নানা ঘটনা ও পরিবর্তিত পটভূমির প্রক্ষাপটে এশিয়া অঞ্চলের রাজনৈতিক চিত্র অনেকটাই বদলেছে; যার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক রাজনীতিতেও। আর এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত শুল্ক এবং এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের সরকার পরিবর্তন। রাশিয়ার তেল কেনার অভিযোগে ট্রাম্প দীর্ঘদিনের মিত্র ভারতের ওপর শাস্তিমূলক ২৫ শতাংশ (সর্বমোট ৫০ শতাংশ) অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে দুই দেশের বন্ধুত্বে ফাটল ধরে; এক সময়ের বন্ধু মোদি পরিণত হন চক্ষুশূলে। তবে ট্রাম্প শুল্ক দিয়ে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেও, ভারত সরকার অনেকটা নীরবেই তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তিক্ততা শুরুর পর থেকেই যে চীনকে ভারত নিজেদের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবত সেই চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে নতুন তোড়জোড় শুরু করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে; ৫ বছর পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। তবে গত বৃহস্পতিবার বেইজিং অভিযোগ করেছে যে ভারতের সঙ্গে চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চলমান উন্নতি ও স্থিতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সুপরিকল্পিতভাবে তাদের প্রতিরক্ষা নীতিকে বিকৃত করছে। বেইজিংয়ে আয়োজিত এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান এই অভিযোগ তোলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, সীমান্ত সমস্যাটি একান্তই চীন ও ভারতের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এতে অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ বা অযাচিত মন্তব্য করার কোনো সুযোগ নেই। লিন জিয়ান হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, কোনো তৃতীয় দেশ এই স্পর্শকাতর সমস্যা নিয়ে নিজেদের মতো করে রায় বা মূল্যায়ন দিলে চীন তাতে তীব্র আপত্তি জানাবে।
সম্প্রতি পেন্টাগনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদ সম্মেলনে লিন জিয়ানকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি চীনের অবস্থান পরিষ্কার করেন। পেন্টাগনের ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, চীন সম্ভবত ভারতের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা হ্রাসের বিষয়টিকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছে। পেন্টাগনের মতে, বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলায় বাধা দেওয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের প্রভাব কমিয়ে আনা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের ওই প্রতিবেদনে অরুণাচল প্রদেশের ওপর চীনের দাবিকে তাদের ‘কোর ইন্টারেস্ট’ বা মূল স্বার্থ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই স্বার্থগুলোর বিষয়ে চীন কোনো ধরনের আলোচনা বা আপস করতে রাজি নয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের নেতৃত্ব তাদের ‘মূল স্বার্থে’র পরিধি আরও বাড়িয়ে এখন তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগরের সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক বিরোধ, সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে।
পেন্টাগনের এমন পর্যবেক্ষণকে ভিত্তিহীন ও উসকানিমূলক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মুখপাত্র লিন জিয়ান জোর দিয়ে বলেন যে, চীন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও মিত্রতাকে কেবল সাময়িক কোনো স্বার্থের জায়গা থেকে নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিপ্রেক্ষিত থেকে মূল্যায়ন করে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি জানান বেইজিং ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করার যে চেষ্টা ওয়াশিংটন চালাচ্ছে, তা মূলত আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার একটি অপপ্রয়াস মাত্র।
বিরোধপূর্ণ সীমান্ত এলাকা নিয়ে গত কয়েক বছরে ভারত ও চীনের মধ্যে যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। দুই দেশই সীমান্তে শান্তি ফেরাতে এবং বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের পক্ষ থেকে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ায় চীন বিষয়টিকে তাদের সার্বভৌম অধিকার ও স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। বেইজিং মনে করে, ভারত ও চীন নিজেরাই তাদের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানে সক্ষম এবং সেখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের উসকানি সম্পর্কের উন্নয়নকে ব্যাহত করতে পারে।
