ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই-র মৃত্যুর খবর ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। দেশের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ইরান হামলা আরও তীব্র করার ইঙ্গিত দিয়েছে। 

এই পরিস্থিতে প্রশ্ন হল  পশ্চিম এশিয়ায় এই উত্তেজনা জ্বালানি ক্ষেত্রেকে কতটা প্রভাবিত করবে?

বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ ইমান জলালি সতর্ক করেছেন—ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি, যাতে শীর্ষ নেতার হঠাৎ অনুপস্থিতিতেও ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ পরিষদ দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ করতে পারে।

তবে জলালির আশঙ্কা, নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর ইরান আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
বিশেষ করে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-র প্রভাব বাড়তে পারে।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ইউবিএস জানিয়েছে, অপরিশোধিত তেলের দাম গোটা কার্ভ জুড়েই বাড়তে পারে, বিশেষ করে সামনের মেয়াদে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের প্রায় ২০% তেল সরবরাহ এই পথ দিয়ে যায়।

রাইস্টাড এনার্জির হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই চোকপয়েন্ট অতিক্রম করে—যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের প্রায় ৩০%। 

সৌদি আরব ও ইউএই বিকল্প পাইপলাইন ব্যবহার করলেও ৮–১০ মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৬৫ ডলার থেকে বেড়ে ৭২–৭৩ ডলারে পৌঁছেছে।
রাইস্টাডের বিশ্লেষক হোর্হে লিওনের আশঙ্কা, পরিস্থিতি না সামলালে এক লাফে ব্যারেলপিছু ১৫ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সংঘাত তীব্র, ভারতীয়দের সতর্কবার্তা নয়াদিল্লির; একাধিক দেশে আকাশসীমা বন্ধ

ভারতের ক্ষেত্রে কতটা ঝুঁকি

ভারতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও স্পষ্ট। দেশের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫০%—অর্থাৎ প্রতিদিন ২.৫ থেকে ২.৭ মিলিয়ন ব্যারেল—হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে।

এই সরবরাহ মূলত ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও কুয়েত থেকে।
হরমুজে বিঘ্ন ঘটলে ভারতের মাসিক তেল আমদানির অর্ধেক এবং প্রায় সব এলপিজি সরবরাহ প্রভাবিত হতে পারে।

তবে কিছু সুরক্ষা বলয় রয়েছে। কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল বাণিজ্যিক মজুত রয়েছে।

এর সঙ্গে রয়েছে প্রায় ৩৯ মিলিয়ন ব্যারেল কৌশলগত পেট্রোলিয়াম ভাণ্ডার—মঙ্গলুরু, পাদুর ও বিশাখাপত্তনমে। এই মজুত মিলিয়ে প্রায় ৬০ দিন আমদানি চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে বিশ্লেষকদের মত।

কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী রাজ্যসভায় জানিয়েছেন, ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কায় দেশের কৌশলগত মজুত ৭৪ দিন পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে সক্ষম। তবে ভারতীয় শক্তি সংস্থার মতে, আদর্শভাবে ৯০ দিনের মজুত থাকা উচিত।

সরকার ২০২১ সালে ওড়িশার চাঁদিখোল ও কর্নাটকের পাদুরে আরও ৬.৫ মিলিয়ন টন নতুন ভাণ্ডার তৈরির অনুমোদন দিলেও কাজ এখনও এগোয়নি।

গ্যাস বাজারেও চাপ বাড়তে পারে। কাতারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি এবং ব্রেন্ট-সংযুক্ত মূল্য কাঠামোর কারণে তেলের দাম বাড়লে গ্যাসের দামও বাড়বে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এলএনজি প্রকল্প চালু হচ্ছে, তবুও তা তাৎক্ষণিকভাবে বৈশ্বিক ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ক্ষেত্রে প্রথম ধাক্কা সরবরাহ নয়, বরং দামে। ব্রেন্ট বেড়ে গেলে পরিবহন খরচ, বিমা প্রিমিয়াম ও আমদানি ব্যয় বাড়বে—যার প্রভাব পড়বে মুদ্রাস্ফীতি ও চলতি হিসাব ঘাটতিতে।

রাশিয়ার তেল সরবরাহ বিকল্প হতে পারে। আরব সাগরে ভাসমান রুশ তেলের কার্গো দ্রুত ভারত ও চীনের রিফাইনারির দিকে ঘুরে যেতে পারে।

তবু দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত হলে জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।

এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটাই—হরমুজ খোলা থাকবে তো?  তার উত্তরেই নির্ভর করছে ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের আগামী দিকনির্দেশ।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *