২০২১ সালের ২ মে। ঘড়ির কাঁটায় সময় সাড়ে ৬টা সবে পেরিয়েছে। বিধানসভা ভোটের ফলাফলে ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, জনরায়ে হ্যাটট্রিক করে ফের রাজ্যের ক্ষমতায় ফিরছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। খটকা শুধু একটাই। রাজ্যের সবচেয়ে হাইভোল্টেজ কেন্দ্র নন্দীগ্রামের রিপোর্ট কী? কে জিতলেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি তাঁরই দল ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে চলে যাওয়া শুভেন্দু অধিকারী? সে একবারে দড়ি টানাটানি খেলা। একসময়ে তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম আসন থেকে জয়ী হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে ‘ব্রেকিং নিউজ’-এর ঝলকানিও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই জয়ের সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয় শুভেন্দু অধিকারীর হাতে। মধ্যবর্তী সময়টা যথেষ্ট রহস্যময়। নন্দীগ্রামের সেই ফলাফল নিয়ে অবশ্য পরবর্তী সময়ে মামলা হয়। তা এখনও বিচারাধীন। তারই মধ্যে এসে গেল ছাব্বিশের নির্বাচন। এখানে এবারও গেরুয়া শিবিরের প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী।বিপক্ষে তাঁর একসময়ের ‘বন্ধু’ পবিত্র কর। দু’জনেরই সাজানো-গোছানো সংগঠন নিয়ে এবার এখানে মূলত কৌশলের লড়াই।
বঙ্গ রাজনীতিতে অবশ্য নন্দীগ্রাম বরাবরই হটস্পট। ২০০৭ সালে বাম সরকারেরর ‘অপারেশন সূর্যোদয়’-এর নৃশংসতা থেকে শুরু করে গণআন্দোলন, ভূমি উচ্ছেদ রক্ষা কমিটির প্রতিরোধ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসা পর্ব পেরিয়ে ২০২১ বিধানসভা ভোটের আগে প্রচার করতে গিয়ে বিরুলিয়া বাজারে দুর্ঘটনায় তাঁর পা ভাঙা, হুইলচেয়ারে বসে গোটা নির্বাচনী কর্মসূচি পালন – প্রতিটা দিন একেকটা নতুন কাহিনির জন্ম দিয়েছিল।
আরও পড়ুন:


বঙ্গ রাজনীতিতে অবশ্য নন্দীগ্রাম বরাবরই হটস্পট। ২০০৭ সালে বাম সরকারেরর ‘অপারেশন সূর্যোদয়’-এর নৃশংসতা থেকে শুরু করে গণআন্দোলন, ভূমি উচ্ছেদ রক্ষা কমিটির প্রতিরোধ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসা পর্ব পেরিয়ে ২০২১ বিধানসভা ভোটের আগে প্রচার করতে গিয়ে বিরুলিয়া বাজারে দুর্ঘটনায় তাঁর পা ভাঙা, হুইলচেয়ারে বসে গোটা নির্বাচনী কর্মসূচি পালন – প্রতিটা দিন একেকটা নতুন কাহিনির জন্ম দিয়েছিল। এবারও তার বিশেষ ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
আরও পড়ুন:
এই বিধানসভা কেন্দ্রের মোট ভোটারের সংখ্যা এই মুহূর্তে ২ লক্ষ ৬৮ হাজারের সামান্য বেশি। এসআইআরের পর বাদ পড়েছে ৩০৫০ জন। প্রায় ৯ হাজার ভোটার এখনও বিচারাধীন। ফলে ভোটের আগে পর্যন্ত এই সংখ্যা কিছুটা বদল হবে। নন্দীগ্রাম ১ ব্লকের দাউদপুর ১ অঞ্চল, সামসাবাদ ৭ অঞ্চল, কেন্দেমারি ৩ অঞ্চল, কালীচরণপুর ৯ অঞ্চল এবং নন্দীগ্রাম ২ ব্লকের বয়াল ১ ও আমদাবাদ ২ অঞ্চল মুসলিম অধ্যুষিত। এহেন মিশ্র জনজাতি বেষ্টিত নন্দীগ্রামের ভোটের লড়াই বাম পরবর্তী সময়ে বরাবরই বেশ জমজমাট হয়েছে। অবশ্য তার বহু কারণও আছে।


স্থানীয় সূত্রে খবর, নন্দীগ্রামে যতটা হিন্দুত্ব প্রদর্শন করছেন শুভেন্দু অধিকারী, ঠিক ততটাই হিন্দুত্বের উদযাপন করে থাকেন পবিত্র করও। এ বিষয়ে কেউ কারও চেয়ে একচুল কম যান না। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ভোটের অঙ্ক। তাহলে নন্দীগ্রামের হিন্দু ভোট কার ঝুলিতে ঢুকবে? বিজেপি নাকি তৃণমূল? সুযোগ ৫০-৫০।
গত ৫ বছরে নন্দীগ্রামে উন্নয়ন নিয়ে বিস্তর চর্চা হয়েছে। একপক্ষের অভিযোগ, রাজ্য সরকারের কোনও প্রকল্পের সুফল নন্দীগ্রামে পৌঁছয়নি। কারণটা প্রকাশ্যে না বললেও বুঝে নিতে কোনও অসুবিধা হয় না। এবারের ভোটে নন্দীগ্রামবাসী সেই উন্নয়নের লক্ষ্যে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন, সেটাই কাম্য। সেইসঙ্গে গত ৫ বছরে এখানে হিন্দুত্বের পালে হাওয়া লেগেছে ভালোই। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি নেতা হয়ে শুভেন্দু অধিকারীই সেখানে হিন্দুদের উৎসব যথেষ্ট জাঁকজমক সহকারে পালন করেছেন। দিন কয়েক আগেও তো সেখানে গিয়ে জনতার জমায়েতে স্পষ্ট মেরুকরণের রাজনীতি করেছেন। সাফ বলেছেন, ”সব হিন্দু ঘরে ঘরে গেরুয়া ধ্বজ উঠবে। হিন্দুদের এখানে আলাদা করে দিতে হবে। ওই মৌলবাদী, জেহাদিদের সঙ্গে হিন্দুরা একসঙ্গে থাকবে না।” তবে স্থানীয় সূত্রে খবর, নন্দীগ্রামে যতটা হিন্দুত্ব প্রদর্শন করছেন শুভেন্দু অধিকারী, ঠিক ততটাই হিন্দুত্বের উদযাপন করে থাকেন পবিত্র করও। এ বিষয়ে কেউ কারও চেয়ে একচুল কম যান না। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ভোটের অঙ্ক। তাহলে নন্দীগ্রামের হিন্দু ভোট কার ঝুলিতে ঢুকবে? বিজেপি নাকি তৃণমূল? সুযোগ ৫০-৫০।
তৃণমূল প্রার্থীর চ্যালেঞ্জ, ”এখন ওঁর (শুভেন্দু অধিকারী) ডানদিক, বাঁদিক, সামনে, পিছনে যাঁরা আছে, সবাই আমার লোক। ভোটের দিন আমার হয়ে কাজ করবে, মিলিয়ে নেবেন। ৩০ হাজার ভোটে আমি জিতব।” শুভেন্দু অবশ্য জয়ের ব্যাপারে খুবই আত্মবিশ্বাসী। প্রচারে বেড়িয়ে বেশি কথা নয়, তিনি শুধু বলছেন, ”আগেরবার প্রতীক দেখে ভোট হয়েছিল, এবার প্রার্থী দেখে মানুষ ভোট দেবেন। তাঁরাই জানেন, কাকে বেছে নিতে হবে।”
নন্দীগ্রামে যুযুধান দু’পক্ষের প্রার্থীই ভূমিপুত্র। তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর তো ‘ঘরের ছেলে’। তিনি নিজেই বলছেন, ”এখানে আমি প্রার্থী নই। সকলেরই ছেলে, ভাই, দাদা, বন্ধু। প্রতিটি ঘরে আমার আত্মীয়।” প্রতিপক্ষকে নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও ঠারেঠোরে পবিত্রবাবু বুঝিয়ে দিচ্ছেন, শুভেন্দু-বলয়ের ফাঁক গলে ঠিক এবার তাঁর জেতা গড় ছিনিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। তৃণমূল প্রার্থীর চ্যালেঞ্জ, ”এখন ওঁর (শুভেন্দু অধিকারী) ডানদিক, বাঁদিক, সামনে, পিছনে যাঁরা আছে, সবাই আমার লোক। ভোটের দিন আমার হয়ে কাজ করবে, মিলিয়ে নেবেন। ৩০ হাজার ভোটে আমি জিতব।” শুভেন্দু অবশ্য জয়ের ব্যাপারে খুবই আত্মবিশ্বাসী। প্রচারে বেড়িয়ে বেশি কথা নয়, তিনি শুধু বলছেন, ”আগেরবার প্রতীক দেখে ভোট হয়েছিল, এবার প্রার্থী দেখে মানুষ ভোট দেবেন। তাঁরাই জানেন, কাকে বেছে নিতে হবে।”
নন্দীগ্রাম ছাড়াও এবারের ভোটে শুভেন্দু ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী। মুখ্যমন্ত্রীকে হারাতে সেখানে বেশি সময় দিচ্ছেন তিনি। তবে কি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর পায়ের তলার মাটি কেড়ে নিতে পারে? আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষত যেখানে তাঁর ‘শত্রু’ পবিত্র কর। পাশাপাশি এও মনে রাখতে হবে, তৃণমূল প্রার্থী যতই ‘আপনজন’ হোন, শুভেন্দুর তুলনায় ‘লাইটওয়েট’।
তৃণমূল-বিজেপির তুমুল লড়াইয়ের মাঝে কিন্তু নন্দীগ্রামে নিজের মতো প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন বামপ্রার্থী শান্তি গিরি। তিনিও এলাকার ভূমিপুত্র। সিপিআই শিবিরের হয়ে লড়ছেন তিনি। সকাল-সন্ধ্যে প্রচারে বেরনো শান্তি গিরির বক্তব্য, ”এতকাল ধরে নন্দীগ্রামে কোনও কাজ হয়নি। প্রথমদিকে তৃণমূলের গুন্ডারাজ আর পরে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে লাগাতার বিজেপির গুন্ডামিতে অতিষ্ঠ এখানকার মানুষ। এখানে যে ধর্মীয় মেরুকরণ হচ্ছে এবং দলবদলের রাজনীতির বিরোধিতায় আমাদের লড়াই। আমি, এখানকার ভূমিপুত্র হিসেবে মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। আশা করি, মানুষ ভোটে আমাকে জেতাবেন।”


আইএসএফের হয়ে এখান থেকে লড়ছেন মহঃ সবেমিরাজ আলি খানের বক্তব্য, ”এখানে তৃণমূল, বিজেপি দুটো দলই সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করছে। শুভেন্দু অধিকারী তো তার মুখ। আর তৃণমূলের প্রার্থী পবিত্র কর ধার করা। সেই ধার শোধ দিতে হবে তৃণমূলকেই। এসবের বিরুদ্ধে আমাদের জয়ের সম্ভাবনা ১০০ শতাংশ।” জেলার রাজনৈতিক মহলের মত, এবারের ভোটে সিপিএম, আইএসএফ প্রার্থীরাও ভালো ভোট কাটতে পারেন।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
