দূরে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু ছুটি হাতে নেই? সাপ্তাহিক ছুটির দিনটুকুও যদি সংসারের কাজ সামলাতে চলে যায়, তা হলে বেড়ানোর পরিকল্পনা বারবার পিছিয়ে যায়। অথচ কলকাতা থেকে খুব বেশি দূরে না গিয়েও এক দিনের জন্য বদলে ফেলা যায় চেনা শহুরে পরিবেশ। কোথাও গঙ্গার ধারে নিরিবিলি সময় কাটানো, কোথাও ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা, আবার কোথাও মন্দির-স্থাপত্যের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া—এমনই পাঁচটি জায়গা হতে পারে আপনার পরের একদিনের গন্তব্য।
গঙ্গার ধারে নিরিবিলি দুপুর বুরুলে
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বুরুলে গেলে শহরের কোলাহল থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে যাওয়ার অনুভূতি মিলবে। গঙ্গার ধারে গ্রামবাংলার পরিবেশ, নদীর হাওয়া আর খোলা আকাশ—চটজলদি একদিনের বেড়ানোর জন্য জায়গাটির আকর্ষণ সেখানেই। এখানে বড় কোনও দর্শনীয় স্থানের তালিকা নেই; বরং নদীর পাড়ে বসে সময় কাটানো, চড়ুইভাতি বা নিরিবিলি আড্ডাই মূল আকর্ষণ।
– বিজ্ঞাপন –
বুরুল ফেরিঘাট থেকে যন্ত্রচালিত নৌকায় ঘুরে নিতে পারেন ৫৮ গেটের দিক। সেখান থেকে টোটো বা অটোয় বেলাড়ি রামকৃষ্ণ মিশনের দিকেও যাওয়া যায়।
যাতায়াত: শিয়ালদহ থেকে বজবজগামী লোকাল ধরে বজবজ। সেখান থেকে অটো বা টোটোয় বুরুল। সড়কপথেও যাওয়া যায়।
ইতিহাসের শহর ব্যারাকপুরে এক বেলা
একই দিনে ইতিহাস আর নদীর হাওয়া—দুটিই পেতে চাইলে ব্যারাকপুর হতে পারে সহজ গন্তব্য। মঙ্গল পাণ্ডে পার্কে রয়েছে তাঁর স্মারক ও মূর্তি। ১৮৫৭-র বিদ্রোহের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এই এলাকা আজও সেই সময়ের স্মৃতি বহন করে।
এর পর যাওয়া যায় গান্ধী স্মারক সংগ্রহালয়ে। মহাত্মা গান্ধীর জীবন ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ছবি, নথি ও সামগ্রী রয়েছে সেখানে। মিউজ়িয়ামটি বুধবার বাদে অন্যান্য দিন সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে বলে তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সময় হাতে থাকলে ঘুরে নিতে পারেন গান্ধীঘাট ও জওহর কুঞ্জও।
যাতায়াত: শিয়ালদহ থেকে মেন লাইনের ট্রেনে ব্যারাকপুর। স্টেশন থেকে অটো বা বাসে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে পৌঁছনো যায়।
নদীর বুকে সবুজের ঠিকানা
হুগলির বলাগড়ের সবুজ দ্বীপ প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অন্য রকম অভিজ্ঞতা। হুগলি নদীর বুকে গড়ে ওঠা এই চরাঞ্চলে গাছপালা, নদী আর পাখির আনাগোনা মিলিয়ে শীতের দিনে সময় কাটানোর পরিবেশ তৈরি হয়। এখানে মূল আকর্ষণই প্রকৃতি—তাই খুব বেশি দর্শনীয় স্থান খুঁজতে না গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপের পরিবেশ উপভোগ করাই ভাল।
যাতায়াত: হাওড়া থেকে কাটোয়া লাইনের ট্রেনে সোমড়াবাজার। সেখান থেকে টোটোয় ফেরিঘাট, তারপর নৌকায় সবুজ দ্বীপ।
ফরাসি আমলের ছোঁয়া চন্দননগরে
এক দিনের সফরে ইতিহাস, স্থাপত্য আর নদীর হাওয়া—তিনটিই চাইলে চন্দননগর। ভাগীরথীর তীরে বিস্তৃত চন্দননগর স্ট্র্যান্ড হাঁটাহাঁটির জন্য বরাবরই আকর্ষণীয়। নদীর ধারের এই প্রমেনাডে বসে কিছুটা সময় কাটানো যায়, আবার কাছাকাছিই রয়েছে একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনা।
স্ট্র্যান্ডের পাশে দুপ্লে প্যালেস, বর্তমানে ইনস্টিটিউট দ্য শন্দননগর, ফরাসি আমলের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। সেখানে রয়েছে সংগ্রহশালা ও লাইব্রেরি। অষ্টাদশ শতকের নানা সামগ্রী, ফরাসি শাসনপর্বের স্মারক ও পুরনো আসবাবের সংগ্রহ রয়েছে। স্থাপনাটি বর্তমানে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের সংরক্ষিত স্মারক।
এ ছাড়াও রয়েছে সেক্রেড হার্ট চার্চ এবং নদীর ধারে পাতালবাড়ির মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা। ফলে শুধু স্ট্র্যান্ডে বসে সময় কাটানো নয়, হাঁটতে হাঁটতেই চন্দননগরের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যাবে।
যাতায়াত: হাওড়া থেকে ব্যান্ডেলগামী মেন লাইনের ট্রেনে চন্দননগর। স্টেশন থেকে অটো বা টোটোয় স্ট্র্যান্ড।
খড়দহে একসঙ্গে ২৬ শিবমন্দির
কলকাতার কাছেই ইতিহাস আর ধর্মীয় স্থাপত্যের এমন এক নিদর্শন রয়েছে, যা এক নজরে দেখলে চোখে পড়বেই। খড়দহের গঙ্গার ধারে রয়েছে ২৬টি শিবমন্দিরের সমষ্টি। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের তালিকাতেও এই মন্দিরসমষ্টি সংরক্ষিত স্মারক হিসেবে রয়েছে।
মন্দিরগুলি দুটি গোষ্ঠীতে বিন্যস্ত। স্থাপত্যে আটচালা রীতির প্রভাব রয়েছে। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, খড়দহের জমিদার রামহরি বিশ্বাস ও তাঁর পুত্র পণ্ডিত রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের উদ্যোগে এই মন্দিরসমষ্টি গড়ে ওঠে।
কাছেই রয়েছে রাধা শ্যামসুন্দর জিউ মন্দির। শ্রীনিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্রের সঙ্গে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। খড়দহের বৈষ্ণব ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও জায়গাটির পরিচিতি রয়েছে।
যাতায়াত: শিয়ালদহ থেকে মেন লাইনের ট্রেনে খড়দহ। স্টেশন থেকে অটো বা টোটোয় ২৬ শিবমন্দির। সেখান থেকে স্থানীয় যানবাহনে শ্যামসুন্দর মন্দিরেও যাওয়া যায়।
কলকাতার কাছাকাছি এই পাঁচ জায়গার কোনওটির জন্যই দীর্ঘ ছুটির প্রয়োজন নেই। সকালে বেরিয়ে দিনের বেশির ভাগটা ঘুরে সন্ধ্যার মধ্যেই শহরে ফেরা সম্ভব। তাই দূরের পাহাড়-সমুদ্রের পরিকল্পনা আপাতত থাক—একটা ছুটির দিন বরাদ্দ থাকলেই শহরের চেনা গণ্ডির বাইরে নতুন করে বাংলাকে আবিষ্কার করা যায়।
