দেবারুণ রায়
২২ এপ্রিল সাত সকালে মালদার মালতীপুর থেকে পৌঁছেছি মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে। চমকের সব গমক এখনও বাকি। কলকাতায় বসে লেজ নেড়ে দু এক পেয়ালা চা আর পাঁচ রকম টিভি ওয়ালার পেড নিউজ দেখে শুনে ভোটের ভট্টাচার্য হতে মন সায় দিচ্ছিল না। আজন্ম প্রিন্ট মিডিয়ার জলে হাওয়ায় চুল পাকলো। যা শিখলাম যা জানলাম তার সবটুকু তিলাঞ্জলি দিয়ে, নিজেকে এবং সকলকে বোকার বুঝ দেব ? সেটা কখনোই যখন হয়নি, এবার কীকরে হবে ? এবার তো সেই আর পাড়ের লড়াই। তুমি খাবে আর আমি খাব না, তা হবে না, তা হবে না। এই তৃতীয় দুনিয়ার রণহুংকার এবার আর ফল্গুধারা নয়। ফল্গুনদীতেও বন্যা হয়। এবার সেই বন্যা দেখতে এসেছি। কোনও অ্যাসাইন্মেন্ট নেই বা নিইনি। কোনও গ্রহের কক্ষপথে ঘোরার দাসখতে সই করিনি। তবুও। এসেছি অভ্যাসে। যুদ্ধ দেখতে সশরীরে রণক্ষেত্রে। ঢাল নেই তরোয়াল নেই। নিধিরাম সর্দার সাজার দায় নেই । আছে শুধু নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেকেই খুঁজে নিতে বলার মতো এক অন্য কিছু চাওয়া। যে নেতারা হয়কে নয় করার ক্ষমতা রাখেন, তাঁদের মনে কোনও প্রশ্ন নেই। তাঁরা জানেন তাঁরা প্রশ্নাতীত, ত্রিগুণাতীত। তাঁরা তুরিয়াবস্থায় যা বলেন তাই বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম, সত্য, নীতি।
মালতীপুরের সবুজ এখন ফিকে হয়েছে মরশুমের মর্জিতে। মহীরুহের সারিতে তাল তমাল বনরাজী নীলা । আভাতিবেলার দিকে তাকিয়ে যে কলঙ্করেখায় চোখ দাঁড়িয়ে, সেখানেই আছে সেই পিয়াল তরুটি। তার বাকলের বয়স অনেক। মানুষের স্বপ্নের ঘোরে আর সামর্থ্যের জোরে শতায়ু তরুর শাখা প্রশাখায় বসন্ত কোকিল ডানা ঝাপটায়। মালতীপুরের মালতীলতা দোলে, সেই পিয়াল তরুর কোলে। কোতোয়ালীর নবাব বাড়ির কর্তা বরকত গনিখান চৌধুরীর নামে এখনও মালদায় মৌসম বদলায়। বদলের মৌসম কতটা পাল্টা চাল রুখে দাঁড়াতে পারবে, তা বলবে ৪ মে। কিন্তু মৌসম বেনজীর নূরের লড়াই এবার মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে সরাসরি। বরকতের কংগ্রেসের উত্তরাধিকার বনাম প্রচণ্ড শক্তিশালী শাসকদল তৃণমূলের মুঠোয় ধরা প্রখর রুদ্রতাপে তপ্ত গ্রীষ্মকাল। লড়াইয়েই তীব্রতা ধর্মের মেরুকরণকে তুচ্ছ করে দিয়েছে। এটা অবশ্যই দেশ ও রাজ্যের দুই শাসকের দলের নৈতিক পরাজয়। বিজেপির সাংসদ খগেন মুর্মুর বিরুদ্ধে আদিবাসীদের মিছিল তাঁকে লড়াইয়ের ময়দানে আর থাকতে দেয়নি এখানে। দেওয়াল লিখন স্পষ্ট হয়েছে তাদের বিবৃতিতে। বিজেপির কমন সিভিল কোডের আস্ফালন খগেন মুর্মুর নীরবতার নীটফল।

লোকে বলছে শুনলাম, মৌসম বদলায়। মৌসম তৃণমূলে গিয়ে ভুল করেছিল। কিন্তু কোনও চুরি বাটপারি তো করেনি। কিন্তু এক মক্কেল ক্ষিপ্ত। মামা বরকত গনিখানের নাম কেন নেবেন মৌসম নূর ? আশ্চর্য প্রশ্নটি করলেন তৃণমূলের মাতব্বর টনিক। রফিকুল ইসলাম বলে কেউ ওঁকে চেনে না। খুব খারাপ অবস্থা বোঝা যায় মৌসমের নামে ভিন্ন ধর্মে বিয়ে করার কথা প্রচার করছেন। যা মিথ্যে হলেও সাচ্চা মুসলমানির সওয়াল। এবং ভিত্তিহীন। রাজনীতি থেকে নীতি শব্দটা বাদ দেওয়ার সময় এসেছে। তৃণমূল প্রার্থী আব্দুর রহিম বক্সিকে সপুত্র প্রতিপত্তিশালী বলে মানে মানুষ। কেউ বলবে না, ওঁকে ভোট দেব না। এটা বুঝে নিন। বললেন, তিনি। যিনি মৌসমের শেষ প্রচারের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ওর শাদির দাওয়াত খেয়েছি। ও ভুল করলেও আমরা করিনি। আমরা কংগ্রেস ছাড়িনি। বছর পঞ্চান্নর মামুন হকের কথায় বিজেপি তাড়ানোর খোয়াব দেখিয়ে যারা কংগ্রেসকে আর কংগ্রেসের জোটের দলগুলোকে শেষ করেছে, বিজেপিকে প্রায় শূন্য থেকে ৭০ পার করিয়েছে, সেই বেড়ালকে আর মাছ পাহাড়া দিতে দেওয়া নেই। বিজেপির দাওয়াই বাংলার হিন্দু মুসলমানের সাচ্চা ঐক্য। রুখব তো আমরাই, মার খাব তো আমরাই। তবে ? ছদ্মবেশী বিজেপি আমাদের হাতে হুঁকো ধরিয়ে তলায় তলায় আসল বিজেপির জমি তৈরি করবে লুটের ক্ষমতা বজায় রাখতে।
আগের পর্ব: সংখ্যালঘু ভোটে দোলাচল, বাইনারি ভাঙল কংগ্রেসের জলসাঘরে
পীরগঞ্জ অঞ্চলের কুতুবগঞ্জ গ্রামের মজদুর ঠিকেদার রাইসউদ্দীন চিরকাল কংগ্রেস করেছেন। দলটা শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখে বুকে পাথর চাপা দিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে মানিয়ে চলেছেন। ব্যবসা পাতিতে পুরনো দলের কিছু মাতব্বর তাঁর সর্বনাশে হাত মেলানোয় দুঃখে কংগ্রেসের সঙ্গ ছাড়তে মন তৈরি করে ফেলেন। কিন্তু ছেলের সঙ্গে গাঁয়ের তরতাজা ছেলের দল কাল রাতে তাঁকে বলে, এইবারের ভোটে তুমি আমাদের সঙ্গে না থাকলে হয় ? ওরা গাঁয়ের নাটকের দল করে, কবিতা লেখে, শহর থেকে গল্পের বই কিনে এনে নাটকের স্ক্রিপ্ট তৈরি করে। ওয়াসিমকে সবাই অসীম বানিয়েছে । অসীমের আব্বুকে যে ব্রহ্মাস্ত্রে কাবু করা যায়, তা হল, সিপিএমের প্রার্থী মীনারুল ভোটারদের কাছে আবেদন করেছেন , আমাকে যারা ভোট দেবেন তারা মৌসমকে দিন। আর যে লাল পার্টির লোকেরা খগেনের খাদ্য হয়ে তার পিছু পিছু বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল তারা আগেই জানিয়ে দিয়েছে, এই বিজেপি আর না। দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে সর্বনাশ। ভোট লিয়েও নাম কেটে লিচ্ছে !!! শুভেন্দু অধিকারীর প্রচার সভায় মাতব্বররা বলে দিয়েছে, তুমাদের ভোট লাই। বদলে যাওয়া মৌসম বরকতের মালদায় তৃণমূলের মূল চ্যালেঞ্জ। বলছেন, দিদিকে বলেই ছেড়েছি রাজ্যসভা। আমার মামাকে ছাড়তে পারিনি। দিদির তো কোনও আপত্তি নাই ! নিজের ঘরে ফিরব। তোমাদের নিয়েই ফিরব। অতএব আপাতত পদ্ম শিবিরের পিতার নাম খগেন। একদা আরএসপি করে বিধানসভায় জেতা আব্দুর রহিম বক্সির প্রাক্তন বাম পরিচয় পেলাম মামুন হকের কাছে। এগারোয় দিদি ছিলেন আমাদের সঙ্গে। ও ছিল উল্টোদিকে। আমাদের সিম্বল দেয়নি নতুন তৃণমূল। আমরা লড়েছিলাম কাপ প্লেটে । দিদি আমাদের সিম্বল দিতে না পারলেও পাশেই থেকেছেন। কত দেখেছি, এবার মৌসম বেনজীরভাবে নূর হয়ে এসেছে। তাকে দেখছি।
