকে সরাসরি তৃতীয় বর্ষে ভর্তি করা হয় এবং ‘গুডিভ’ বৃত্তিও দেওয়া হয়। এরপর কৃতিত্বের সঙ্গে এমবি পাশ করে মেয়ো হাসপাতালে হাউস সার্জনশিপ করার পাশাপাশি এমএ এবং এমডি—দুটি পরীক্ষাতেই সসম্মানে উত্তীর্ণ হন নীলরতন সরকার।
নিজের ৭ নম্বর শর্ট স্ট্রিটের বাড়িতেই একটি ছোট্ট ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি তৈরি করেছিলেন তিনি। জুনিয়র ডাক্তারদের সেখানে কাজ করার পরামর্শ দিতেন। বহু কষ্টে দামি যন্ত্রপাতি কিনেছিলেন। দেশে প্রথম ইসিজি মেশিন ওই বাড়িতেই বসিয়েছিলেন। দেশি-বিদেশি মেডিক্যাল জার্নাল রাখতেন, যাতে ছাত্ররা পড়াশোনা করতে পারেন। নবজাতকের মৃত্যুহার কমাতে তিনিই প্রথম ‘দাই’দের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেন।
পরাধীন দেশে মেডিক্যাল কলেজগুলিতে বিদেশি চিকিৎসকদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। নীলরতনের চেষ্টা ছিল বাংলায় স্বদেশি মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলা, যাতে দেশীয় চিকিৎসকেরাই পঠনপাঠনের দায়িত্ব পান। এই উদ্যোগে রাধাগোবিন্দ করও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে ক্যালকাটা মেডিক্যাল স্কুল। পরে এই প্রতিষ্ঠান ও নীলরতন সরকার, সুরেশ সর্বাধিকারী-সহ কয়েক জনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস অব বেঙ্গল’ একত্রিত হয়ে বেলগাছিয়ায় নতুন প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে সেটিই কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজ এবং স্বাধীনতার পরে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ নামে পরিচিত হয়।
ইতিমধ্যে নীলরতন, সুরেশ সর্বাধিকারী-সহ কয়েক জন ১৬৫, বৌবাজার স্ট্রিটের একটি ভাড়াবাড়িতে দেশের প্রথম বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলির অন্যতম ‘কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস অব বেঙ্গল’ প্রতিষ্ঠা করেন। কিছু দিনের মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের এই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হয় ২৯৪, আপার সার্কুলার রোডে।
স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউয়ে দেশীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে। নীলরতন তাঁর এক ধনী রোগী তারকনাথ পালিতের সার্কুলার রোডের জমিতে গড়ে তোলার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের। পরবর্তী কালে প্রতিষ্ঠানটি যাদবপুরে স্থানান্তরিত হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
কলকাতায় যক্ষ্মা হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে নীলরতনের নেতৃত্বে ক্যালকাটা মেডিক্যাল এইড সোসাইটিও গড়ে ওঠে। যক্ষ্মা চিকিৎসার পরিকাঠামো তৈরিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
স্বদেশি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বদেশি শিল্প বিস্তারের ভাবনায় সাবান তৈরির ব্যবসা, চা ও চামড়ার ব্যবসাও শুরু করেছিলেন নীলরতন। উত্তরবঙ্গে রাঙামাটি চা-বাগান অধিগ্রহণ করেছিলেন। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বাঙালি লেদার টেকনোলজিস্টের সাহায্যে কলকাতায় ট্যানারি চালু করেছিলেন। ৯২, আপার সার্কুলার রোডে কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের বাগানবাড়িতে সাবান কারখানাও চালু হয়েছিল।
কিন্তু ব্যবসায়ী তিনি কোনও দিনই ছিলেন না। ফলে প্রভূত লোকসান হয়েছিল তাঁর। দেনার দায়ে সাধের বসতবাড়ি বিক্রি করেও বলেছিলেন, ‘‘কাজ তো আরম্ভ করা গেল, ফল আজ না হয় কাল পাওয়া যাবে। টাকাকড়ি সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন। আসে আর চলে যায়। গেলে কোনও দুঃখ নেই।’’
ব্রিটিশ আমলে সাহেবদের একচেটিয়া সাম্রাজ্যে দেশীয় ডাক্তার হয়েও নীলরতন সরকার ছিলেন অন্যতম উজ্জ্বল নাম। ব্রিটিশ ডাক্তারদের ভিজিট দেশীয় ডাক্তারদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। এই প্রথা ভেঙে নীলরতন দেশীয় চিকিৎসক হয়েও প্রথম ইংরেজ চিকিৎসকদের সমান ভিজিট নির্ধারণ করেন।
ডাক্তার বললে তখনকার মানুষ একটাই নাম বলতেন—ডাঃ নীলরতন! অসংখ্য মানুষকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করেছেন তিনি। সংক্রামক রোগীদেরও চিকিৎসা করতে পিছপা হননি।
মানুষের সেবা করতেন সর্বস্ব দিয়ে। নিজে রোজগার করেছিলেন অনেক, কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশই ব্যয় করেছিলেন দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞান, গবেষণা ও শিল্পের উন্নতিতে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসারেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত এবং বিজ্ঞান ও চিকিৎসাশিক্ষার প্রসারে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট অব সিভিল ল (DCL) এবং এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক LL.D. ডিগ্রি দেয়। ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইটহুডে ভূষিত করে। ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রিও দেয়।
