সুজনকুমার দাস:​ মানবেতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং ভয়ংকর ঘটনা কোনটি? আপনার মনে হতে পারে, বড় কোনও মহামারী বা বিশ্বযুদ্ধের কথা। কিন্তু জেনেটিক্সের তথ্য বলছে অন্য কথা। প্রায় ৮ হাজার বছর আগে, মানুষের জীবনে এমন এক মহাপ্রলয় ঘটেছিল, যা কোনও রক্তপাতহীন যুদ্ধ বা মারণাস্ত্র ছাড়াই পুরুষের বিশাল অংশের বংশধারা পৃথিবী থেকে মুছে দিয়েছিল।

এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘নিওলিথিক জেনেটিক বট্‌লনেক’। সহজ ভাষায়,
এটি মানবেতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রজননগত সংকট। আর আশ্চর্যের বিষয় হল, এই সংকটের প্রভাব এখনও আপনার প্রেম, বিয়ে এবং জীবনের প্রতিটি পছন্দে মিশে আছে।
২০১৫ সালে একদল গবেষক যখন মানুষের ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করছিলেন, তখন তঁারা এক অদ্ভুত অমিল খুঁজে পান। মানবশরীরে দুই ধরনের জিনগত ছাপ থাকে– একটি মায়ের কাছ থেকে আসা (Mitochondrial DNA) এবং অন্যটি বাবার কাছ থেকে আসা
(Y-Chromosome)। গবেষণায় দেখা গেল, ইতিহাসের ওই নির্দিষ্ট সময়ে নারীদের বংশগতি বা বৈচিত্র ছিল একদম স্বাভাবিক। অর্থাৎ, প্রায় সব নারীই সন্তান প্রসবে সক্ষম ছিল। কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে চিত্রটা ছিল ভয়াবহ। কোথাও কোথাও প্রতি ১৪-১৭ জন নারীর বিপরীতে মাত্র একজন পুরুষ প্রজননের সুযোগ পাচ্ছিল। অর্থাৎ, বিপুল সংখ্যক পুরুষ ইতিহাসে বেঁচে থেকেও ইতিহাসে কোনও ছাপ রাখতে পারেনি। অর্থাৎ, একটি গ্রামে যদি ৮৫ জন পুরুষ এবং ৮৫ জন নারী থাকে, তবে ৮৫ জন নারীই মা হচ্ছে, কিন্তু বাবা হচ্ছে মাত্র ৫ জন পুরুষ। বাকি ৮০ জন পুরুষ বেঁচে থাকলেও ইতিহাসে তাদের কোনও চিহ্ন নেই। তারা ‘জেনেটিক
ডেড এন্ড’।কিন্তু কেন এমন হল?

প্রথমে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন হয়তো বড় কোনও যুদ্ধে পুরুষরা মারা গিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ হলে তো নারীরাও মারা যেত, জনসংখ্যার গ্রাফও নিচে নামত। কিন্তু জেনেটিক ডেটা বলছে, জনসংখ্যা কমেনি, বরং বাড়ছিল।

তাহলে কি কোনও মারণ অসুখ ছিল, যা শুধু পুরুষদেরই হত? তারও কোনও প্রমাণ মেলেনি।
আসল কারণটি ছিল অনেক বেশি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক। মানুষ যখন যাযাবর জীবন ছেড়ে চাষবাস বা কৃষিকাজ শুরু করে, তখনই এই সমস্যার বীজ বপন হয়। শিকারি-জীবনে মানুষ যা পেত ভাগ করে খেত। কারও কাছে অনেক বেশি সম্পদ জমানোর সুযোগ ছিল না। কিন্তু কৃষি বিপ্লব আসার পর মানুষের হাতে সম্পদ জমানোর ক্ষমতা এল। যার যত বেশি জমি, তার তত বেশি ক্ষমতা।

এই প্রথম সমাজে ‘উত্তরাধিকার’ প্রথা শুরু হল। একজন সফল কৃষকের ছেলে বাবার জমি পেল, আর একজন গরিবের ছেলে কিছুই পেল না। এইভাবে সম্পদের পাহাড় কিছু মুষ্টিমেয় পুরুষের হাতে চলে গেল। আর এই ক্ষমতাধর পুরুষরাই সমাজের সব নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল। তারা এক-একজন একাধিক নারীসঙ্গী রাখল, আর সমাজের সাধারণ বা গরিব পুরুষরা পুরোপুরি ব্রাত্য হয়ে পড়ল। তাদের সঙ্গী জুটল না, ফলে তাদের রক্তধারা পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল।

এখানে একটি বড় প্রশ্ন আসে– নারীরা কেন এটি মেনে নিয়েছিল? তাদের কি বাধ্য করা হয়েছিল, না কি এটি ছিল স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত? বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টি সহজ হয়ে যায়।

সেই প্রাচীন এবং কঠোর পৃথিবীতে একজন নারীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তার সন্তানের সুরক্ষা এবং খাবার নিশ্চিত করা। একজন গরিব পুরুষ, যার কোনও জমি বা সম্পদ নেই, তার সঙ্গে থাকলে সন্তানের না-খেয়ে মরার ঝুঁকি ছিল অনেক বেশি। অন্যদিকে, একজন ক্ষমতাশালী বা সম্পদশালী পুরুষের সঙ্গী হলে, সন্তানদের বেঁচে থাকার গ্যারান্টি বেড়ে যেত। এটি কোনও নৈতিকতার বিষয় ছিল না, ছিল স্রেফ বেঁচে থাকার লড়াই। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয়– ‘হাইপারগ্যামি’– উচ্চমর্যাদা বা বেশি সম্পদের সঙ্গী বেছে নেওয়ার প্রবণতা। কৃষি বিপ্লব এই প্রবণতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল।

আমরা এখনও সেই উত্তরাধিকার বহন করছি। বর্তমানে আপনি যখন কোনও ডেটিং অ্যাপ দেখেন, বা সমাজের বিভিন্ন সম্পর্কের সমীকরণ দেখেন, দেখবেন– সেখানে এখনও এক ধরনের ‘অসমতা’ কাজ করে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ডেটিং অ্যাপগুলোতে মাত্র
১০-২০ শতাংশ পুরুষ অধিকাংশ নারীর মনোযোগ পায়। অবশ্যই আধুনিক সমাজ নিওলিথিক যুগের মতো নয়, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক প্যাটার্নের একটি প্রতিফলন সেখানে পাওয়া যায়।
এখনও এই মানসিক কাঠামোর প্রতিফলন আমরা পাত্র-পাত্রী বিজ্ঞাপনেও স্পষ্টভাবে দেখি। সেখানে পাত্রের ক্ষেত্রে প্রথমেই গুরুত্ব পায় তার চাকরি, আয়, সম্পত্তি ও সামাজিক অবস্থান–‘সুপ্রতিষ্ঠিত’, ‘ভাল চাকুরিজীবী’, ‘নিজবাড়ি’, ‘পারিবারিক সম্পত্তি’ ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে।

আর, পাত্রীর ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় সৌন্দর্য, ব্যবহার ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে– ‘সুশ্রী’, ‘ঘরোয়া’, ‘সংস্কৃতিমনা’, ‘সুন্দরী’, ‘গাত্রবর্ণ’, ‘রান্না জানে’ ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রমই। হালে আমরা প্রযুক্তির শিখরে দঁাড়িয়ে, আইন ও শিক্ষা দিয়ে সমাজকে অনেক বেশি সভ্য করেছি। তবু সম্পর্কের বাজারে, বিয়ে বা সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে, আমরা এখনও সেই পুরনো মাপকাঠি বয়ে নিয়ে চলেছি– কে কতটা প্রতিষ্ঠিত, কে কতটা নিরাপত্তা দিতে পারবে, কে সামাজিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য। রূপ বদলেছে, ভাষা ভদ্র হয়েছে, কিন্তু ভিতরের কাঠামো খুব

বেশি বদলায়নি। নিওলিথিক বট্‌লনেক এখন আর জেনেটিক বিপর্যয় নয়, কিন্তু তার মানসিক উত্তরাধিকার এখনও আমাদের পছন্দ, প্রেম আর সম্পর্কের ভিত গড়ে দিচ্ছে। কেন এমন হয়? কারণ আমাদের জিনের স্মৃতি খুব প্রখর। হাজার-হাজার বছর ধরে আমাদের মস্তিষ্কে এই বার্তাটি গেঁথে গিয়েছে যে সম্পদ, ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদাই হল একজন পুরুষের সফলতার মাপকাঠি। আমাদের সমাজ আধুনিক হয়েছে, আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, কিন্তু আমাদের জৈবিক প্রবৃত্তি এখনও সেই প্রাচীন কৃষি সমাজের নিয়মেই চলছে।

এই গল্পের একটি অদ্ভুত ও চমকপ্রদ দিক আছে। বর্তমান পৃথিবীতে যত পুরুষ বেঁচে আছে, তারা সবাই কিন্তু সেই সফল অল্প শতাংশ পুরুষের উত্তরসূরি। আমাদের অস্তিত্বই প্রমাণ
করে যে, ৮ হাজার বছর আগে আমাদের কোনও এক পূর্বপুরুষ সেই চরম প্রতিযোগিতার যুগে নিজের ক্ষমতা বা সম্পদ দিয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে পেরেছিল। আমরা প্রত্যেকের আসলে ‘বিজয়ীর সন্তান’। যারা হেরে গিয়েছিল, তাদের কথা বলার মতো কেউ পৃথিবীতে বেঁচে নেই। আমাদের ডিএনএ-তে সেই প্রাচীন একাধিপত্যের এবং সংগ্রামের ছাপ স্পষ্ট।
‘নিওলিথিক জেনেটিক বট্‌লনেক’ আমাদের সামনে এক ভয়ংকর আয়না ধরে। সেখানে দেখা যায়, প্রকৃতির চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে মানুষের তৈরি সামাজিক কাঠামো। কোনও রক্তপাত ছাড়াই আমরা চাইলে আমাদের নিজের প্রজাতির একটি বিশাল অংশকে বিলুপ্ত করে দিতে পারি– কেবল বৈষম্য এবং সম্পদ কুক্ষিগত করার মাধ্যমে। মানুষ কেবল জিনের গোলাম নয়, বরং মানুষ তার নিজের তৈরি করা অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও এক অদ্ভুত বন্দি।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক
[email protected]

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *