ছবির উৎস, SCREEN GRAB
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, কর্মকর্তাকে হুমকি এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে জামায়াতের সহযোগী সদস্য ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঢাকার বিমানবন্দর থানায় হওয়া মামলায় তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
বিবিসি বাংলাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার।
বিমানবন্দরের যে ঘটনায় মি. আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করা হয়েছে তার একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বিমানবন্দরে দায়িত্বরতদের সঙ্গে হট্টগোল করতে দেখা যায় তাকে।
এসব ভিডিওতে- বিমানবন্দরে দায়িত্বরতদের সঙ্গে তার কথা বলার ধরন এবং হুমকি-ধামকির বিষয়টি নিয়ে যেমন অলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে, তেমনি কেন তিনি এমন আচরণ করলেন সেই প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।
জানা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটসহ নানা অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই এই ঘটনার সূত্রপাত।
সেদিন বিমানবন্দরের থাকা একাধিক যাত্রী সেখানে অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগও জানিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে ভিডিও শেয়ার করেছেন কেউ কেউ।
বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে নানা অব্যবস্থাপনার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মি. আক্তারুজ্জামান এর সঙ্গে একই ফ্লাইটে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চারজন সংসদ সদস্যও।
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
বিমানবন্দরে কী ঘটেছিল?
মদিনা থেকে ঢাকায় আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলায়েন্স এর একটি ফ্লাইটে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকায় আসেন মি. আখতারুজ্জান ও জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন প্রতিনিধিসহ অন্য যাত্রীরা।
বিমানবন্দরের ২১ নম্বর গেট দিয়ে টার্মিনালে প্রবেশ করে ইমিগ্রেশন শেষে লাগেজ সংগ্রহের জন্য আট নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় যান তারা।
ওই সময়ে বিমানবন্দরে আগমনী যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ থাকায় ট্রলি সংগ্রহে সাময়িক সংকট সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
মূলত এই সময় লাগেজ পেতে বিলম্ব এবং জমজমের পানি না আসাকে কেন্দ্র করেই উত্তেজনার শুরু; যা পর্যায়ক্রমে বিশৃঙ্খলা, হট্টগোল এবং হুমকি-ধামকির পর্যায়ে পৌঁছায়।
ঢাকার বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে, এভাবেই ঘটনাক্রম উল্লেখ করা হয়েছে।
এসময় বিমানবন্দরে থাকা যাত্রীদের কেউ কেউ অব্যস্থাপনার অভিযোগ তুলে সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করেন।
এমনই একজন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর একই ফ্লাইটে মদিনা থেকে ঢাকায় ফেরা যাত্রী ডা. ওরাকাতুল জান্নাত।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, সেদিন মদিনা থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর পর- ইমিগ্রেশন পার করা থেকে লাগেজ পাওয়া পর্যন্ত চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন যাত্রীরা।
“৩০ মিনিট শুধু ইমিগ্রেশন ক্রস করে আমাকে ট্রলির জন্য দাঁড়াতে হয়েছে। এরপর আরও দুই ঘণ্টা থেকে আড়াই ঘণ্টা ক্রস হয়ে গেলে লাগেজ আসছে, কিন্তু জমজমের পানি আসেনি। ওটাও তো আমরা কিনে এনেছি, আমার লাগেজের পার্ট,” বলেন তিনি।
মিজ জান্নাত দাবি করেন, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও, কখন লাগেজ পাবেন কিংবা জমজমের পানি কেন পেলেন না- এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর পাননি তিনি।
“সামান্য তথ্যটুকু কেউ আমাদেরকে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। বিমানের কেউ শুরুতে আসেনি, পরে একজন এসেছিলেন কিন্তু উনিও কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারছিলেন না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
বিমানবন্দরে সেদিনের এই ঘটনাক্রমেরই পরবর্তী অবস্থা হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা। যেখানে যুক্ত হন একই ফ্লাইটের যাত্রী মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।
যেখানে বিমানবন্দরে দায়িত্বরতদের হুমকি-ধামকি দিতে দেখা যায় তাকে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ লাইনের কারণে শুরুতে নিয়ম ভঙ্গ করে ট্রলি সংগ্রহের চেষ্টা করেন অনেকে।
পরে লাগেজ আসতে বিলম্ব এবং জমজমের পানি না আসাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি উত্তেজিত ও অশোভন আচরণ করতে থাকেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান।
নির্বাহী পরিচালক সেখানে উপস্থিত হয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় মি. আখতারুজ্জামান তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং অশালীন ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন।
নির্বাহী পরিচালক বিমানবন্দরে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও মি. আখতারুজ্জামান আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনার যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সেখানে মি. আখতারুজ্জামানকে উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলতে দেখা যায়।
যেখানে তাকে বলতে শোনা যায় যে, “ঘাড় ধরে বের করে দেবো, কাজ জানেন না কিছু জানেন না, তদবির করে পোস্টিং এ আসবেন, মাইর খাইতে চান?”
এসময় তাকে থামানোর চেষ্টা করা হলেও কথা চালিয়ে যেতে দেখা যায় মি. আখতারুজ্জামানকে।
ছবির উৎস, Dr. Orakatul Jannat FB
মামলা ও গ্রেফতার
এই ঘটনায় শুক্রবার বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, মি. আখতারুজ্জামান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো কেপিআই-ভুক্ত ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় দায়িত্ব পালনরত সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সদস্যদের দায়িত্ব পালনে বাধা, ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করেছেন।
এছাড়া, প্রকাশ্যে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ, মারমুখী আচরণ এবং একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা সদস্যকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
দাবি করা হয়েছে যে, তার আচরণে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।
শুক্রবার বিকেলেই বিমানবন্দর থানার উপ-পরিদর্শক মাজেদুল ইসলামকে আগামী ১০ই নভেম্বরের মধ্যে এই ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
পরে শুক্রবার সন্ধ্যায় তাকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে আটক করা হয়েছে। তাকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান তিনি।
ছবির উৎস, SCREEN GRAB
মেজর আখতারুজ্জামান কে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানাভাবে আলোচিত মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।
বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও তিনি বিএনপির দুইবারের সংসদ সদস্য।
কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মি. আখতারুজ্জামান।
একসময় তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতিও ছিলেন।
কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলা-পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মি. আখতারুজ্জামান বেশ কয়েকবার বিএনপি থেকে বহিষ্কার হন।
গত বছরের ১৩ই ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে প্রাথমিক সহযোগী সদস্য হিসেবে যোগ দেন তিনি।
