বাবা-মায়ের উপর আর্থিক ভাবে নির্ভরশীল হলেই পারিবারিক পেনশনের অধিকার পাওয়া যায় না। মেয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক নির্ভরশীলতার পাশাপাশি তাঁর বৈবাহিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। অবিবাহিত, বিধবা অথবা বিবাহবিচ্ছিন্না মেয়েরাই নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে পারিবারিক পেনশনের দাবিদার হতে পারেন। আর যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পেনশনভোগী বাবা বা মায়ের মৃত্যুর সময়কার পরিস্থিতিই গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতিবার এমনই পর্যবেক্ষণ করেছে কলকাতা হাই কোর্ট।
বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের পর্যবেক্ষণ, স্বাভাবিক নিয়মে পারিবারিক পেনশনের উপর মেয়ের অধিকার থাকে না। তবে বাবা-মায়ের উপর আর্থিক ভাবে নির্ভরশীল কোনও মেয়ে অবিবাহিত, বিধবা বা বিবাহবিচ্ছিন্না হলে সংশ্লিষ্ট নিয়ম মেনে পারিবারিক পেনশন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, শুধু আর্থিক নির্ভরশীলতার প্রমাণ দিলেই হবে না, নির্দিষ্ট বৈবাহিক অবস্থার শর্তও পূরণ করতে হবে।
কোন নিয়মে পারিবারিক পেনশন?
পশ্চিমবঙ্গের ১৯৭১ সালের ডেথ কাম রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট (DCRB) সংক্রান্ত নিয়মে মেয়েদের জন্য পারিবারিক পেনশনের এমন সুযোগ ছিল না। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে নিয়ম সংশোধন করা হয়। সংশোধিত ব্যবস্থায় অবিবাহিত, বিধবা এবং বিবাহবিচ্ছিন্না মেয়েদের নির্দিষ্ট শর্তে পারিবারিক পেনশনের আওতায় আনা হয়।
– বিজ্ঞাপন –
এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পেনশনপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যুর তারিখে সংশ্লিষ্ট মেয়ে ওই যোগ্যতার শর্ত পূরণ করছিলেন কি না। পরবর্তীকালে তাঁর পরিস্থিতির পরিবর্তন হলেই সেই সময় থেকে নতুন করে পারিবারিক পেনশনের অধিকার তৈরি হবে না—আদালতের পর্যবেক্ষণে এমনটাই স্পষ্ট হয়েছে।
কী হয়েছিল গায়ত্রী মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে?
মামলাকারী গায়ত্রী মুখোপাধ্যায়ের বাবা কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের (CSTC) কর্মী ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক পেনশনের দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হন গায়ত্রী।
তাঁর দাবি ছিল, ২০০১ সাল থেকে তিনি বাবার সঙ্গে থাকতেন এবং বাবার উপর আর্থিক ভাবে নির্ভরশীল ছিলেন। তাই বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক পেনশন পাওয়ার অধিকার তাঁর রয়েছে।
অন্যদিকে, CSTC-এর তরফে আদালতে জানানো হয়, গায়ত্রীর বাবা ২০১৮ সালে মারা যান। কিন্তু গায়ত্রী ২০২১ সালে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করেন। ফলে বাবার মৃত্যুর সময় তিনি বিবাহিত ছিলেন। সেই সময় তাঁকে অবিবাহিত, বিধবা বা বিবাহবিচ্ছিন্না—কোনও অবস্থাতেই ধরা যায় না।
বিজ্ঞাপন
মামলাকারীর তরফে অবশ্য দাবি করা হয়, বাবার মৃত্যুর আগেও একটি বিবাহবিচ্ছেদের মামলা দায়ের হয়েছিল। সেটি খারিজ হয়ে যাওয়ার পর ২০২১ সালে ফের মামলা করা হয়। তাই ২০২১ সালের মামলাকে তাঁর পেনশন পাওয়ার পথে বাধা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
আদালতের যুক্তি কী?
হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ, ধরে নেওয়া হলেও যে ২০১৮ সালে গায়ত্রী তাঁর বাবার উপর আর্থিক ভাবে নির্ভরশীল ছিলেন, তাতেও পারিবারিক পেনশনের দাবি গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ বাবার মৃত্যুর সময় তিনি বিবাহিত ছিলেন।
আদালতের মতে, ২০০৮ সালের নিয়ম অনুযায়ী শুধু আর্থিক নির্ভরশীলতা যথেষ্ট নয়। মেয়েকে একই সঙ্গে নির্দিষ্ট বৈবাহিক অবস্থার শর্তও পূরণ করতে হবে। বাবার মৃত্যুর সময় তিনি যদি বিবাহিত থাকেন, পরে বিবাহবিচ্ছেদ হলেও সেই পরবর্তী পরিবর্তনের ভিত্তিতে বাবার পারিবারিক পেনশনের অধিকার নতুন করে তৈরি হয় না।
এই যুক্তিতেই গায়ত্রী মুখোপাধ্যায়ের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট। ফলে মামলাটিতে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, পারিবারিক পেনশনের ক্ষেত্রে মেয়ের আর্থিক নির্ভরশীলতার পাশাপাশি পেনশনভোগীর মৃত্যুর সময় তাঁর বৈবাহিক অবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই রায়কে সব ধরনের পারিবারিক পেনশনের ক্ষেত্রে একই নিয়ম বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কোন সরকারি সংস্থা বা কর্মীর ক্ষেত্রে কোন পেনশন বিধি প্রযোজ্য, তা সংশ্লিষ্ট পরিষেবা-নিয়মের উপর নির্ভর করে।
