ভিত্তিরীয় ডিসিকার কালজয়ী ছবি ‘সানফ্লাওয়ার’-এ একটি স্মরণীয় সংলাপ হলো ‘হি হু গোজ টু রাশিয়া গোজ টু গ্রেভ’। মহাযুদ্ধের ডামাডোলে নবপরিণীতা রমণীর (সোফিয়া লরেন) রোমান্টিক সৈনিক স্বামী (মারসেলো মাস্ত্রইনি) রাশিয়ায় যুদ্ধে গিয়ে বরফে চাপা পড়ে। রাশিয়ান এক মহিলা (লুদমিলা) সৈনিকটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। সৈনিক স্বামী তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে ভুলে যায় এবং উদ্ধারকারিণীর সঙ্গে প্রণয়ে পতিত হয়। ইতালীয় প্রেমিকা, প্রেমিককে খুঁজতে খুঁজতে রাশিয়ায় গিয়ে খোঁজ পান তার। যুদ্ধ ও প্রেম, ভালোবাসাকে কীভাবে হত্যা করে তা এই উক্তি থেকে বেরিয়ে আসে ‘যে যায় রাশিয়ায়, সে আর ফিরে আসে না’। এই মুহূর্তে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে, সেখানে কত করুণ কাহিনি শোক-সাগরে হারিয়ে যাচ্ছে। আমি আজ হারাতে চাইছি, বাংলার সঙ্গে শ্রীলঙ্কার আদি সম্পর্কের রসায়নের মধ্যে। সস্ত্রীক সাত দিনের পর্যটন ও অবকাশ যাপনের পর, শ্রীলঙ্কা থেকে আমরা ফিরছি ঢাকায়। এ মুহূর্তে বন্দরনায়ক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের বিজনেস লাউঞ্জে বসে অপেক্ষা করছি শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ঢাকাগামী বিমানের জন্য। ইউএল-১৮৯ বোর্ডিংয়ের জন্য ডাক পাব একটু পরেই। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে মুহ্যমান গোটা বাংলাদেশ। বুধবার সেখানে সরকারি ছুটি ছিল। সেদিন বিকালে আমার তিনটি সভা ও অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ব্যস্ততা ছিল। সব সভা ও অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে। মিটিং না থাকায় তখন নিজেকে নির্ভার মনে হয়েছে।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ভুবনে বেগম খালেদা জিয়া অভিভাবক ছিলেন, তার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয় এ ভাবনায় আমি বেদনার্ত। নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের কাছে তিনি ছিলেন একমাত্র মুরব্বি। সবার সম্মান ও সমীহ অর্জন করতে পেরেছিলেন তিনি। তাই তো মসনদে না থেকেও মৃত্যুতে তিনি সবার হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসন পেয়েছেন। যিনি বিগত সরকারের সময় ছিলেন জামিনে থাকা কারাবন্দি । কিন্তু তার মৃত্যুতে তাবৎ বিশ্বনেতা ও রাষ্ট্র শোকবার্তা পাঠিয়েছে। তার জানাজায় অংশ নিতে পাকিস্তানের স্পিকার, ভারত এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী যোগ দিয়েছিলেন। আমরা যে ফ্লাইটে ঢাকা ফিরেছি এই ফ্লাইটেই যাত্রী হয়ে শ্রীলঙ্কান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে এসেছিলেন। কলম্বোতে আমাদের হাইকমিশনার আন্দালীব ইলিয়াস তাকে বিমানবন্দরে সি অফ করতে এসেছেন। আমি বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে, শ্রীলঙ্কান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়কে বিমানেই তার সহযাত্রী হিসেবে তাকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি। শ্রীলঙ্কা সবসময় বেগম খালেদা জিয়ার অন্যতম আদর্শিক সমর্থক। বুধবার শ্রীলঙ্কার মিডিয়া, বেগম খালেদা জিয়ার অবিচুয়ারিতে সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টার (তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান) স্ত্রী এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তখন আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। আজ উপমহাদেশের দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সংশয়, সন্দেহ ও রেষারেষিতে যে বিষবাষ্প ছড়ানো হচ্ছে, ‘সার্ক’ ধারণা টেকসই হলে আন্তঃযোগাযোগ, পিপলস টু পিপলস যোগাযোগ বাড়ত। পক্ষান্তরে একটি বৃহৎ দেশের বড়ভাই সুলভ আচরণে, দেশে দেশে ভাই-ভাইয়ে সংকট বাড়ত না । গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকা ত্যাগের দিন বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ব্যাপক জনসমাগম, শোডাউনের এন্তেজাম দেখে এসেছিলাম । ৩১ ডিসেম্বর ফেরার দিনও বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা উপলক্ষে ঢাকা শহর ও জনসমুদ্র প্রত্যক্ষ করেছি অবতরণের পরপরই।
শ্রীলঙ্কার প্রতি ঐতিহাসিক অনুরাগ ও বিরাগের কারণগুলোর দিকে যদি তাকাই রাবণের সীতা হরণের কাহিনি ছোটবেলায় শ্রীলঙ্কার প্রতি আমার বাজে ধারণার সূত্রপাত। পরে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ কাব্যের কুশিলব ও প্রেক্ষাপট পাঠ ও পর্যালোচনা করে ভিন্ন ধারণা পোষণ করি। এবার শ্রীলঙ্কায় এসে প্রথমেই জানতে ইচ্ছে হয়েছিল, রাবণ সীতাকে হরণ করে কোথায় রেখেছিল? রামায়ণ অনুসারে জেনেছি, রাবণ সীতাকে হরণ করে লঙ্কার অশোকবনে এনে রেখেছিল। এই স্থানটি সাধারণভাবে ‘অশোকবন’ বা ‘অশোকবাটিকা’ নামে পরিচিত। সেখানে সীতাকে রাক্ষুসীরা পাহারা দিত এবং রাবণ নানাভাবে তাকে ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে নিজের অনুকূলে আনার চেষ্টা করেছিল। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান শ্রীলঙ্কার নুয়ারা এলিয়া অঞ্চলের সীতা এলিয়া (Sita Eliya / Seetha Amman Temple) এলাকাকে সেই অশোকবনের স্মৃতিবাহী স্থান হিসেবে মানা হয়। শ্রীলঙ্কা বাংলা সম্পর্কের ঐতিহাসিক তাৎপর্য উদ্ধারে, বাংলার বিজয় সেন ও তার ৭০০ সঙ্গীর শ্রীলঙ্কা আগমন এবং শ্রীলঙ্কায় বাংলা পত্তন প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদের বিশ্লেষণে যা জানলাম শ্রীলঙ্কা প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থে মহাবংশ ও দীপবংশ অনুসারে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৫৪৩ অব্দে বঙ্গদেশ থেকে এক যুবরাজ ‘বিজয়ের’ (Vijaya) সঙ্গে ছিল ৭০০ জন অনুসারী। তারা সমুদ্রপথে লঙ্কায় এসে উপকূলে অবতরণ করেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়, ‘বিজয় সেন’ নামে কোনো ঐতিহাসিক রাজা বাংলায় পাওয়া যায় না। শ্রীলঙ্কার সূত্রে নামটি কেবল ‘বিজয়’। মহাবংশ অনুযায়ী, বিজয় ছিলেন অশান্ত ও দুরন্ত রাজপুত্র। এক সময় তাকে বঙ্গদেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়। এরপর তিনি সমুদ্রপথে নতুন ভূমি সন্ধানে বের হন। লঙ্কায় এসে তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সমঝোতার মাধ্যমে একটি নতুন রাজশক্তির ভিত্তি স্থাপন করেন। শ্রীলঙ্কার ইতিহাস অনুযায়ী, বিজয় ও তার অনুসারীরা সিংহলি জাতির পূর্বপুরুষ। ‘সিংহল’ শব্দটি এসেছে সিংহ + লা (সিংহের বংশধর) থেকে। বিজয়ের পিতা ছিলেন সিংহবাহু, মাতা সিংহসীবা। ফলে শ্রীলঙ্কার জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে বঙ্গদেশের একটি প্রতীকী যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল। এটি বাস্তব ইতিহাস না কিংবদন্তি? ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ পাই প্রাচীনকালে বঙ্গোপসাগরভিত্তিক বাংলা-লঙ্কা সামুদ্র্রিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, বৌদ্ধ ধর্ম, সংস্কৃত ভাষার আদান-প্রদান এবং পাল যুগে বাংলার বৌদ্ধ প-িতদের লঙ্কা যাত্রা। বিজয়কে সরাসরি ‘বাংলার রাজা’ বলা হয়তো ঘটনাগুলোর অতিরঞ্জিত রূপ। তবে বাংলাদেশের জনগণের উদ্যোগ হিসেবে বিষয়টির গুরুত্ব রয়েছে। যদিও এটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নয়, বরং বাংলা অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার জনগণের প্রাচীন আত্মিক সম্পর্কের প্রতীক।
দুই অঞ্চলের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম, পালি-সংস্কৃত ভাষা, সামুদ্রিক বাণিজ্য এই সম্পর্ককে গভীর করেছে। এই কারণেই শ্রীলঙ্কার বহু ইতিহাসবিদ আজও বলেন The Sinhalese origins are linked to ancient Bengal.. বাংলা ও শ্রীলঙ্কার ইতিহাসবিদদের মতভেদ রয়েছে, এমনটি শ্রীলঙ্কার বহু ইতিহাসবিদ মনে করেন। তাদের মতে The Vijaya tradition is not mere myth, but a memory of early Indo-Aryan migration. বাংলাদেশের ইতিহাসবিদরা তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক : তারা বলেন, ‘বিজয়’ কোনো নির্দিষ্ট রাজা নাও হতে পারেন। এটি হতে পারে, বহু শতাব্দীর বঙ্গ-লঙ্কা জনবসতি আন্দোলনের প্রতীক। ড. নীহাররঞ্জন রায় ও রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এটি একটি ethno-historical legend (জাতিগত স্মৃতি, সরাসরি রাজ-ইতিহাস নয়)। আধুনিক গবেষণার আলোকে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ পাই আধুনিক ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও জিনতাত্ত্বিক গবেষণা এই কাহিনিকে তিনভাবে ব্যাখ্যা করে : যা সমর্থিত, তা হলো খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে বঙ্গোপসাগরভিত্তিক সামুদ্রিক যাতায়াত, বাংলা-ওড়িশা উপকূল থেকে শ্রীলঙ্কায় মানুষের গমন, প্রাচীন সিংহলি ভাষায় বহু ইন্দো-আর্য ও পূর্ব ভারতীয় উপাদান। তবে প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়, একজন মাত্র ব্যক্তি ‘বিজয়’ পুরো জাতির উৎস এ দাবি, ৭০০ জনের নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং বুদ্ধের পরিনির্বাণের সঙ্গে সময়গত মিল।
আধুনিক গবেষকরা বলেন বিজয় সম্ভবত একক ব্যক্তি নয়, বরং একটি নেতৃত্বগোষ্ঠীর প্রতীক। প্রাচীন বঙ্গ অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক সামুদ্রিক বিস্তার, বাণিজ্য, বসতি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব, বাংলা অঞ্চলের জনগণের প্রাচীনতম সাংস্কৃতিক অবদানগুলোর একটি। মহাবংশ বিজয়কে বঙ্গদেশীয় বলে স্বীকৃতি দেয়। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে, তিনি রাষ্ট্র গঠনের প্রতীক এবং বাংলার ইতিহাসে তিনি একটি অর্ধ-ঐতিহাসিক স্মৃতি। আধুনিক গবেষণায়, এটি জনবসতি ও সংস্কৃতি বিস্তারের প্রতীকী কাহিনি। শ্রীলঙ্কার ওপর আমার রাগ বা অনুরাগের আধুনিক কারণ হলো, আমরা ‘গল’- এর যে অবকাশ কেন্দ্রে ছিলাম, তার অদূরে ভারত মহাসাগরে ঘূর্র্ণিঝড় সিডর ও মহাসেনের উৎপত্তিস্থল জোনে। এখান থেকে ‘সিডর’ (সিংহলী ভাষায় ‘চোখ’) চোখ মেলে এবং কীভাবে ২০০৭ সালের ৬ থেকে ১৫ নভেম্বর রীতিমতো কারসাজি করে উত্তরে এগিয়ে বাংলাদেশের সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদে আঘাত হানে। শ্রীলঙ্কায় উৎপত্তি ঘূর্ণিঝড় ভিয়ারু, বিতর্কিত রাজা মহাসেনের নাম নিয়ে মহাসেন, ২০১৩ মের ১৭ তারিখে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে। তবে আক্রমণের মাত্রা কমিয়ে এবং গতিপথ পাল্টিয়ে মহাসেন মোটামুটি মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছিল বলে, ‘মহাসেনের মহানুভবতা’ নামে একটি লেখা লিখেছিলাম। ঢাকায় অবতরণ করতে যাচ্ছি বলে, সিডর, আইলা, মহাসেনদের প্রসঙ্গ নিয়ে আর বেশি কিছু অবতারণায় যাচ্ছি না।
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান, সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন
