বাংলা টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিতে মেগা সিরিয়ালের জয়যাত্রা যখন শুরু হয়েছিল, তখন থেকেই সেই যাত্রার অন্যতম এক কাণ্ডারি ছিলেন বিপ্লব দাশগুপ্ত। মেগাসিরিয়ালের ঝকঝকে দুনিয়ায় যেখানে অনেক সময় নামীদামি তারকারাও হারিয়ে যান, সেখানে বিপ্লব বাবু ছিলেন এক ব্যতিক্রমী ধ্রুবতারা। কেবল স্ক্রিন প্রেজেন্স নয়, তাঁর দাপুটে অভিনয় আর গম্ভীর কণ্ঠস্বরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিটি বাঙালির ঘরের প্রিয় মুখ।

মেগা সিরিয়ালের ছকবাঁধা চরিত্রের ভিড়েও বিপ্লব দাশগুপ্ত নিজেকে বারবার ভেঙেছেন। কখনও ‘ইষ্টিকুটুম’ বা ‘একুশে পা’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকে তাঁর উপস্থিতি গল্পে এনেছে নতুন মোড়। কখনও তিনি ছিলেন অত্যন্ত নীতিবান এক বাবা, আবার কখনও এমন এক প্রভাবশালী খলনায়ক, যাঁকে দর্শক যেমন অপছন্দ করেছেন, তেমনই তাঁর অভিনয় দক্ষতাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। খল চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল এক ধরণের শীতল আভিজাত্য, যা সচরাচর মেগা সিরিয়ালে দেখা যায় না।

শ্যুটিং ফ্লোরে বিপ্লব দাশগুপ্ত মানেই ছিল এক অন্যরকম শৃঙ্খলা। নতুন প্রজন্মের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীর কাছে তিনি ছিলেন একজন মেন্টর বা অভিভাবকের মতো। মেগার হেক্টিক শ্যুটিং শিডিউলের মাঝেও কীভাবে নিজের সংলাপের গভীরতা বজায় রাখা যায়, তা তাঁর কাছে শিখতেন জুনিয়ররা। ফ্লোরে তাঁর গম্ভীর রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকল এক রসিক মানুষ, যাঁর আড্ডায় সমৃদ্ধ হতেন সহকর্মীরা।

মেগা সিরিয়ালের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের শব্দ ছাপিয়েও দর্শকদের কানে যেটা সবার আগে পৌঁছত, তা হল তাঁর ভরাট ব্যারিটোন ভয়েস। কেবল সংলাপ বলার ভঙ্গিমা দিয়েই তিনি দৃশ্যের আবেদন বদলে দিতে পারতেন। অনেক সময় তাঁর সেই গম্ভীর স্বরই সিরিয়ালের টিআরপি বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

টলিউডের বড় পর্দা তাঁকে যথেষ্ট ব্যবহার করলেও, বাংলার আপামর গৃহবধূ থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শকদের কাছে বিপ্লব দাশগুপ্তের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছেছিল এই ছোটপর্দার হাত ধরেই। ‘মহাভারত’-এর মতো ডাব করা বাংলা সিরিয়ালে তাঁর কণ্ঠদান থেকে শুরু করে আধুনিক ফ্যামিলি ড্রামা— সবক্ষেত্রেই তিনি রেখে গিয়েছেন তাঁর নিজস্ব সিগনেচার। বিশেষ করে নয়ের দশকে টেলিভিশনের মেগাধারাবাহিক জন্মভূমিতে তাঁর অভিনয় আজও অনুরাগীদের কাছে উজ্জ্বল।

শুক্রবার বাংলা টেলি ধারাবাহিকের সেই কোঁকড়া চুলের খলনায়ক, কখনও নায়ক-নায়িকার রাগী বাবার চিরকালের মতো চলে যাওয়া মেগা সিরিয়ালের ফ্লোরে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করল। মেকআপ রুমের সেই আড্ডা কিংবা গম্ভীর মুখে পরিচালকের নির্দেশ নেওয়া— বিপ্লব দাশগুপ্তকে ছাড়া বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাস অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *