ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘনীভূত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলারের দিকে এগোনোর প্রেক্ষিতে ফের আলোচনায় এসেছে চিন-ইরান তেল বাণিজ্যের এক বিশেষ অর্থনৈতিক কাঠামো।
বিনিয়োগ পরামর্শদাতা সৌরভ জৈনের দাবি, বিষয়টি শুধু ভূরাজনীতি নয়—এটি একটি আর্থিক কাঠামোর প্রশ্ন, যার কেন্দ্রে রয়েছে চিনের তুলনামূলক ছোট বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক ব্যাঙ্ক অফ কুনলুন। এই ব্যাঙ্কটি চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা সিএনপিসি-র নিয়ন্ত্রণে।
‘ডলারবিহীন লুপ’ কী?
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের জন্য ডলারে লেনদেন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লে চিন ইউয়ানে তেল কেনা শুরু করে। জৈনের বক্তব্য অনুযায়ী, চিন মাসে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ইরানি তেল কিনত—কিন্তু ডলারে নয়, ইউয়ানে।
চিনের সরকারি কাস্টমস তথ্য অনুযায়ী সরাসরি ইরান থেকে আমদানির তথ্য শূন্য দেখালেও ‘মালয়েশিয়া’ থেকে তেল আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়—যা মালয়েশিয়ার মোট উৎপাদনের চেয়েও বেশি। অভিযোগ, ইরানি তেল জাহাজে করে অন্য দেশে গিয়ে নতুন সার্টিফিকেট পেয়ে ‘মালয়েশিয়ান’ তেল হিসেবে চিনে প্রবেশ করত।
এই লেনদেনের অর্থ জমা হত ব্যাঙ্ক অফ কুনলুন-এ ইউয়ান হিসাবে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান সেই অর্থ ডলারে রূপান্তর করতে পারত না। ফলে সেই ইউয়ান মূলত চিনের ভেতরেই খরচ হত—চিনের যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স, অবকাঠামো ও অন্যান্য পণ্য কেনায়।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি ছিল একটি ‘ক্লোজড লুপ’—
ইরান ইউয়ান পেল → ইউয়ান দিয়ে চিনা পণ্য কিনল → অর্থ চিনের আর্থিক ব্যবস্থাতেই রইল → ডলারের প্রয়োজন পড়ল না।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও কুনলুন
২০১২ সালে মার্কিন ট্রেজারি ব্যাঙ্ক অফ কুনলুন-কে ইরানি ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনের অভিযোগে নিষিদ্ধ করে। তবে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকায়, চিন সরকার এটিকে উচ্চ-ঝুঁকির বাণিজ্যের জন্য সীমিত চ্যানেল হিসেবে চালু রাখে।
এক ব্রিটিশ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক ডেভিড উইলিয়াম স্কটের দাবি, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেলই চিনে রপ্তানি হত, ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০ ডলার ছাড়ে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ লক্ষ ব্যারেল তেল ইউয়ানে লেনদেন হত।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য অশান্ত হলেই তেল দাম বেড়েছে লাফিয়ে, ২৫-৩০০%, এবারও কি তাই?
ইউয়ান, যুদ্ধ ও বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
Bloomberg Intelligence-এর স্টিফেন চিউ এক নোটে উল্লেখ করেছেন, ইরান যুদ্ধের সময় ইউয়ানের দরপতন চিনের জন্য কৌশলগতভাবে অপ্রত্যাশিত নাও হতে পারে। চিনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার মেনেই মুদ্রা ব্যবস্থাপনা হতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের।
বিশ্ব অর্থনীতির বিচারে এই চ্যানেল আকারে ছোট হলেও, ডলারবিহীন তেল লেনদেনের ধারণা—যা ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বিতর্ককে উসকে দেয়—আবারও আন্তর্জাতিক নজরে এসেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে, এই বিকল্প পেমেন্ট কাঠামো কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েই এখন জল্পনা তুঙ্গে।
