ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
“ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে যাবো বিকেলে, তারপরে ওর দাদির কবর জিয়ারত করবো।অনেকটাই পরিকল্পনা ছিল এরকম। করা হইলো না। ছেলেরে নিয়া হাসপাতালে আছি। আল্লাহ সুস্থ করলে বাড়ি চইলা যাবো, তারপরে হয়তো জীবনে আরো যে ঈদগুলো আছে, আশা করি সেগুলো ছেলেকে নিয়া আনন্দে কাটাবো”।
হাম আক্রান্ত সন্তানকে কোলে নিয়ে এই কথাগুলো বলছিলেন মো. দেলোয়ার হোসেন নামের একজন বাবা। ঢাকার মহাখালী ডেডিকেটেড কোভিড- ১৯ হাসপাতালে (যেটি এখন হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য বরাদ্দ) বারান্দায় কথা হয় তার সঙ্গে।
“হসপিটালে কাটাচ্ছি, ভালো তো লাগার কথাই না। কিন্তু আবার যখন দেখতেসি আমার ছেলেটা এত অসুস্থতার মধ্যেও তিন দিনের মাথায় হাসতেছে-খেলতেছে, আমি তখন ঈদ করতে না পারার কষ্টটা ভুইল্লা গেছি,” বলছিলেন তিনি।
ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের দিনে বেশিরভাগ জায়গায় যখন পশু কোরবানি নিয়ে কোলাহল আর উৎসব উযদাপনের চেষ্টা, তখন এই হাম আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ করা হাসপাতালটিতে ছিল ভিন্ন পরিবেশ।
ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের দিনে বেশিরভাগ জায়গায় যখন পশু কোরবানি নিয়ে কোলাহল আর উৎসব উযদাপনের চেষ্টা, তখন এই হাম আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ করা হাসপাতালটিতে ছিল ভিন্ন পরিবেশ।
অসুস্থ সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক বাবা-মা আর অভিভাবকের চোখে শূন্যদৃষ্টি, আবার কোনো কোনো শিশুর অবস্থা একটু ভালো হচ্ছে দেখে আশার ঝিলিক কোনো কোনো মা-বাবার দুচোখে।
তবে সার্বিকভাবে বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি এখনো খুব একটা পাল্টায়নি। আজ ঈদের দিনেও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো পাঁচ শিশুর মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে সরকারি হিসাবে এই রোগ ও উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ৫৬৫ জনে।
ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
ঈদুল আজহার সকালে সরেজমিন ঢাকার মহাখালী ডেডিকেটেড কোভিড- ১৯ হাসপাতালে (যেটি এখন হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য বরাদ্দ) এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে দেখা গেলো গত কয়েক দিনের চেয়ে একটু ভিন্ন চিত্র।
অন্য যে-কোনো দিনের তুলনায় ঈদের সকালে কোলাহল কিছুটা কম ছিল দুই হাসপাতালেই, তবে একটু পরপরই ভেসে আসছে হাসপাতালে ভর্তি অসুস্থ শিশুদের কান্নার শব্দ।
তিন বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের বারান্দায় হাঁটছিলেন ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাজু। জানান, জীবনে প্রথমবারের মতো ঈদের দিনটি হাসপাতালে কাটাচ্ছেন তিনি। অথচ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে খুশির এই দিন উদযাপনে নানা পরিকল্পনা ছিল এই মানুষটির।
“মনের অবস্থা খুব খারাপ, বাচ্চাটার জন্য জামা-জুতা সব কিনছি কিন্তু কিছুই পরা হইলো না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. রাজু।
ঈদ আনন্দ ম্লান হয়েছে নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা মোছাম্মত সাহেরা খাতুনের। হাম আক্রান্ত অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে তারও।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, “ভাবছিলাম ঈদের দিন আনন্দ ফুর্তিতে কাটবে, কখনও এরকম ভাবি নাই যে ঈদের দিন বাচ্চাটারে নিয়ে হাসপাতালে কাটাতে হবে।”

হামে শিশুমৃত্যু থামছে না
“হাসপাতালে ঈদ কাটছে, ভালো লাগছে না। কিন্তু বাচ্চার মুখের দিকে তাকালে অন্য সব কিছু তুচ্ছ মনে হচ্ছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সাভারের বাইপাইল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আকাশ।
আট মাস বয়সি অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট-এ রয়েছেন এই অভিভাবক। সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কায় এই হাসপাতালেও হাম ইউনিটে নেওয়া হয়েছে বিশেষ সতর্কতা।
বাংলাদেশে চলতি বছরের শুরু থেকেই জেঁকে বসেছে হাম রোগ। এই রোগের উপসর্গ নিয়ে তিন মাসেরও কম সময়ে সাড়ে পাঁচশর বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থ হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হাজারো।
এই রোগে আক্রান্ত হয়ে কিংবা এর উপসর্গ নিয়ে ১৫ই মার্চ থেকে ২৮শে মে পর্যন্ত ৫৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিয়মিত এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসেরও কম সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পঞ্চাশ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে, যার অধিকাংশই শিশু।
বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরলেও নতুন করে সংক্রমণের সংখ্যা থামছে না। বিশেষ করে গত এক মাসে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে উদ্বেগজনকহারে।
এমন প্রেক্ষাপটে ঈদ অনেক পরিবারের কাছেই আনন্দের উপলক্ষ্য হয়ে ওঠেনি। হাসপাতালের বেডে তীব্র জ্বরে কাতরাতে থাকা শিশুকে নিয়েই সময় কাটছে তাদের। ঈদ উদযাপন ম্লান হয়েছে, আর সন্তানের হাম সংক্রমণ নানা শঙ্কায় ভোগাচ্ছে তাদের।
হাম সংক্রমণ নিয়ে শঙ্কা থাকায় দেড় বছরের সন্তানকে নিয়ে এ বছর ঈদে বাড়িতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ঢাকার আফতাবনগর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ পারভেজ হোসেন।
“করোনার সময় সংক্রমণ কীভাবে ছড়ায় এটা দেখেছি। হামের অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না। টিকা দেওয়ার পরও হাম হচ্ছে, এটা কেমন কথা? ঈদ আরও আসবে, কিন্তু বাচ্চাটা সুস্থ থাকুক,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. হোসেন।
আর মো. দেলোয়ার হোসেন বলছিলেন, “বাড়িতে পরিবারের লোকজন কোরবানি দিচ্ছে। প্রতিবার আমিও থাকি। এবার যে থাকতে পারবো না ভাবিনি। তবে বাচ্চার সুস্থতা সবার আগে।”

হাসপাতালে বাড়তি সতর্কতা
ঈদের দিন বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার মহাখালী ডেডিকেটেড কোভিড- ১৯ হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনুমতি ছাড়া বাইরের কাউকে হাম ইউনিটে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমনকি রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনদেরও ওয়ার্ডে ঢুকতে হচ্ছে ভিজিটর কার্ড দেখিয়ে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, সোমবার পর্যন্ত একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রোগীদের সঙ্গে নির্দিষ্ট ব্যক্তির বাইরে অন্যদেরও দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু হাম সংক্রমণ বাড়তে থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহাখালী ডেডিকেটেড কোভিড- ১৯ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বিবিসি বাংলাকে জানান, “বাইরে থেকে অনেকে এসে হাম ওয়ার্ডে ভিড় করছেন, এজন্য এখন প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এমনকি আমাদের ওপরও নানা বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে।”
গণমাধ্যম কর্মীদেরকেও হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে প্রবেশ করতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া লাগবে বলে জানানো হয়েছে।
মূলত, ঈদের ছুটিতে চিকিৎসকের সংখ্যা কম থাকায় হাসপাতালগুলো হাম সংক্রমণের বাড়তি ঝুঁকি নিতে চায় না বলেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
আগে থেকেই দেশের হাসপাতালগুলোতে বাড়তি সতর্কতা নেওয়ার বার্তা আগেই পাঠিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও হাম আক্রান্তদের চিকিৎসায় পৃথক ওয়ার্ড চালুর কথা বলা হয়েছে।
