ছবির উৎস, PMO
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। মি. ত্রিবেদী ঢাকায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর সাথে এটাই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ।
বৈঠকের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন যে, তারা আশা করছেন বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ভারত সরকার অনুধাবন করতে পেরেছে এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কোনো স্তম্ভকে আন্ডারমাইন আর করার মতো কিছু তারা করবে না।
আর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়৷ বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে”।
অন্যদিকে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার ‘খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে’। তারা এখন সামনের দিকে তাকাচ্ছেন।
সচিবালয়ে এই বৈঠকের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়া দিল্লিতে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের তীব্র অসন্তোষ প্রকাশের কয়েকদিনের মধ্যেই দীনেশ ত্রিবেদীর সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎটি অনুষ্ঠিত হলো।
বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ লাভের পর গত ১২ই জুন ঢাকায় এসেছিলেন ভারতীয় রাজনীতিক মি. ত্রিবেদী। এরপর গত ২৫শে জুন তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে তার পরিচয়পত্র পেশ করেন।
দায়িত্ব নিয়েই তিনি বাংলাদেশিদের ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন গ্রহণ করার ঘোষণা দেন, যা প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল। পরে চলতি বছরের ২৮শে জুন থেকে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন স্বাভাবিক ভিসা কার্যক্রম শুরু করে।
কিন্তু এর মধ্যেই আবার দিল্লিতে বিমানবন্দরে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকে হেনস্থার ঘটনা এবং পরে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে কিছুটা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বাংলাদেশে।
সে কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে দীনেশ ত্রিবেদী সৌজন্য সাক্ষাৎ নিয়ে অনেকের মধ্যেই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল।
এর আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সাথে গতকাল রোববার বৈঠক করেছিলেন দীনেশ ত্রিবেদী।
ছবির উৎস, PMO
বৈঠকের বিষয়ে যা বললেন দীনেশ ত্রিবেদী
সচিবালয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠক শেষে বের হওয়ার পথে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মি. ত্রিবেদী বৈঠকটিকে ‘জনগণের প্রতিনিধির সাথে জনগণের প্রতিনিধির সাক্ষাৎ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
“খুবই ভালো লাগলো। আমি কূটনীতিক নই। এটা ছিল জনগণের প্রতিনিধির সাথে জনপ্রতিনিধির সাক্ষাৎ। আমি খুবই আনন্দিত যে ওনার সাথে আমার দেখা হলো। দেখা হওয়ার সাথে সাথে মনে হয়নি যে প্রথমবার আমি ওনার সাথে দেখা করেছি। খুবই ভালো। খুবই বিনয়ী,” সাংবাদিকদের বলছিলেন তিনি।
ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, তাদের মধ্যে খুবই ভালো আলোচনা হয়েছে এবং ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী এখন সামনের দিকে তাকাচ্ছেন (লুকিং ফরোয়ার্ড)।
“আমাদের আমন্ত্রণ তো আগে থেকে আছে (তারেক রহমানের ভারত সফর বিষয়ে)। ভারতের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী আর লুকিং ফরোয়ার্ড, অ্যান্ড উই আর পজিটিভ। দুই নেতা সাথে বসলে আলোচনা হলে… ডেমোক্রেসিতে ইস্যু থাকবে। ইস্যু না থাকলে ওটা ডেমোক্রেসি না। আমাদের ইস্যু হবে, বাংলাদেশের ইস্যু হবে। কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই -ভালো সম্পর্ক। আর ভালো সম্পর্ক হবে উইন উইন সিচুয়েশনে,” বলছিলেন তিনি।
মি. ত্রিবেদী বলেন, ” আমাদের যা ইতিহাস আছে, তা তো বদলানো যাবে না। প্রতিবেশী তো বদলানো যাবে না। আমি একটা কথা সবসময় বলি যে আমরা শুধু সীমান্ত শেয়ার করি না, স্বপ্ন শেয়ার করি। মনে হচ্ছে আগামী দিন ভালোই হবে। ইস্যুকে সর্ট আউট করতে হবে দুই দিক থেকে। আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী। খুবই ভালো লেগেছে, ওনার সাথে দেখা হলো”।
কিন্তু বৈঠকে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ে আলোচনা হলো কি-না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব তিনি দেননি। ভারতীয় হাইকমিশনার শুধু বলেছেন, “এমন কোনো ইস্যু নেই যা আমরা বসে সমাধান করতে পারি না। এটা উইন উইন সিচুয়েশন। দুই দেশে গতিশীল ডেমোক্রেসি। দুই মাস হলো এসেছি। এত সম্মান পেয়েছি, প্রীতি ও ভালোবাসা পাচ্ছি- আমার ভালো লেগেছে”।
এরপরেও সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সবই ভালো হবে, ইতিবাচক হবে”।
ছবির উৎস, Getty Images
যা বলছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দফতর
গত পাঁচই অগাস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ সরকার।
আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাতের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান প্রেস ব্রিফিং-এ বলেছেন, তারা আশা করছেন তাদের বক্তব্য গুরুত্বের সাথে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করেছেন। “আমরা কোন বিষয়ে বলেছি, প্রেস স্টেটমেন্টও দিয়েছি, সেটি তারা বুঝতে পেরেছেন,” বলেছেন তিনি।
মি. রহমান বলেন, একটা রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ- নির্বাহী বিভাগ, জুডিশিয়ারি ও আইনসভা। দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার জায়গা হলো জুডিশিয়ারি। বাংলাদেশের একটি যোগ্য আদালত তাকে দণ্ড দিয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকে কাস্টডিতে নেওয়া হয় এবং তার যদি কোনো বক্তব্য থাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কিছু থাকে, সেটি আদালতে বলবে।
“পাঁচ তারিখে হাসিনা যে কাজ করেছে সেটি হলো বাংলাদেশের জুডিশিয়ারি, রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ- তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। সে কাজটি ভারত সরকার তাকে করতে দিয়েছে। আমরা চাই আমাদের রাষ্ট্রের পুরো কাঠামোর প্রতি সারা বিশ্ব শ্রদ্ধাশীল হোক। আমরা আশা করবো এ বিষয়টি ভারত সরকার অনুধাবন করবেন,” বলেছেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সোমবার হাইকমিশনার তার সাথে কথা বলেছেন এবং তার ধারণা হয়েছে তারা বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন।
“আমরা আশা করবো, আমাদের রাষ্ট্রের কোনো কিছুকে তারা আন্ডারমাইন করবেন না। তাদের সাথে কথা বলে আমি কিছুটা আশ্বস্ত যে এর পুনরাবৃত্তি পাবো না,” বলেছেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। দাওয়াত দেওয়া হয়েছে বিমসটেক এর চেয়ারম্যানকে। এ পার্থক্য বুঝতে হবে। এর আগে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সরকার গঠনের দিন যে চিঠি দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেটা আমরা দেখবো”।
আজ এ বিষয়ে (দ্বিপাক্ষিক সফর) কোনো আলোচনা হয়েছে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে তারা কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেননি।
ভারতীয়রা বাংলাদেশ সরকারের বার্তা বুঝতে পেরেছে কি -না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গতকাল উনি (ভারতীয় হাইকমিশনার) স্পষ্ট করেই বলেছেন যে উনি বুঝতে পেরেছেন। উনার সাথে আমার আলোচনা হলো তো, সেখানে তিনি বলেছেন যে আমরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলছি সেটি তিনি বুঝতে পেরেছেন”।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাতের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
“বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় হাইকমিশনারকে স্বাগত জানান। হাইকমিশনার ঢাকায় গত দুই মাসের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়”৷
“বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হত্যাকারীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের প্রতি অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়,” বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দৃশ্যত অবনতি ঘটেছিল।
দুই পক্ষেই ভিসা কার্যক্রম স্থগিত ছাড়াও তখন দুই দেশেরই রাজনীতিবিদদের কারও কারও বক্তব্য- পাল্টা বক্তব্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে অস্বস্তি বেড়ে গিয়েছিল।
এমনকি তখন দুই দেশেই হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভের ঘটনায় হাইকমিশনারদের পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনাও ঘটেছে ।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হবার পর তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পীকারকে পাঠিয়েছিল ভারত। এরআগে গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
কিন্তু সম্প্রতি ৫ই অগাস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। ঢাকার অভিযোগ, বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
