অর্থনীতি, পরিচয়ের রাজনীতি, কল্যাণমূলক প্রকল্প, এবং সর্বোপরি আখ্যান বা ‘ন্যারেটিভ’ নিষ্পন্ন করা-এই চারটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক ভূগোল। একই ব্যক্তি/ ভোটার একদিকে সরকারি সুবিধার উপভোক্তা, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক; আবার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত। এই বহুমাত্রিকতা রাজনৈতিক দলগুলির জন্য চ্যালেঞ্জ, সুযোগও। লিখছেন দীপ্র ভট্টাচার্য।
ভারতের গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক তার বৈচিত্র, আর সবচেয়ে জটিল দিকও সেটিই। সামনে একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন- এ যেন শুধু ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং একাধিক স্তরে আখ্যান নির্মাণের প্রতিযোগিতা। অর্থনীতি, পরিচয়ের রাজনীতি, কল্যাণমূলক প্রকল্প, এবং সর্বোপরি আখ্যান বা ‘ন্যারেটিভ’ নিষ্পন্ন করা- এই চারটি স্তত্বকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক ভূগোল।
প্রথমেই আস্য যাক অর্থনীতির কথায়। সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যবৃদ্ধি- বিশেষত জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের দাম- সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অপ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘার, তেলের দামের আনামাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে এর প্রভাব সরাসরি পড়ে খুচরো বাজারে। ফলে কেন্দ্র ও রাজ্য, দু’-পক্ষই করনীতি ও ভরতুকির মাধ্যমে চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভোটের আগে এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা রাজনৈতিক ভাষ্যে কীভাবে অনুবাদিত হচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, কল্যাণমূলক রাজনীতি বা ‘ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স’ এখন নির্বাচনের কেন্দ্রে। বিভিন্ন রাজ্যে বিনামুলো রেশন, নগদ সহায়তা, বিদ্যুৎ ছাড়, বা মহিলাদের জন্য বিশেষ প্রকল্প-এসব উদ্যোগ ভোটারদের আচরণে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেখানে সরাসরি আর্থিক ব্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প কার্যকর হয়েছে, সেখানে ক্ষমতাসীনদের প্রতি এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়েছে। তবে এর বিপরীতে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে- এই মডেল কতখানি টেকসই। প্রজ্যের আর্থিক ঘাটতি বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কী হবে।
কল্যাণমূলক রাজনীতি বা ‘ওয়েলফেয়ার পলিটিক্স’ এখন নির্বাচনের কেন্দ্রে।
তৃতীয়ত, পরিচয় রাজনীতি বা ‘আইডেনটিটি পলিটিক্স’। ভাষা, ধর্ম, জাতপাত, আঞ্চলিক গর্ব এসবই নির্বাচনের সময় নতুন করে গুরুত্ব পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অর্থনৈতিক অসন্তোষকে ছাপিয়ে পরিচয়ের প্রশ্নই ভোটের মেরুকরণ ঘটায়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে এই প্রবণতা বাড়ছে, যেখানে তারা নিজের সাংস্কৃতিক বা সামাজিক পরিচয়কে ব্রজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করছে।


চতুর্থত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ‘ন্যারেটিভ’ বা আখ্যানের লড়াই। একদিকে উন্নয়ন, অবকাঠামো, এবং জাতীয় গর্বের গল্প। অন্যদিকে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন। রাজনৈতিক দলগুলি শুধু নীতির লড়াই করছে না, বরং মানুষের মনে কোন গল্পটি বেশি গ্রহণযোগ্য হবে, সেই লড়াইও চালাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া এই আখ্যান নির্মাণকে আরও দ্রুত ও তীব্র করে তুলেছে।
নির্বাচনে ‘ন্যারেটিভের লড়াই’ সরাসরি দেখায় কীভাবে তথ্য, মিডিয়া ও প্রযুক্তি ভোটারদের প্রভাবিত করে-
১) ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, এজনে প্রতি ২জনেরও বেশি ভোটার (৬০%) প্রচলিত মিডিয়ার বদলে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রাজনৈতিক তথ্য গ্রহণ করেন।
২) প্রায় ২৫% ভোটার একেবারেই প্রচলিত মিডিয়া ব্যবহার করেন না, ফলে ন্যারেটিভের বড় অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তৈরি হয়।
৩) ভারতে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ স্মার্টফোন
ব্যবহার করে, যা রাজনৈতিক বার্তা সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ বাড়ায়।
৪) দেশের ৬৫% জনসংখ্যা ৩৫ বছরের নিচে, এবং এই যুবসমাজ ন্যারেটিভ গঠন ও ভোটের প্রবণতা বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৫) একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৫১% মানুষ ‘ভুল’ তথ্য দেখে ‘বিশ্বাস’ করেছে বলে স্বীকার করেছে, যা নয়রেটিভ বিকৃত করতে পারে।
এখনকার নির্বাচনে ন্যারেটিভ কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়- এটি ডেটা, সোশ্যাল মিডিয়া, মুন ভোটার ও তথ্যপ্রবাহের সম্মিলিত প্রভাব, যা সরাসরি ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। আধুনিক নির্বাচনে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ (Al) ভোট ও শুচারণার প্রক্রিয়াকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। AI-ভিত্তিক ডেটা বিশ্লেষণ ভোটারের আচরণ ও পছন্দ শনাক্ত করে লক্ষ্যযুক্ত বার্তা পৌঁছে দেয়, যেখানে ছবি, ভিডিও বা টেক্সট ব্যবহার করে ন্যারেটিভ আরও প্রভাবশালী করা যায়। পাশাপাশি Al-চাটিবট ও স্বয়ংক্রিয় প্ল্যাটফর্ম ভোটারদের। সচেতনতা বাড়ায় এবং ভোট সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দেয়। তবে একই প্রযুক্তি ভুয়া তথ্য বা নির্বাচনী আখ্যান বিকৃত করতেও ব্যবস্থার হতে পারে, তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সত্যতা বজায় রাখা এখন ভোটের প্রতিফলন ও গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন শুধু ‘কে জিতবে এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। বরং দেখতে হবে কোন ধারণা, কোন অর্থনৈতিক মডেল, এবং কোন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ভোটারদের মধ্যে বেশি সাড়া ফেলছে। কারণ এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণ বদলাবে না, বরং জাতীয় রাজনীতির দিকনির্দেশও অনেকটাই নির্ধারণ করবে।
এখনকার নির্বাচনে ন্যারেটিভ কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়- এটি ডেটা, সোশ্যাল মিডিয়া, মুন ভোটার ও তথ্যপ্রবাহের সম্মিলিত প্রভাব, যা সরাসরি ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
নির্বাচনের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল-ভোটারের মনস্তব্ধ, যা প্রায়শই পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়। ভারতের মতো দেশে ভোটার আচরণ কখনওই একমাত্রিক নয়। একই ব্যক্তি একদিকে সরকারি সুবিধার উপভোক্তা, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক, আবার একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত। এই বহুমাত্রিকতা রাজনৈতিক দলগুলির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনই সুযোগ।
সাম্প্রতিক কিছু জরিপ ও নির্বাচনী বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় যে, তরুণ ভোটারদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এই গোষ্ঠী একদিকে ডিজিটালভাবে সংযুক্ত, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের প্রশ্নে সংবেদনশীল। তাদের কাছে শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো এখন সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারের পাশাপাশি ‘ডেলিভারি’ বা কাজের হিসাব তুলে ধরতে বাধ্য হচ্ছে।
মহিলা ভোটাররাও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে। উঠছেন। বিভিন্ন রাজ্যে দেখা গিয়েছে, মহিলা কেন্দ্রিক প্রকল্প, যেমন: নগদ সহায়তা, স্বাস্থ্যসেব, ব রান্নার গ্যাস ভরতুকি ভোটের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রে মহিলাদের ভোটের ধরন পুরুষদের থেকে আলাদা, যা নির্বাচনের সমীকরণকে নতুন মাত্রা দেয়।
নির্বাচনে এখন শুধু অর্থনীতি ও পরিচয় নয়, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গ্রীষ্মের প্রবল তাপপ্রবাহ, বর্ষার বন্যা, বা জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট কৃষি ক্ষতি ভোটারদের চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে যেখানে কৃষকরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছেন, পরিবেশবান্ধব নীতি ও প্রকল্পা নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। শহরাঞ্চলে প্লাস্টিক বর্জা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ বা সবুজ প্রযুক্তি ইস্যু তরুণ এবং শিক্ষিত ভোটারদের কাছে বড় প্রভাব ফেলে।
আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, হল, গ্রাম গ্রাম ও ও শহরের বিভাজন। শহরে যেখানে অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান বড় ইসু্যু সেখানে গ্রামে কৃষি, মূল্য সহায়তা, এবং স্থানীয় উন্নয়ন বেশি গুরুত্ব পায়। এই দুই ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি কর
রাজনৈতিক দলগুলির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এবার আসা যাক তথ্য ও পরিসংখ্যানের প্রসঙ্গে। নির্বাচনী ডেটা বিশ্লেষণ দেখায়, ভোটের ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রেই খুব কম কয়েক শতাংশ ভোটের হেরফেরেই ফলাফল বদলে যায়। এর মানে, ‘সুইং ভোটার’ বা দোদুল্যমান ভোটারদের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এই গোষ্ঠী কোনও নির্দিষ্ট দলের প্রতি অনুগত নয়, বরং পরিস্থিতি ও ইস্যু অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে প্রচার, জোট গঠন, এবং প্রার্থী নির্বাচন- সবকিছুই নির্ণায়ক হয়ে ওঠে।
নির্বাচনের আর-একটি বড় প্রশ্ন হল, গণতন্ত্রের গুণগত মান। নির্বাচন শুধু সংখ্যার খেলা নয়। এট প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা, এবং জনবিশ্বাসের ওপরও নির্ভর করে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই তীর হোক, ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩জনে প্রতি ২জনেরও বেশি ভোটার (৬০%+) প্রচলিত মিডিয়ার বদলে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রাজনৈতিক তথ্য গ্রহণ করেন। প্রায় ২৫% ভোটার প্রচলিত মিডিয়া ব্যবহার করেন না, ফলে ন্যারেটিভের বড় অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তৈরি হয়।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অটুট রাখা জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত, ভোটের ফলাফল শুধু সরকার বদলায় না-এটি দেশের ভবিষ্যৎ পথচলাকেও প্রভাবিত করে। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই বলা যায়, আসন্ন রাজ্য নির্বাচনগুলি একদিকে যেমন ক্ষমতায় লড়াই, অন্যদিকে তেমনই একটি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কের প্রতিফলন। ভোটাররা কেবল নেতা বা দল বেছে নেবেন না। তারা বেছে নেবেন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা আগামী দিনের রূপরেখা নির্ধারণ করবে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক ম্যানেজমেন্ট কসসানট্যান্ট ও
mail@[email protected]
সর্বশেষ খবর
