ছবির উৎস, Reuters
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক হামলার পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে যুক্তরাষ্ট্র, এমনটাই জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিউ ইয়র্কে তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে।
শনিবার ভোরে রাজধানী কারাকাসে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে।
এরপর থেকে মাদুরো জীবিত আছেন কিনা, সেই প্রমাণ দেখার জন্য দাবি করেছে ভেনেজুয়েলা সরকার। তারা সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করেছে এবং দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
মাদুরোকে আটক করা হয়েছে দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে। এর আগে ওয়াশিংটন ক্যারিবিয়ান সাগরে মাদক পরিবহনের অভিযোগে কয়েকটি নৌযানে হামলা চালিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে মাদক চোরাচালানে জড়িত এবং তিনি অবৈধভাবে ক্ষমতায় আছেন। অন্যদিকে মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে তা হলো:
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
অভিযান সম্পর্কে কী জানা গেছে?
মাদুরোকে আটক নিয়ে বিস্তারিত তথ্য খুবই সীমিত। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানাননি কীভাবে তাকে আটক করা হয়েছে বা কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বিবিসির মার্কিন সংবাদ সহযোগী সিবিএস জানিয়েছে, মাদুরোকে আটক করেছে মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স—যা সামরিক বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট।
ট্রাম্প স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় (১৬:০০ জিএমটি, বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা) ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে সংবাদ সম্মেলন করবেন, যেখানে অভিযানের বিষয়ে আরও তথ্য প্রকাশ করা হতে পারে।
রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি, যিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেছেন, তিনি বলেছেন, “তিনি [রুবিও] মনে করছেন মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে থাকায় ভেনেজুয়েলায় আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।”
তিনি আরও বলেন, হামলাগুলো চালানো হয়েছিল “গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরকারীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।”
স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে (০৬:০০ জিএমটি) কারাকাসে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং শহরের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
বিস্ফোরণ ও হেলিকপ্টারের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তবে সেগুলো এখনও যাচাই করা হয়নি।
পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতেও বিদ্যুৎ ছিল না।
এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের বিস্তারিত খবর পাওয়া যায়নি।
ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, মিরান্ডা, আরাগুয়া ও লা গুয়াইরা রাজ্যেও হামলা হয়েছে।
কোথায় হামলা হয়েছে?
কারাকাসের আশেপাশে বিস্ফোরণ, আগুন ও ধোঁয়ার দৃশ্য দেখানো একাধিক ভিডিও যাচাই করছে বিবিসি ভেরিফাই, যাতে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় কোন কোন স্থানে হামলা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত তিনটি স্থানের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে:
- জেনারেলিসিমো ফ্রান্সিসকো দে মিরান্ডা এয়ার বেস – যা লা কার্লোটা নামে পরিচিত একটি বিমানঘাঁটি
- লা গুয়াইরা বন্দর – ক্যারিবিয়ান সাগরের সঙ্গে কারাকাসের প্রধান সংযোগস্থল, মিরান্ডা রাজ্যে অবস্থিত
- হিগুয়েরোতে বিমানবন্দর – এটিও মিরান্ডা রাজ্যে, কারাকাসের পূর্বদিকে
ছবির উৎস, Reuters
ডোনাল্ড ট্রাম্প কী বলেছেন?
শনিবার সকালে ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে নিশ্চিত করেছেন যে হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে।
তিনি লিখেছেন: “যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে ভেনেজুয়েলা ও এর নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায়। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।”
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ৫০ সেকেন্ডের ফোন কলে ট্রাম্প এটিকে “দুর্দান্ত অভিযান” বলে বর্ণনা করেছেন।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: “এ বিষয়ে সবকিছু শুনবেন সকাল ১১টায়।”
মাদুরোর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে?
মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হলো:
- মাদক সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্র ও কোকেন আমদানি
- মেশিনগান ও বিধ্বংসী অস্ত্রের মালিকানা
- যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এসব অস্ত্র রাখার ষড়যন্ত্র
বন্ডি এক্স-এ লিখেছেন: “তারা শিগগিরই আমেরিকান মাটিতে আমেরিকান আদালতে আমেরিকান বিচার ব্যবস্থার পূর্ণ কঠোরতার মুখোমুখি হবে।”
তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন কিনা তা স্পষ্ট নয়।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া কী?
ভেনেজুয়েলার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, সরকার জানে না মাদুরো ও তার স্ত্রী কোথায় আছেন এবং তাদের জীবিত থাকার “তাৎক্ষণিক প্রমাণ” দাবি করেছেন।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ অভিযোগ করেছেন, হামলায় বেসামরিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নিহত ও আহতদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেছেন, ভেনেজুয়েলা বিদেশি সেনাদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে “প্রতিরোধ” করবে।
সরকারি বিবৃতিতে একে যুক্তরাষ্ট্রের “অত্যন্ত গুরুতর সামরিক আগ্রাসন” নিন্দা করা হয়েছে, যা “ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড ও জনগণের বিরুদ্ধে বেসামরিক ও সামরিক স্থানে” চালানো হয়েছে।
তারা আরও অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং এই হামলার উদ্দেশ্য হলো “ভেনেজুয়েলার কৌশলগত সম্পদ, বিশেষ করে তেল ও খনিজ দখল করা” এবং “জাতির রাজনৈতিক স্বাধীনতা জোরপূর্বক ভেঙে দেওয়া”।
মাদুরো কে এবং কেন তাকে আটক করা হয়েছে?
নিকোলাস মাদুরো বামপন্থী নেতা হুগো শাভেজ ও তার ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলার (PSUV) অধীনে পরিচিতি পান। ২০১৩ সালে তিনি শাভেজের উত্তরসূরি হিসেবে প্রেসিডেন্ট হন।
২০২৪ সালে মাদুরোকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়, যদিও বিরোধী দলের তথ্য অনুযায়ী তাদের প্রার্থী এডমুন্ডো গনজালেজ বিপুল ভোটে জিতেছিলেন।
মাদুরো ও ট্রাম্পের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল সংখ্যক ভেনেজুয়েলান অভিবাসীর আগমন এবং মাদক পাচার, বিশেষ করে ফেন্টানিল ও কোকেন নিয়ে।
ট্রাম্প দুটি ভেনেজুয়েলান মাদকচক্র—ট্রেন দে আরাগুয়া ও কার্টেল দে লস সোলেস—কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে পরেরটি মাদুরোর নেতৃত্বে পরিচালিত।
মাদুরোর গ্রেপ্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৫০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
মাদুরো দৃঢ়ভাবে বলে আসছেন যে, তিনি কোনো কার্টেলের নেতা নন এবং অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার “মাদকবিরোধী যুদ্ধ”কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ দখল করতে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাদক পরিবহনের অভিযোগে দুই ডজনের বেশি নৌকায় হামলা চালিয়েছে। এতে ১০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে।
ছবির উৎস, Reuters
অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়া কী?
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের মিত্ররা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে “সশস্ত্র আগ্রাসনের কাজ” করার অভিযোগ করেছে, যা “গভীরভাবে উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়”।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলাকে “দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রকাশ্য লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেছে।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো হামলাকে “লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত” বলেছেন, আর কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল এটিকে “অপরাধমূলক হামলা” বলে বর্ণনা করেছেন।
ইইউর শীর্ষ কূটনীতিক কায়া কালাস পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে মাদুরোর বৈধতা নেই এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া উচিত, তবে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা জরুরি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বলেছেন, তিনি “তথ্য যাচাই” করতে চান এবং “দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি” নিয়ে প্রথমে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলবেন।
