‘ক্রিটিক অব জাজমেন্ট’ দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের লেখা একটি উল্লেখযোগ্য বই। এর মূল বিষয় ‘সুন্দর এবং সৌন্দর্য’ এই দুই শব্দের মধ্যে একটা অর্থগত পার্থক্য রয়েছে। এটা তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন। এক জায়গায় তিনি বলেন, ‘সৌন্দর্যবোধ কেবল সুশৃঙ্খল নয়, স্বাধীনও বটে। সুন্দরের মধ্যে বুদ্ধি তাই পরিতৃপ্ত। অতএব সুন্দরকে বোধগম্য বললে অন্যায় হয় না। মনে রাখতে হয়, সুন্দর নিজেকে প্রকাশ করে বলেই তার বুদ্ধিমত্তা এবং বোধগম্যতাও স্বকীয়। আর এই বোধগম্যতাকে উপলব্ধি করা বুদ্ধির আদর্শ। সুন্দর হলো, বিশেষ বা আত্মগত এবং সেই বিশেষের মৌল স্বভাবের পরাকাষ্ঠ। তাই সুন্দর নিজেকে প্রকাশ করেই তৃপ্ত। সহজ কথায়, ‘সৌন্দর্য’ অসাধারণ; ‘সাধারণ’ বললে সৌন্দর্যের অস্তিত্বকে অসম্মান করা হয়।’ তিনি এও বলেন যে, ‘সাধারণ মানুষের জ্ঞান, অসম্পূর্ণ। কিন্তু কর্মের পরিপূর্ণতার জন্য উৎকৃষ্ট জ্ঞান না হলে হয় না। প্রজ্ঞার আদর্শের প্রয়োজনে, কর্মক্ষেত্রে মানুষ সবসময় জ্ঞানকে অতিক্রম করে যেতে চায়। যা প্রজ্ঞার স্বকীয় স্বভাবের প্রকাশ। কর্মক্ষেত্রে মানুষের জ্ঞান, ব্যক্তির অভিজ্ঞতা। একইভাবে সুন্দরের অভিজ্ঞতাও, ব্যক্তির অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাও প্রত্যক্ষভাবে বিশেষের অভিজ্ঞতা।’ কথাগুলো বলার অর্থ যারা আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দেন। তারা সমাজের একটা বিশেষ জ্ঞানীদের একাংশ। তাদের অভিজ্ঞতা সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে একটু ব্যতিক্রম থাকে। সেই ব্যতিক্রমটা হলো সুন্দর এবং সৌন্দর্যকে বোঝার চেষ্টা এবং তার দক্ষতা ধারণ করা। এটা সচরাচর সাধারণ মানুষদের থাকে না বলেই, এদেরই আমরা জ্ঞানী মানুষ বলে মনে করি। এরই আলোকে আমরা সমাজ ও রাষ্ট্রকে দেখতে চাই, বুঝতে চাই। সেখানে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রত্যাশা করি।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, অর্ধশতাব্দী ধরে আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নীতি- নৈতিকতার ক্ষেত্রেও এ রকম সুন্দর মানুষ বলতে সৌন্দর্যকে বোঝেন যারা, তাদের পেয়েছি কম। অধিকাংশ সময় উল্লিখিত এলিট অংশে নিম্ন রুচিবোধ, সাধ, শখ, আচার-আচরণ ও হিংসা-প্রতিহিংসার সঙ্গে বেশি পরিচিত হই ও হয়েছি। শুধু চেহারা, সুন্দর কাপড়-চোপড়ে আধুনিক হলে বা সেটা দেখতে সুন্দর লাগলে তার মধ্যেও ‘সৌন্দর্যবোধ’ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সৌন্দর্যবোধের পরিচয় মিলে, ব্যক্তির আচার-আচরণ এবং প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের চৌকস চর্চা ও তার বহিঃপ্রকাশে। সৌন্দর্য শুধু বিশেষ হলে চলে না, সেটা সার্বিক হওয়াও দরকার। একে সার্বিক করার দায়িত্ব সমাজের শিক্ষিত, বিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবানদের। তাদের মধ্যে রাজনীতিকদের একটা বড় ভূমিকা আছে। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে যারা নেতৃত্ব দেন এবং যারা এর মাঠকর্মী তাদের অনেকের মধ্যে এই ‘বোধ’ আদৌ কাজ করে! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মিস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও লজ্জা বলে কিছু নেই। তবে বিশ্বের অনেক রাজনীতিকদের মধ্যে কিছুটা আত্মসমালোচনা শোনা যায়, দেখাও যায়। আমাদের অধিকাংশের মধ্যে বিনয়, সহানুভূতি, কল্যাণ এবং সুন্দর অনুপ্রাণিত না করলে, কোন ‘ইগো’ বিব্রত করতেই পারে। তাহলে সেখানে আমার মধ্যে সৌন্দর্য বিশেষ হলেও, সার্বিক হবে না। দৃষ্টান্ত অনেক আছে। আপাতত একজনের দৃষ্টান্ত দিই। বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার মধ্যেও কি কখনো আত্মসমালোচনা, বিনয়, লজ্জা, সহনশীলতা দেখেছি? ক্ষমতায় থাকার জন্য এমন কোনো হিংসা, প্রতিহিংসা ও সন্ত্রাসী কাজ নেই, যা তিনি করেননি। বিডিআর হত্যাকা- থেকে শুরু করে আয়না ঘর এবং ২০২৪ জুলাই পর্যন্ত অনেক ঘটনাই তার প্রমাণ। এরপরও এই দল চিৎকার করে, রাজনীতি করার অধিকার চায়। অনেকে এদের নির্বাচনে বাইরে রেখে নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলতে রাজি না। শান্তিপ্রিয় মানুষ ও সাধারণ নাগরিক এতে অবাক হই। তাও এটা ভাবা যেত, যদি একবার এদের কেউ ক্ষমা চাইত। আমরা ’৭১-এর শত্রুদের বারবার ক্ষমা চাইতে বলি, কিন্তু নিজেদের অন্যায়ের জন্য কি একবারও চেয়েছি বা চাই! এর চাইতে বড় অসৌন্দর্য আর কী আছে?
সম্প্রতি তিনি জাহাঙ্গীর মো. নানকের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে বলেন, এই সরকারের বিরুদ্ধে টানা দুদিন আন্দোলন চালালেই নাকি সরকার পড়ে যাবে! ৫ আগস্ট, ২০২৪-এর পর থেকে আওয়ামী লীগ কিন্তু একদিনও বসে থাকেনি, সরকার পরিবর্তনের জন্য নানা ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যেতে। এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। রাজনীতিতে অনেক কথা হয়। তবে সেসব কথা বলার ধরন ও ভঙ্গির সঙ্গে, সেই জনগোষ্ঠীর আচার-আচরণের সংস্কৃতি যুক্ত থাকে। আমরা জাতীয় সংস্কৃতিকে ভাগ করে নিয়েছি রাজনীতি দিয়ে। আমাদের ঐক্যকে খন্ডিত করেছি, শ্রেণি স্বার্থ দিয়ে। আমরা অর্থনীতিকে পরার্থপরের অর্থনীতি বানিয়েছি, নিজেদের শ্রেণি স্বার্থে। আমাদের সুস্থ
সংস্কৃতিকে বিকৃত করেছি, কারও না কারোর প্রভুত্বকে বজায় রাখতে। এসব কিছুই গণমানুষের সুন্দর এবং সৌন্দর্যের বিপরীতে। এক সময় আওয়ামী লীগের অনেক গুণী ব্যক্তি বলতেন ‘আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শত্রু, শেখ হাসিনার জিহ্বা।’ একইভাবে তিনি এখনো সেই বেপরোয়া জিহ্বা দিয়েই মিথ্যাচার করেন। এই দলের কর্মীদের একটা বড় অংশের মধ্যেও কোনো লজ্জা, ভদ্রতা, শিক্ষা ও বিনয় বলে কিছু আছে বলে মনে হয় না। এদের কাছে সুন্দর বলতে একটাই, নিজের দল। এই দলের কাছে সত্য বলতে একটাই, তাদের নেতা-নেত্রীর জিহ্বা। এই দলের কাছে একটাই হারাবার ভয়, সেটা ক্ষমতা। এটা চলে গেলে তারা উন্মাদ হয়ে যায়। সুন্দর এবং সৌন্দর্য তখন দলের ভেতর ও বাইরে কাদায় লেপ্টে যায়। দার্শনিক রাসেলের মতে, শুয়োরের সঙ্গে লড়লে নিজের পোশাকেও কাঁদা লাগে। শুয়োর সেটাই চায় এবং আনন্দ পায়! সমাজে যারা সুন্দর এবং সৌন্দর্যের তৃষ্ণা অনুভব করে, তারা এই ধরনের কোনো প্রাণীর সঙ্গে লড়তে চান না। এটা ভয়ে না, এটা আত্মসম্মানবোধ। তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সুন্দর এবং সৌন্দর্যের কিছুই নেই, যা আছে তা পশুত্বের লড়াই ও সন্ত্রাস সৃষ্টির প্রচেষ্টা। মুক্তিযোদ্ধা এবং শেখ হাসিনার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মতিউর রহমান রেন্টুর বই, ‘আমার ফাঁসি চাই’ বইটি পড়লেই বোঝা যায়, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি কী এবং তা কাকে বলে! একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে একদল, এক নেতা বা নেত্রীই শেষ কথা। তারাই আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকবেন। এটাই এই দলের সিকি, আনা, পাই থেকে শুরু করে লুটপাট করে নেওয়া কোটি কোটি টাকার মালিক বা সেই টাকার অংশীদারদের ওয়াজ। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন আদালতে শেখ হাসিনা এবং তার আজ্ঞা অনুসারীদের বিচারের রায় নিয়ে, বিদেশের মাটিতেও গলাবাজি ও চিৎকারের মাধ্যমে দেশকে অরাজকতার মধ্যে রাখতে চান এরা। ফেলতেও চান। লক্ষ্য দল এবং নেত্রীকে পুনরায় ক্ষমতায় আনা।
বিগত সরকারের বেনিফিশিয়ারি ছিল পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে আনুমানিক প্রায় এক কোটি মানুষ। এদের সেই হালুয়া রুটির অবৈধ জোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, ক্ষেপে গিয়ে যদি তাদের মধ্য থেকে ১০ লাখ রাজপথে নামেন অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। শুধু মনে রাখতে হবে, বিশ কোটির এক কোটি গেলেও থাকে ১৯ কোটি। এদের কোনো কোনো তৎপরতায় আমরা মনে করি, এই দলের জনপ্রিয়তা আছে বলেই এরা সেটা করতে পারছে! এই চিন্তা ভুল। কালনাগিনীকে ভয় পাওয়া বা হিংস্র পশু জন্তুকে ভয় পাওয়া শান্তিপ্রত্যাশী নাগরিকদের স্বাভাবিক স্বভাব ও আচরণ। আগুন দেখলে সাধারণ মানুষের চাইতে ‘দমকল’ বাহিনীর ভূমিকা সেখানে জরুরি। দুঃখজনকভাবে আমরা বিপদ বা আগুনে সেই রকম ‘দমকল’ বাহিনী এখনো তৈরি করতে পারিনি। খুব অল্প সংখ্যক যারা এই সংকটের উত্তরণে দমকল বাহিনীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন ও পেরেছেন, তাদের মধ্যেও এক ধরনের বিভক্তি এবং লক্ষ্য বিচ্যুতি ঘটে গেছে। এটাও আমাদের সুন্দর ও সৌন্দর্যের সার্বিক বিকাশের ব্যর্থতাই বলা যায়। এই ব্যর্থতার দায় কিছুটা বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকারের, যা অস্বীকার করা যায় না। বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক পরিবর্তনের জন্য নিজস্ব শ্রেণি সংশোধন এবং স্বার্থ পরিবর্তন প্রয়োজন। সুন্দর এবং সৌন্দর্যের প্রতি কতটা সচেতন তারা, তাও প্রমাণিত হয়নি গত পনেরো মাসে। নির্দিষ্ট ও পুরনো শ্রেণিস্বার্থের মানুষ কখনোই দেশকে ‘রূপান্তর’ করতে পারে না। যতক্ষণ না তাদের মধ্যে পরিবর্তনের সৌন্দর্যকে অনুধাবনের চেষ্টা থাকে। এই সৌন্দর্যের বৈশিষ্ট্য আদর্শমূলক। আমরা সেই আদর্শকে ধারণ করতে পারিনি এখনো। ইন্দ্রিয় ও যুক্তিবুদ্ধি উভয়ের সন্নিবেশে সৌন্দর্যের বোধ পরিস্ফুট হয়। এখানে বিশেষ ও সার্বিকের পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সার্বিক সৌন্দর্যের অভাব, অবহেলা ও উপেক্ষার কারণেও অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ পরিবর্তন ও এর সংস্কার উভয়ই থমকে যাচ্ছে। আমরা চিৎকার করছি, গলাবাজি করি। আন্দোলন করছি, হরতাল ডাকি। বিদেশের মাটিতে বসেও এই একই কাজ করি। কিন্তু আমরা কেউই সার্বিক সৌন্দর্য এবং সুন্দরকে অর্জন করতে পারছি বা চাচ্ছি কি?
একটা বিশেষ সৌন্দর্যকে আমরা সার্বিক বলে চালাই ও চালাচ্ছি। এই চাওয়াটাও ভুল এবং এতে আমাদের পুরনো ও নতুন কোনো সমস্যার সমাধান প্রায় অসম্ভবই বলা যায়। সমাজ ও জীবনের দুর্গম যাত্রাপথে, বারবার জিতে গিয়েও আমরা হেরে যাই। সুন্দর এবং সৌন্দর্যবোধ থেকে আমরা ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যাচ্ছি ক্ষুদ্র ‘শ্রেণি’ স্বার্থে। সুন্দর এবং সৌন্দর্যের আরেক রূপ সত্য, সততা, শিক্ষা, প্রজ্ঞা, ন্যায়বোধ, বিনয়, সহনশীলতা আত্মসমালোচনা ও আত্মোপলব্ধি। এসবের শূন্যতা সমাজে সুন্দর ও ইতিবাচক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের আরেক কারণ। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বর্তমান ক্রান্তিকালে সাহস ও সৌন্দর্যবোধের বিকল্প আছে কি! আছে, কিন্তু তাদের অনেকের জীবনকে নিরাপত্তা দিতে পারছি না আমরা। হাদি ঠিকই বলেছিলেন, ‘মানুষের মৃত্যুর ফায়সালা হয় জমিনে না, আসমানে।’ যারা হাদির মতো সুন্দর মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দেবেন, মনে রাখবেন আজ হোক বা আগামীকাল, আপনার মৃত্যুর সনদ সৃষ্টি হবে মাটিতে, হুকুম আসবে আসমান থেকে। একটা বা কিছু নিরপরাধ জীবনকে হত্যা করে লাখ মানুষের জীবন নিশ্চিহ্ন করা যায় না। আমরা এর প্রমাণ দিয়েছি একাত্তরেও। প্রয়োজন হলে, সেই সৌন্দর্যের সার্বিক রূপের দৃষ্টান্ত আমাদের তরুণরা আবারও দেবেন। অপেক্ষা সময়ের ও ধৈর্যের। অতন্দ্র প্রহরীর মতো সাবধান থাকবেন দেশের সাধারণ নাগরিক, শুধু বিশেষ সৌন্দর্যের জন্য নয় সার্বিক সৌন্দর্যের জন্য।
লেখক: রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষক
