শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা আরও জোরদার করার পথে কেন্দ্র। কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সরু ভূখণ্ডকে ঘিরে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুক্রবার শিলিগুড়ির রানিডাঙায় সশস্ত্র সীমা বলের (SSB) উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার সদর দফতরে একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি নিরাপত্তা সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-সহ কেন্দ্র ও রাজ্যের নিরাপত্তা আধিকারিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
শাহ জানিয়েছেন, ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তায় একটি বিশেষ ‘ত্রিকোণ নিরাপত্তা গ্রিড’ তৈরি করা হচ্ছে। এর আওতায় উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, বিহারের কিশনগঞ্জ এবং অসমের ধুবড়িতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যবস্থা সীমান্ত নজরদারি, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করবে বলে কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে।
– বিজ্ঞাপন –
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেনস নেক’?
শিলিগুড়ি করিডর ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির প্রধান স্থল যোগাযোগের পথ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। করিডরের আশপাশে রয়েছে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত। ফলে সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ রোধ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা—সবই এই অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এই কারণেই সীমান্তে নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উপরও জোর দিচ্ছে কেন্দ্র। গত জুলাইয়ে শিলিগুড়ির ঝুমাগাছ সীমান্ত চৌকিতে অমিত শাহ একটি রেডিয়ো-ভিত্তিক ফেন্স ব্রিচ ডিটেকশন সিস্টেম পরিদর্শন করেছিলেন। সীমান্তের বেড়ায় কোনও ধরনের হস্তক্ষেপ হলে এই প্রযুক্তি দ্রুত সতর্কবার্তা দিতে পারে।
কাঁটাতারের বেড়ায় জোর, জমি হস্তান্তরে গতি
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়েও জোর দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শাহের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তার কাজে BSF ও SSB-কে মোট ১,১২৯ একর জমি দেওয়া হয়েছে। আরও ২৯ একর জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও এগিয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
শুক্রবার রানিডাঙায় SSB-র এক অনুষ্ঠানে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক, আবাসন ও পরিকাঠামোগত প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীর পরিকাঠামো উন্নয়নকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন শাহ।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তৎপরতাতেও বাড়ছে উদ্বেগ
পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সন্দেহভাজন পাকিস্তানি গোয়েন্দা-যোগের একাধিক মামলায় গ্রেফতারি হয়েছে। ১২ অগস্ট উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া এলাকা থেকে এক সন্দেহভাজন পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেফতার করে রাজ্য পুলিশের STF। তদন্তকারীদের দাবি, তাঁর পাকিস্তানের ISI-এর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং তিনি ভারতে জাল নথি ব্যবহার করে বসবাস করছিলেন। পরে ওই মামলায় আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।
উত্তরবঙ্গেও ISI-যোগের অভিযোগে একাধিক গ্রেফতারের ঘটনা সামনে এসেছে। কোচবিহারে STF তিন জনকে গ্রেফতার করে, যাঁদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ISI-র সঙ্গে যোগাযোগ এবং জাল ভারতীয় নোটের নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, ওই নেটওয়ার্কের যোগাযোগের সূত্র বাংলাদেশ ও নেপাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
এই পরিস্থিতিতে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে কেন্দ্রের তৎপরতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন মামলায় তদন্তাধীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি—তাই তাঁদের ‘দোষী’ হিসেবে চিহ্নিত না করে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সামনে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো
কেন্দ্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সীমান্তে শুধু প্রচলিত কাঁটাতারের বেড়া নয়, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত ব্যবস্থার উপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। SSB মূলত নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত পাহারা দেয়, আর BSF ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। এই দুই বাহিনীর সঙ্গে রাজ্য পুলিশের সমন্বয়ও ‘চিকেনস নেক’-এর সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগের এই গুরুত্বপূর্ণ করিডরকে ঘিরে নিরাপত্তার পরিধি আরও বাড়াতে চাইছে কেন্দ্র। সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোধ থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার—একাধিক স্তরে নজরদারি জোরদার করাই এখন ‘চিকেনস নেক’ সুরক্ষার মূল লক্ষ্য।
