
Published
পড়ার সময়: ৬ মিনিট
দিল্লির যন্তর মন্তরে ৩৭ দিন ধরে চলা জেন-জি আন্দোলনের হট্টগোল পৌঁছেছে বিজেপি নেতা-নেত্রীদের অন্দরমহলে।
বিজেপি নেতা মুরলী মনোহর যোশী আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন আগেই। কিন্তু শুধু তিনিই নন, বহু বিজেপি নেতার সন্তানরাও এই প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন।
অসম গণ পরিষদ (এজিপি)-এর এক মন্ত্রীর কন্যা, ওড়িশার একজন প্রবীণ বিজেপি সংসদ সদস্যের কন্যা এবং উত্তর প্রদেশের একজন প্রাক্তন বিজেপি বিধায়কের কন্যাও জেন জি আন্দোলনকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন।
অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারে মুরলি মনোহর যোশী শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ২৩শে জুলাই, তিনি তরুণদের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর দমননীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
মুরলি মনোহর যোশী বলেন, “নারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের নৃশংস শক্তি প্রয়োগ দেখে আমি গভীরভাবে মর্মাহত।”
বলা হচ্ছে যে, ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের প্রভাব বিজেপি নেতাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। বিজেপি নেতাদের বাড়িতে এই আন্দোলনের সমর্থকদের দেখা গেছে এবং এমনকি তাদের মেয়েরাও এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির অবস্থান কর্মসূচির সমর্থনে ২৩শে জুলাই গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন দিবিসা। তিনি আসাম বিধানসভার ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং অসম গণ পরিষদ (এজিপি) নেতা কেশব মহান্তের কন্যা। এজিপি আসামে বিজেপি সরকারের শরীক দল।
গত শনিবার, ওড়িশার বিজেপি সংসদ সদস্য অপরাজিতা সরঙ্গির কন্যা অর্চিতা সচিন রাহার একটি ইনস্টাগ্রাম স্টোরি শেয়ার করেন, যেখানে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার পর উদযাপন করার ভিডিও রয়েছে।
উত্তরপ্রদেশের সাবেক বিজেপি বিধায়ক বিক্রম সিং-এর কন্যা যশস্বিনী রাজে সিংও সামাজিক মাধ্যমে দলটির সমালোচনা করেছেন। এই তিনজনই জেন-জি প্রজন্মের, অর্থাৎ যাঁরা আনুমানিক ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন।
ছবির উৎস, Ishant Choudhan/Hindustan Times via Getty Images
বিজেপির সাবেক বিধায়কের কন্যা যা বললেন
২৯শে জুলাই যশস্বিনী রাজে সিং কাতার ভিত্তিক সংবাদসংস্থা আল জাজিরার সাথে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ প্রসঙ্গে মিজ. সিং বলেন, “এই পদত্যাগকে নির্ণায়ক হিসেবে দেখাটা খুবই অদূরদর্শী। পদত্যাগের ভাষায় কোনো অনুশোচনা নেই। কোনো জবাবদিহিতাই নেই। ভাষাটা এমন যেন তিনি শহীদ হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।”
“সিজেপি আধুনিক যুগের বার্তা মাধ্যম যেমন মিম এবং সামাজিক মাধ্যমের কন্টেন্টের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক অরাজনৈতিক মানুষকে একত্রিত করার দারুণ কাজ করেছে, যারা সাধারণত এই ধরনের আলোচনা এড়িয়ে চলেন।”
তার মতে, “সিজেপির মুখ্য ফোকাস ছিল ইনস্টাগ্রামে, এই পদ্ধতি বেশ চমৎকার, কারণ সেখানেই আমরা বিক্ষোভের ব্যাপক প্রচার দেখেছি। অবশ্য যাকে এখন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সত্যি বলতে, তাকে নিয়োগ দেওয়া সরকারের তরফ থেকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে করা একটা জঘন্য রসিকতা বলে মনে হচ্ছে।”
বিজেপির সঙ্গে তার বাবার সম্পৃক্ততা এবং তার রাজনৈতিক প্রস্থান প্রসঙ্গে যশস্বিনী সিং বলেন, “আমি নিজেকে ভণ্ড বা কপট বলে মনে করি না। আমি আর্থিকভাবে কারও ওপর নির্ভরশীল নই। আমি নিজের মতো থাকি। আমি গত সাড়ে তিন বছর ধরে ভারতেই আছি এবং একাই বসবাস করছি।”
“আমি ওই ধরনের পরিবেশে একেবারেই জড়াতে চাই না। আমি বহু বছর ফতেহপুরে যাইনি। তাই, আমি এসব থেকে নিজেকে অনেক দূরে রাখি, এবং সেই কারণেই আমি নিজেকে ভণ্ড মনে না করে এসব বলতে পারছি।”
যশস্বিনী সিংয়ের বাবা বিক্রম সিং উত্তর প্রদেশের ফতেহপুর সদর বিধানসভা কেন্দ্রের একজন সাবেক বিজেপি বিধায়ক। তিনি ফতেহপুর থেকে দুইবার বিধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিক্রম সিং ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির এক প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলেও, তিনি ফতেহপুরে বিজেপির একজন সক্রিয় নেতা হিসেবে রয়েছেন।
ছবির উৎস, Sanjeev Verma/Hindustan Times via Getty Images
আসাম সরকারের মন্ত্রী- কন্যা যা বললেন
আসাম সরকারের ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং রাজ্য সরকারের শরীক দল অসম গণ পরিষদ (এজিপি)-এর প্রবীণ নেতা কেশব মহন্তের কন্যা দিবিসা মহন্ত গুয়াহাটিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আলোচনায় আসেন।
বেশ কয়েকটি ভিডিওতে তাকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়। তার বাবা, কেশব মহন্ত, অসম গণ পরিষদ (এজিপি)-এর একজন নেতা এবং আসামে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের রাজস্ব মন্ত্রী।
ইংরেজি সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, “দিবিসা গত বছর ব্রিটেন থেকে দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। ভিডিওতে তাকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে এবং ‘ন্যায়বিচার’ দাবি করতে শোনা যায়।”
অন্য একটি ভিডিওতে তিনি বলেন, “এটা খুবই দুঃখজনক, এবং সেখানে (যন্তর মন্তরে) যে সহিংসতা ঘটেছে, তা নিয়ে আমি যে কতটা খারাপ অনুভব করছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।”
“ছাত্রছাত্রীরা শুধু একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল, কিন্তু তা ভীষণ সহিংস হয়ে ওঠে। লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, সবকিছুই ছিল। কিন্তু আমি অবশ্যই বলতে চাই যে, সেদিন সেখানে উপস্থিত প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর জন্য আমি গর্বিত। তাদের দেখানো সাহসিকতাই আমাকে তাদের পাশে এসে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে।”
গত রোববার, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকেও বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তার নিজের মন্ত্রীর মেয়ের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেন, “আমার সন্তানেরা যা বলে, তার জন্য আমাকে কীভাবে দায়ী করা যেতে পারে?”
“এমনকি আমার নিজের ভাইও আমার কোনো কথার সঙ্গে একমত নন। আমার সন্তানেরাও আমার অনেক বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে। এখানকার যে সমস্ত সাংবাদিক বিজেপির বিরুদ্ধে রিল তৈরি করেন, তাদের বাবা-মাও বিজেপির সমর্থক। সে মোদীজির বিরুদ্ধে কথা বলেছে, এবং আমি এতে ব্যথিত। যদি কখনও তার সঙ্গে আমার দেখা হয়, আমি এই বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলব।”
তিনি বললেন, “কাল যদি আমার ছেলে কোনো ভুল কথা বলে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমার ছেলে ভবিষ্যতে একজন আইনজীবী হবে এবং হয়তো এমন লোকদের প্রতিনিধিত্ব করবে যাদের আমি পছন্দ করি না। ছেলেমেয়েরা যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তখন তাদের কার্যকলাপকে তাদের বাবা-মায়ের সাথে যুক্ত করা উচিত নয়। মেয়ে যা বলেছে তা ভুল, তবে ওর সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলব।”
ছবির উৎস, Ishant Chauhan/Hindustan Times via Getty Images
ওড়িশার বিজেপি সংসদ সদস্যের মেয়ে যা বললেন
ওড়িশার রাজধানী শহর ভুবনেশ্বরের বিজেপি নেত্রী ও সংসদ সদস্য অপরাজিতা সরঙ্গির কন্যা অর্চিতা সচিন রাহারের একটি পোস্টও যথেষ্ট আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পিটিআই-এর খবর অনুযায়ী, অর্চিতার এই পোস্টটি ওড়িশার দলীয় কর্মী ও নেতাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
অর্চিতা রাহার ইনস্টাগ্রামে ভারতের জাতীয় পতাকার একটি ইমোজি সহ লিখেছেন, “জয় হিন্দ! নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভের মধ্যে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন।” এদিকে, তার মা সহ ওড়িশা বিজেপির বেশ কয়েকজন নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধানের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন।
পিটিআই-এর খবর অনুযায়ী, বিজেপি নেতারা অর্চিতা রাহারের পোস্টের সমালোচনা করেছেন। বিজেপি নেতা জগন্নাথ প্রধান বলেছেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধান এই মাটির সন্তান। তার পদত্যাগে আমরা দুঃখিত। ওড়িশার মানুষ বিহারের কন্যাকে (অপরাজিতা সরঙ্গি) সাদরে গ্রহণ করেছেন এবং তাকে দু’বার সংসদে নির্বাচিত করেছেন।”
তিনি বলেন, “অপরাজিতা সরঙ্গির উচিত তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করা। ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে তার মেয়ের করা নেতিবাচক মন্তব্যের জন্য তার ওড়িশার জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।”
অপরাজিতা সরঙ্গি তার মেয়ের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়ে বলেন যে পোস্টটি অনিচ্ছাকৃতভাবে শেয়ার করা হয়েছিল।
তবে, এরপর অর্চনা রাহার আরেকটি পোস্ট করে লেখেন, “ডিপি-র (ধর্মেন্দ্র প্রধান) পিএ-কে বলছি, যিনি নিশ্চয়ই আমার মাকে মেসেজ করে আগের স্টোরিটা মুছে ফেলতে বলবেন (এমনটা আগেও হয়েছে), চিন্তা করবেন না। আমি মুছব না। জয় জগন্নাথ! জয় হিন্দ।” তবে, স্টোরিটি পরে মুছে ফেলা হয়।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুসারে, বিজেপি নেত্রী অপরাজিতা সরঙ্গি এই পোস্টগুলো সম্পর্কে বলেছেন, “অর্চিতা একজন জেন-জি এবং সে এই স্টোরিটি তার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করেছিল। আমি যখন তাকে জিজ্ঞাসা করি, সে তার ভুল বুঝতে পেরে পোস্টটি মুছে ফেলে।”
তিনি বলেন, “সে আমাকে বলেছিল যে স্টোরিটি অনিচ্ছাকৃতভাবে পোস্ট করা হয়েছিল। সেই সময় আমি ওড়িশায় আমার নির্বাচনী এলাকায় ছিলাম এবং সে দিল্লিতে ছিল।”
গত শনিবার রাতে অপরাজিতা সরঙ্গিও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিয়ে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন। তিনি লিখেছেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করে পদত্যাগ করার জন্য অনেক সাহসের প্রয়োজন হয়। এই কঠিন সময়ে আমি তার পাশে আছি। আগামী দিনগুলোর জন্য আমি তার মঙ্গল কামনা করি। ভগবান জগন্নাথ যেন তাকে আশীর্বাদ করেন।”
ওড়িশা ক্যাডারের সাবেক আইএএস অফিসার অপরাজিতা সরঙ্গি ২০১৮ সালের নভেম্বরে বিজেপিতে যোগ দেন এবং এতে ধর্মেন্দ্র প্রধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়।
দিল্লিতে দলের তৎকালীন জাতীয় সভাপতি অমিত শাহের বাসভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অপরাজিতা সরঙ্গি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন।
সেই অনুষ্ঠানে তৎকালীন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, ওড়িশা বিজেপি সভাপতি বসন্ত পান্ডা এবং দলের ওড়িশা ইন-চার্জ অরুণ সিংও উপস্থিত ছিলেন।
১৯৯৪ ব্যাচের আইএএস কর্মকর্তা অপরাজিতা সরঙ্গি ২০১৩ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ডেপুটেশনে ছিলেন।
