
ইতালিতে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার জিতলো রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের সিনেমা ‘মাস্টার’। পরিচালক তার ফেসবুকে পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিজেই নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইতালির ২২তম লুক্কা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করেছে সিনেমাটি।
রবিবার রাতে সুমিত জানিয়েছেন, সুদূর তাসকানি থেকে কী দারুণ একটি খবর এলো কিছুক্ষণ আগে! লুক্কা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কারটি আমরা জিতে নিয়েছি! এই অর্জন ‘মাস্টার’ সিনেমাটির সর্বজনীনতা এবং প্রাসঙ্গিকতার আরেকটি প্রমাণ।
তিনি আরও লিখেন, উৎসবে এ বছর বিশ্ব চলচ্চিত্রের দুই নক্ষত্র নান্নি মোরেত্তি এবং জুলিয়ান শ্নেবেলকে আজীবন সম্মাননা (লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড) দেওয়া হয়। পাশাপাশি, পরিচালক নিকোলাস উইন্ডিং রেফন উপস্থিত ছিলেন তার নতুন সিনেমা নিয়ে, যা ‘গোল্ডেন প্যান্থার অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে।
ফেস্টিভ্যালের বিচারকমণ্ডলীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি জানান, পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতা বিভাগে এ বছরের উৎসব অঙ্গনের বেশ কিছু শক্তিশালী সিনেমা ছিল। এতগুলো দুর্দান্ত কাজের মাঝে আমার টিমের সকলের কঠোর পরিশ্রমকে মূল্যায়ন করার জন্য বিচারকমণ্ডলীর কাছে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
জুরি বোর্ডে ছিলেন অস্কারজয়ী কস্টিউম ডিজাইনার ফ্রাঙ্কা স্কুয়ার্সিয়াপিনো (সিরানো দে বের্জেরাক), লিথুয়ানিয়ান পরিচালক ও প্রযোজক শারুনাস বার্তাস এবং ইতালীয় অভিনেতা, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার মিকেলে রিওনদিনো।
তিনি ‘মাস্টার’ নিয়ে জুরি বোর্ডের অফিসিয়াল বক্তব্যটিও ইতালিয়ান ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করে পোস্টের সাথে লিখেন। সেখানে বলা হয়েছে-“বাহ্যত স্থানীয় একটি গল্পের মধ্য দিয়ে বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তা তুলে ধরার অসাধারণ সক্ষমতার জন্য পুরস্কারটি দেওয়া হলো। একটি সূক্ষ্ম ও বুদ্ধিদীপ্ত চিত্রনাট্যের মাধ্যমে দর্শক এমন এক শিক্ষকের মুখোমুখি হন, যার অন্তরে রয়েছে সৎ নীতি-আদর্শ আর সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি একনিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি। তার এই আদর্শ হয়তো সমাজকে বদলে দিতে পারত, কিন্তু তা থমকে যায় সাধারণ মানুষের মঙ্গলের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার জটিল মারপ্যাঁচে। অত্যন্ত সাবলীল গতিতে এগিয়ে যাওয়া সিনেমাটি মূল চরিত্রের মুখোমুখি হওয়া নানা বৈপরীত্যকে দারুণ দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছে। আর শেষমেশ তিনি যে দুর্নীতির কাছে নতি স্বীকার করেন; আফসোস হলেও সত্যি—আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণেই তা ভীষণভাবে চেনা।”
‘মাস্টার’ চলচ্চিত্রের সাথে সম্পৃক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি লিখেন, আমার পুরো কলাকুশলী টিমের প্রতি রইল অনেক অনেক ভালোবাসা- সত্যিই অসাধারণ ছিল আপনাদের ডেডিকেশন!
সবশেষে তিনি প্রেক্ষাগৃহে ‘মাস্টার’ এর মুক্তির বিষয়টি নিয়ে লিখেন, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে ‘মাস্টার’ কবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির অনুমতি পাবে?
১২৬ মিনিট দৈর্ঘ্যের ‘মাস্টার’ সিনেমাটি রাজনীতি, শ্রেণি সংঘাত ও মানবিকতার এক জটিল আখ্যান। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন জহির (নাসির উদ্দিন খান) নামের একজন আদর্শবান শিক্ষক, যিনি পরিস্থিতির চাপে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর নিজের বিবেক, জনমানুষের প্রত্যাশা এবং দুর্নীতির চক্রের মাঝে পড়ে জহিরের বদলে যাওয়ার গল্পই এখানে উঠে এসেছে।
‘মাস্টার’-এর সম্পাদনা করেছেন অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত ছবির সম্পাদক ও একাডেমি মেম্বার ক্রিস্টান স্প্রাগ এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন লস অ্যাঞ্জেলেস ভিত্তিক তাইওয়ানিজ কম্পোজার হাও টিং শি। ছবিটির কালার গ্রেডিং ও সাউন্ড মিক্সিং সম্পন্ন হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও বুসানের বিশ্বমানের স্টুডিওতে। ‘স্নোপিয়ার্সার’-এর সম্পাদক স্টিভ এম. চো এবং ‘বার্নিং’ সিনেমার শব্দ ডিজাইনার হান ম’হুয়ানের তত্ত্বাবধানে কাজ করেছেন বাংলাদেশের শব্দ সম্পাদক শৈব তালুকদার ও পরিচালক সুমিত।
ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসির উদ্দিন খান। এছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, ফজলুর রহমান বাবু, শরীফ সিরাজ, তাসনোভা তামান্না, আমিনুর রহমান মুকুল ও মাহমুদ আলম। বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানপ্রাপ্ত এই ছবিটি প্রযোজনা করেছে ‘মাইপিক্সেলস্টোরি’।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
