সালমোনেলা অতীত। এখন পান-রসে মজেছে ইউরোপ। সঙ্গী মরু শহর দুবাই, বাহরিন, কাতারও। তাদের পান-রসনা ভরাচ্ছে মেদিনীপুরের পানচাষিরা। অথচ, এই পানেই সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া ধরা পড়ার পর একের পর এক দেশ তা নিতে বেঁকে বসেছিল। বাতিল হচ্ছিল কনসাইনমেন্ট। কিন্তু সেই সমস্যা কাটিয়ে এখন ইউরোপের বাজার ধরেছে মেদিনীপুরের পান। সাহেবরা পান-রসের রসিক হয়ে উঠেছেন। রপ্তানি বেড়েছে অনেক। এখন লন্ডনের সঙ্গে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, জার্মানিও পানের রসিক হয়ে উঠেছে। সঙ্গে জুড়েছে অস্ট্রেলিয়ার বাজার। আর প্রতিবেশী ভুটান, বাংলাদেশ, নেপাল তো আছেই। প্রতিদিন আড়াই হাজার কেজি পান কেনে লন্ডন। এখানে যা পিস দরে বিক্রি হয়, সেটাই ওজনে কেনেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা, যা চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। আর শুধুই কি পান, তার সঙ্গে নানারকম মশলা এবং সুপুরিও যাচ্ছে কলকাতার বিমানবন্দর থেকে উড়ানের পেটে ভরে।

ফাইল ছবি।

আরও পড়ুন:

দক্ষিণ ভারতে প্রচুর পান যায় পূর্ব মেদিনীপুর থেকে। মেচেদা থেকে একাধিক ট্রেনই আছে যেগুলিতে একাধিক ভেন্ডার বগি জোড়া হয়েছে গুজরাত, মুম্বই বা দক্ষিণ ভারতে শুধু পান পাঠানোর জন্য। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগরদ্বীপ, নামখানা, কাকদ্বীপে প্রচুর পান উৎপন্ন হলেও তার কদর কিন্তু ইউরোপের দেশগুলিতে খুব একটা নেই। কারণ, ওই সব পানের পাতা মোটা। মোলায়েম নয়, তাই সাহেবদের গলায় লাগে। সেখানে পূর্ব মেদিনীপুরের পান অনেক নরমসরম। তবে আবার সমুদ্র উপকূলবর্তী দিঘা, রামনগরের পানও এক্ষেত্রে ব্রাত্য। বরং ময়না, তমলুক, নন্দকুমারের পানের বেশি চাহিদা। সেখানকার রাধামণি, নিমতৌড়ি আড়ত থেকেই পান কেনেন রপ্তানিকারকরা। তারপর ঝাড়াই-বাছাই হয়ে বিশেষভাবে প্যাকেজিংয়ের পর তা তুলে দেওয়া হয় বিমানে। সঙ্গী হয় পানমশলা, সুপুরি। ভুটান ও নেপালেও পান যায় বিমানে। তবে বাংলাদেশে অনেক সময় পাঠানো হয় সড়কপথেই।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগরদ্বীপ, নামখানা, কাকদ্বীপে প্রচুর পান উৎপন্ন হলেও তার কদর কিন্তু ইউরোপের দেশগুলিতে খুব একটা নেই। কারণ, ওই সব পানের পাতা মোটা। মোলায়েম নয়, তাই সাহেবদের গলায় লাগে। সেখানে পূর্ব মেদিনীপুরের পান অনেক নরমসরম।

ওয়েস্ট বেঙ্গল ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সম্পাদক অঙ্কশ সাহা বলেন, “পানের চাহিদা অনেক বেড়েছে। সাহেবরাও পান-রসে মজেছেন। ইউরোপের দেশগুলিতে ব্যবসা বাড়ছে। যাচ্ছে সুপারিও।” পশ্চিমবঙ্গ কৃষি বিপণন দপ্তরের এক কর্তা বলেন, “পানচাষ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এক সময় ঠিকঠাক সচেতনতার অভাবে পাখির বিষ্ঠা থেকে তৈরি ব্যাকটেরিয়া সালমোনেলা থাকত পানে। তা ধরা পড়ায় রপ্তানিতে সমস্যা হয়েছিল বছর পাঁচেক আগে কিছুটা। তবে এখন সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠেছেন চাষিরা। এখন শুধু ইউরোপের দেশ কেন, বাহরিন, সৌদি আরবও তো আমাদের পানে মজেছে।” কেন্দ্রীয় রপ্তানি বিভাগের এক কর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ভারত থেকে পান রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬.১৮ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর ছিল ৩.৫৬ মিলিয়ন ডলার। ২০২১-২২ সালে, শুধুমাত্র বাংলা ৪.১৫ মিলিয়ন ডলারের পান রপ্তানি করেছে। আর ২০২৪-‘২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪.৪৭ মিলিয়ন ডলারে। আর সুপারির রপ্তানির হিসেব তার জোগাড় করার মতোই কঠিন। কারণ, বঙ্গে সুপারি প্রচুর পরিমাণে হয় না।

ফাইল ছবি।

পশ্চিমবঙ্গে সুপারি চাষ মূলত উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার কালচিনি, ফালাকাটা, কুমারগ্রাম, আলিপুরদুয়ার-১ ও ২ ব্লকে বেশি এছাড়া উত্তর দিনাজপুর এবং জলপাইগুড়িতে বাণিজ্যকভাবে চাষ হয়। তবে তা চাহিদা মেটাতে পারে না। ফলে পাশের রাজ্য অসমের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় রপ্তানিকারকদের। কিন্তু সেখানেও আবার আইনি গেরো। কারণ, রাস্তায় চেকিং চলে সাংঘাতিকভাবে। উত্তর পূর্বাঞ্চলে সুপারি মায়ানমার থেকে চোরাপথে আসে, সেই কারণেই কাস্টমসের অতি সক্রিয়তা রয়েছে সুপারিকে ঘিরে। কিন্তু সুপারির গায়ে তো আর দেশ বা রাজ্যের নাম লেখা থাকে না। চেনাও যায় না সুপারি কোথাকার। কিন্তু ঝামেলা থাকেই। ফলে অসম থেকে সুপারি আনার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কুচো করে সরাসরি পানে দেওয়ার মতো করে বানিয়ে রপ্তানি করা হয়। সঙ্গী হয় পান। সুপারির ক্ষেত্রে বড় কোনও সমস্যা না হলেও পানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হয়। তার উপর আবার কোনও রাসায়নিকও ব্যবহার করা যায় না তার পচন রোধে। কারণ, সে ক্ষেত্রে ইউরোপের দেশগুলো তা বাতিল করতে পারে। তবে সব বাধা টপকে এখন বিদেশে পান রসনা তৃপ্তির অঙ্গ হয়ে উঠেছে। পান-রস হজম ক্ষমতা বাড়ায়। সঙ্গে রয়েছে অন্য গুণও। তাই সেই পান এখন লক্ষ্মীর ঝাঁপি ভরাচ্ছে রপ্তানিকারক থেকে চাষিদেরও।

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *