প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমানের জন্য দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। জামাতের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। যা রাসুল (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। একা নামাজ পড়ার চেয়ে জামাতে নামাজ আদায় করার গুরুত্ব অনেক বেশি। জামাতে নামাজ আদায় করা আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়। হজরত ওসমান (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘মহান আল্লাহ জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়কারীর ওপর সন্তুষ্ট হন।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ ২/১৬৩)

মহান আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহ ও মেহেরবানিতে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের মধ্যে বান্দার জন্য প্রভূত সওয়াব ও কল্যাণ রেখেছেন। জামাতের উদ্দেশে মসজিদের দিকে পথচলা এমন একটি আমল, যার বিনিময়ে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। জামাতের উদ্দেশে মসজিদে গেলে এর প্রতি কদমে বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহ মাফ হতে থাকে।  জামাতের জন্য অপেক্ষা করাও নামাজে রত থাকার সমতুল্য। আবার জামাতের পর ওই স্থানে বসে থাকলে ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করতে থাকেন। হজরত ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা একাকী নামাজ পড়ার তুলনায় ২৭ গুণ বেশি সওয়াব রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি ৬৪৫)

জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়লে খুশু-খুজু (একাগ্রতা) সহকারে নামাজ আদায় করা সহজ হয়। এছাড়া মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় মুসলমানদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতি বৃদ্ধির এক ফলপ্রসূ ও কার্যকর মাধ্যম। যারা সর্বাবস্থায় মসজিদমুখী, মসজিদের সঙ্গে যাদের আন্তরিক সম্পর্ক, আজান হলেই সবকিছু ফেলে মসজিদের দিকে ছুটে আসে জামাতে নামাজ আদায় করার জন্য, তাদের জন্য কেয়ামতের ভয়ংকর দিনে আল্লাহর আরশের ছায়ায় জায়গা বরাদ্দ থাকবে।

নিয়মিতভাবে প্রথম তাকবিরের সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করে জাহান্নাম ও মুনাফিকি হতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে একাধারে ৪০ দিন তাকবিরে উলার (প্রথম তাকবির) সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করবে, মহান আল্লাহ তাকে দুটি মুক্তির ছাড়পত্র দেবেন। একটি জাহান্নাম থেকে মুক্তি, অপরটি মুনাফিকি হতে মুক্তি।’ (তিরমিজি ২৪১)

রাসুল (সা.) সারাজীবনে কখনো জামাত ত্যাগ করেননি। এমনকি অসুস্থ অবস্থায় যখন নিজে হেঁটে মসজিদে যেতে অক্ষম হন, তখনো দুজন লোকের কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে গেছেন, তবুও জামাত ছাড়েননি। নামাজের জামাতে উপস্থিত না হওয়ার ব্যাপারে কঠিন সতর্কবাণী উচ্চরণ করেছেন রাসুল (সা.)। তিনি বলেছেন, ‘যদি কোনো লোক মানুষদের বকরির একটি হাড় বা পা নেওয়ার জন্য ডাকে, তাহলে তারা অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে আসবে। অথচ তাদের জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করার জন্য ডাকা হলে তারা জামাতে শরিক হয় না। আমার ইচ্ছা হয়, লোকদের জামাতের সঙ্গে নামাজ আয়োজনের নির্দেশ দিই। তারপর ওই লোকদের কাছে যাই, যারা আজান শুনেছে, কিন্তু জামাতে উপস্থিত হয়নি এবং আমি তাদের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিই। জামাত থেকে একমাত্র মুনাফিকই বিরত থাকে।’ (আল-মুজামুল আওসাত ২৭৬৩)

অনেক হাদিস বিশারদ এই হাদিসের মাধ্যমে জামাতে নামাজ আদায় ওয়াজিব বলে উল্লেখ করেছেন। কেননা এতে জামাত বর্জনকারীর ব্যাপারে কঠিন সতর্কবাণী বর্ণিত হয়েছে এবং তাকে মুনাফিক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর এ জাতীয় সতর্কবাণী কেবল ওয়াজিব কোনো আমল ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে এ হাদিসে এ কথাও স্পষ্ট যে, জামাতে নামাজ আদায় ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টি যদি মসজিদে উপস্থিত হয়ে আদায় করার সঙ্গে সম্পৃক্ত না হতো, তাহলে রাসুল (সা.)  জামাতে অনুপস্থিত ব্যক্তিদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা করতেন না। (ইলাউস সুনান ৪/১৮৬)

আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি কোনো গ্রাম বা প্রান্তরে তিনজন মানুষ থাকে, আর তারা জামাতে নামাজ আদায় না করে, তাহলে অবশ্যই তাদের ওপর শয়তান প্রভাব বিস্তার করবে। সুতরাং জামাত তোমাদের জন্য অপরিহার্য। কারন পাল ছাড়া পশু বাঘের শিকার হয়।’ (আবু দাউদ ৫৪৭) অর্থাৎ জামাতবিহীন মুসলমান শয়তানের শিকারে পরিণত হয়ে থাকে।

ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আজান শুনেছে, আর এর অনুসরণ করতে তাকে কোনো ওজর বাধা দেয় না, তবুও সে জামাতে হাজির হয়নি, তার সেই নামাজ কবুল করা হবে না, যা সে একা পড়েছে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কেমন ওজর? তিনি বললেন, ‘শত্রুর ভয় অথবা রোগ।’ (আবু দাউদ ৫৫১) রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তির ওপর আল্লাহর অভিশাপ, যে আজান শুনেও জামাতে উপস্থিত হয় না।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ)

সুতরাং জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ইমানের দৃঢ়তা, আল্লাহভীতির বাস্তব প্রকাশ এবং মুসলিম সমাজের ঐক্যের এক শক্ত ভিত্তি। কোরআন ও সুন্নাহ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, জামাতে নামাজে রয়েছে অসংখ্য সওয়াব, গুনাহ মাফের সুযোগ এবং আল্লাহর বিশেষ সন্তুষ্টি। একই সঙ্গে জামাত বর্জনের বিষয়ে এসেছে কঠোর সতর্কবাণী, যা এর গুরুত্ব ও আবশ্যকতার দিকটি আরও স্পষ্ট করে। তাই অলসতা, ব্যস্ততা কিংবা অজুহাত পরিহার করে আজানের ডাকে সাড়া দেওয়া, মসজিদমুখী হওয়া এবং জামাতে নামাজকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানানো প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। এ পথেই রয়েছে দুনিয়ার শৃঙ্খলা, আখেরাতের মুক্তি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রকৃত সাফল্য। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জামাতের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *