ছবির উৎস, AFP via Getty Images
পড়ার সময়: ৪ মিনিট
হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে নতুন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের অবরোধের মুখে জলপথটিতে যেসব জাহাজ আটকে পড়েছে, নতুন ওই অভিযানের মাধ্যমে সেগুলোকে বের করে আনতে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার থেকে মার্কিন নৌ-সেনারা আটকেপড়া জাহাজগুলোকে পথ দেখাবে বলে জানানো হয়েছে।
“ইরান, মধ্যপ্রাচ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আমরা এসব দেশগুলোকে জানিয়েছি যে, আমরা তাদের জাহাজগুলোকে অবরুদ্ধ জলপথ থেকে নিরাপদে বের করে দেব, যাতে তারা অবাধে ও দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে,” সামাজিক মাধ্যমের একটি পোস্টে লিখেছেন ট্রাম্প।
তবে পোস্টে অবশ্য তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি। ফলে “এ দেশগুলোকে” বলতে ঠিক কোন দেশগুলোকে বোঝানো হয়েছে, সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পাল্টা নৌ অবরোধ চালিয়ে আসছে।
এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথটিতে বিভিন্ন দেশের পণ্যবাহী অনেক জাহাজ আটকে পড়েছে।
সেইসঙ্গে, জাহাজগুলোর প্রায় ২০ হাজার নাবিক ও কর্মী সমুদ্রে আটকা পড়েছেন।
গত কয়েক মাসে খাবার, ওষুধসহ তাদের প্রয়োজনীয় রসদ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
এছাড়া দীর্ঘদিন সমুদ্রে আটকে থাকার কারণে নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
ছবির উৎস, Getty Images
এর মধ্যেই রোববার গভীর রাতে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক পরিবহন সংস্থা (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি ট্যাংকার ‘অজ্ঞাত কোনো বস্তুর’ আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে জাহাজটির নাবিক ও কর্মীদের তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি, বিশেষত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। যুদ্ধের কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে জলপথটিতে মার্কিন অভিযান শুরুর ঘোষণা এলো।
নতুন অভিযানটি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর পক্ষ থেকে নেওয়া একটি “মানবিক পদক্ষেপ” বলে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প।
“এই জাহাজ চলাচলের উদ্দেশ্য কেবল সেইসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং দেশগুলোকে মুক্ত করা, যারা মোটেও খারাপ কিছুর জন্য দায়ী নয়,” যোগ করেন ট্রাম্প।
সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেছেন, মার্কিন প্রতিনিধিরা ইরানের সঙ্গে “খুবই ইতিবাচক” আলোচনা করছেন। ওই আলোচনা “সকলের জন্য খুব ইতিবাচক কিছু বয়ে আনতে পারে” বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
তবে তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে অভিযানটি কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ এর আওতায় তাদের প্রায় ১৫ হাজার সদস্য, শতাধিক যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ নিয়োজিত থাকবে।
অভিযান চলাকালে কেউ কোন ধরনের হস্তক্ষেপ বা বাঁধা সৃষ্টির চেষ্টা করলে সেটির বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন ট্রাম্প।
এমন একটি সময় এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হলো, যার আগে যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১৪ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে ইরান।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘স্থায়ীভাবে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে’ তারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের মাধ্যমে শান্তি পরিকল্পনাটি ট্রাম্পের কাছে পাঠিয়েছেন।
“এখন যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা সংঘাতের পথ বেছে নেবে না-কি কূটনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান করবে,” বলেছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
ইরানের কাছ থেকে নতুন করে শান্তি প্রস্তাব পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রস্তাবনাগুলোকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ উল্লেখ করলেও সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
এদিকে, ইরানের সরকার সমর্থিত গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়েছে যে, তেহরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাবের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে একটি প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো মার্কিন জবাবটি তেহরান পর্যালোচনা করে দেখছে।
এ ঘটনার পরপরই ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে নতুন অভিযানের কথা জানান।
তবে ইরানের শান্তি প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়ার বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
নতুন ১৪-দফা শান্তি পরিকল্পনার মধ্যে ইরানের সীমান্ত এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলাসহ সকল প্রকার ‘শত্রুতা’ বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বলে ইরানি গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের বক্তব্য তুলে ধরে খবরে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও তেহরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করবে না।
ছবির উৎস, Getty Images
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে।
তবে তেহরানএমন দাবি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই তারা পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধ অবসানে এর আগে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি সফল হয়নি।
দু’পক্ষকে আবারও আলোচনার টেবিলে বসানোর জন্য জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থাকারী দেশ পাকিস্তান।
এর মধ্যেই রোববার ১৪-দফা শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে আরও বলা হয়েছে, নতুন শান্তি প্রস্তাবে উভয় পক্ষকে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পরিবর্তে ‘স্থায়ীভাবে যুদ্ধ শেষ করার’ ওপর মনোযোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রস্তাব মেনে নিলে আগামী একমাসের মধ্যে দু’পক্ষের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি হতে পারে বলে জানিয়েছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
