যতদিন যাচ্ছে ইরান যুদ্ধের ঝাঁজ যেমন বাড়ছে, তেমনই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যেন শুরু হয়েছে এক নিঃশব্দ লড়াই। কোনও আগাম সতর্কতা নেই, নেই র্যাডারে স্পষ্ট কোনও সংকেত, তবুও তেহরানের আকাশ সীমায় প্রবেশ করতেই ভেঙে পড়ছে একের পর এক মার্কিন যুদ্ধবিমান। হঠাৎ করেই যেন প্রশ্নের মুখে পড়েছে আমেরিকার আকাশ-শক্তি। ইরানের হাতে কি সত্যিই এমন কোনও ‘অদৃশ্য অস্ত্র’ এসেছে, যা আধুনিক প্রযুক্তিকেও ফাঁকি দিচ্ছে? নাকি এটি পুরনো যুদ্ধকৌশলেরই পুনরাবৃত্তি, যার প্রতিধ্বনি একসময় শোনা গিয়েছিল ১৯৭৯ সালের আফগান যুদ্ধে?
শুক্রবার দু’টি মার্কিন যুদ্ধবিমানে জোড়া হামলা চালায় তেহরান। ইরানের মারে গুঁড়িয়ে যায় এফ-১৫ই এবং এ-১০ যুদ্ধবিমান। ঘটনায় নিখোঁজ এক পাইলট। মনে করা হচ্ছে, তিনি ইরানের যুদ্ধ-উপদ্রুত অঞ্চলেই তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখানেই শেষ নয়, দু’টি মার্কিন ‘ব্ল্যাক হক’ হেলিকপ্টারও এদিন ইরানি হামলার মুখে পড়ে বলে খবর। তবে সেগুলি কোনও মতে তেহরানের আকাশসীমার বাইরে চলে যায়। ফলে বেঁচে যায়।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই ‘অদৃশ্য অস্ত্র’ হল ‘মাজিদ’ মিসাইল। এটি কাঁধে বহন করে ব্যবহার করা হয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল এগুলি থেকে নির্গত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সহজে র্যাডারে ধরা পড়ে না।
কিন্তু ইরানের এই ‘অদৃশ্য অস্ত্র’ কী? কীভাবে তারা একের পর এক মার্কিন বিমান ধ্বংস করছে? তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে। এবিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান এখনও পর্যন্ত মুখ খোলেনি। তবে সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের এই ‘অদৃশ্য অস্ত্র’ হল ‘মাজিদ’ মিসাইল। এটি কাঁধে বহন করে ব্যবহার করা হয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল এগুলি থেকে নির্গত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সহজে র্যাডারে ধরা পড়ে না। এগুলিতে থাকা ইনফ্রারেড সেন্সর প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন থেকে নির্গত তাপ শনাক্ত করে এবং সেগুলিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। বিশেষ করে, কম উচ্চতা দিয়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমানগুলি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যে দু’টি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে, সেগুলি সম্ভবত কম উচ্চতায় অভিযান চালাচ্ছিল। এই অবস্থায় ‘মাজিদ’ মিসাইল অত্যন্ত কার্যকর হয়ে ওঠে। যেহেতু এই ধরনের অস্ত্র কাঁধে বহন যোগ্য, তাই এগুলি দ্রুত মোতায়েন করা যায় এবং শনাক্ত করা কঠিন ওয়ে ওঠে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলি ‘অদৃশ্য অস্ত্র’ হিসাবে বিবেচিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এই কৌশল ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল উচ্চপ্রযুক্তির স্টেলথ বিমানই নয়, বরং তুলনামূলকভাবে কম খরচের কিন্তু কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইরানের এহেন প্রত্যাঘাত দেখে অনেকেরই মনে পড়ে যাচ্ছে ৪৭ বছর আগের সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের কথা। সেই যুদ্ধেও ব্যবহৃিত হয়েছিল কাঁধে বহনকারী এধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যার নাম ছিল ‘এফআইএম-৯২ স্টিঙ্গার’।
ইরানের এহেন প্রত্যাঘাত দেখে অনেকেরই মনে পড়ে যাচ্ছে ৪৭ বছর আগের সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের কথা। সেই যুদ্ধেও ব্যবহৃিত হয়েছিল কাঁধে বহনকারী এধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যার নাম ছিল ‘এফআইএম-৯২ স্টিঙ্গার’। আফগান মুজাহিদিনদের হাতে এই অত্যাধুনিক অস্ত্র পৌঁছে দিয়েছিল আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)। এই অস্ত্র কার্যত যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আসলে সেই সময় সোভিয়েত বাহিনী তাদের হেলিকপ্টার যুদ্ধবিমান অনেক নিচু দিয়ে উড়িয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। তবে স্টিঙ্গার ক্ষেপণাস্ত্র মুজাহিদিনদের হাতে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। এর মাধ্যমে তারা একের পর এক সোভিয়েত যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়। এর ফলে সোভিয়েত বাহিনী আকাশে নিজেদের শক্তি হারায়। ৪৭ বছর পর ইরান যুদ্ধে সেই কৌশলেরই যেন পুনরাবৃত্তি দেখছে গোটা বিশ্ব।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
