জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির খুলনা বিভাগীয় আহ্বায়ক মোতালেব শিকদার ‘হানি ট্র্যাপে’ (মধুচক্রে) পড়েছিলেন। তাকে ডেকে নিয়ে ট্র্যাপে ফেলে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করেছিল চক্রটি। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে গুলি করা হয়। জাতীয় যুবশক্তির খুলনা জেলা যুগ্ম-সদস্য সচিব তানিয়া তন্বীকে আটকের পর এ তথ্য জানা গেছে। যুবশক্তির এই নেত্রী মধুচক্রের অন্যতম সদস্য।

এদিকে মোতালেব গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় তার স্ত্রী ফাহিমা আক্তার বাদী হয়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তানিয়া তন্বীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৭-৮ জনের বিরুদ্ধে নগরীর সোনাডাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় তানিয়া তন্বীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৈমুর ইসলাম বলেন, গত সোমবার সোনাডাঙ্গা থানা এলাকার আল আকসা মজিদ সরণির ১০৯ নম্বর রোডের মুক্তা হাউজের নিচতলায় মোতালেব শিকদারকে গুলির ঘটনায় ডিবি পুলিশ তদন্ত শুরু করে। ঘটনার পর থেকে ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা তানিয়া তন্বী আত্মগোপনে চলে যান। পরে মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং ও বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে তন্বীকে রাতেই নগরীর টুটপাড়া এলাকা থেকে আটক করা হয়। গুলিকারী অস্ত্রটি উদ্ধারের জন্য তাকে নিয়ে রাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। তবে অস্ত্রটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এই তরুণী ‘হানি ট্র্যাপ’ (মধুচক্র) চক্রের সদস্য।

এরা বিভিন্ন সময়ে বিত্তবানদের টার্গেট করে দীর্ঘদিন ধরে নগরীতে চাঁদাবাজি করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় মোতালেব শিকদারকে গুলি করা হয়েছে। আমরা অনেক তথ্য পেয়েছি। আশা করি, এই চক্রের অন্য সদস্যরাও ধরা পড়বে।

কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মাদ তাজুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার জাতীয় যুবশক্তির নেত্রী তানিয়া তন্বীর ফ্ল্যাটে ঘটে যাওয়া ঘটনায় ৭-৮ জন জড়িত ছিল। এর মধ্যে চারজন তন্বীর ফ্ল্যাটের ভেতরে এবং তিন-চারজন বাইরে ছিল। রবিবার রাতে মোতালেব শিকদারকে ওই ফ্ল্যাটে ডেকে নেওয়া হয়। সোমবার ভোরে সেখানে ৭-৮ জন উপস্থিত হয়। এর মধ্যে চারজন কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা কক্ষে প্রবেশ করেই মোতালেব শিকদারকে বলে, তোর কাছে ‘ইয়াবা’ আছে, ইয়াবা দে। তার কাছে ইয়াবা নেই বললে তারা কক্ষে ইয়াবা খুঁজে না পেয়ে তার কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। এভাবে কয়েক ঘণ্টা ধরে তার ওপর টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। এরপর পিস্তল দিয়ে তাকে ভয় দেখানো হয়। পরে তার বাম কানে গুলি করা হয়। তবে কত টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তন্বী তা বলতে পারেনি।

তিনি জানান, গ্রেপ্তার তন্বীসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। এই কাজে যারা জড়িত তাদের নাম জানতে পেরেছি। তাদের গ্রেপ্তারে জোর চেষ্টা চলছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের পাশাপাশি র‌্যাব, সিআইডি, পিবিআই ছায়া তদন্ত করছে।

উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মাদ তাজুল ইসলাম আরও বলেন, পিস্তল দিয়ে মোতালেব শিকদারকে গুলি করা হয়েছে। আমরা ওই পিস্তলটি উদ্ধারের চেষ্টা করছি। ওই ফ্ল্যাটে অসামাজিক কার্যকলাপ হতো। সেখানে নিয়মিত আড্ডা বসত। তানিয়া তন্বী নিজেকে এনজিওতে চাকরি করে বললেও সে চাঁদাবাজচক্রের সদস্য। তার বাড়ি নগরীর ৬৫/৬ হাজী ইসমাইল লিংক রোডে। সে ওই এলাকার আনসার আলীর মেয়ে।

এদিকে গুলিবিদ্ধ মোতালেব শিকদারও একই এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। মোতালেব ১০৯, হাজী ইসমাইল লিংক রোডের প্রিন্সেস হাউজ ভবনের নিচতলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করেন। তারা দুজনই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মোতালেব শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির বিভাগীয় আহ্বায়ক এবং তানিয়া তন্বী জাতীয় যুবশক্তির খুলনা জেলা যুগ্ম-সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, গতকাল দুপুরে মোতালেব শিকদারের স্ত্রী ফাহিমা আক্তার বাদী হয়ে তানিয়া তন্বীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৭-৮ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় গ্রেপ্তার তানিয়া তন্বীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির খুলনা বিভাগীয় আহ্বায়ক মোতালেব শিকদার পেশায় একজন ট্রাক ড্রাইভার। ২০০৭ সালে একটি মিনি পিকআপ ভ্যান কেনেন। এই পিকআপ ভ্যান চালিয়ে তার সংসার চলত। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সে খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বিপ্লবের আস্থাভাজন হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। তার মাধ্যমে খুলনার আলোচিত শেখ বাড়িতে প্রবেশের সুযোগ পান মোতালেব। মোতালেব সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ সোহেলের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে তোলা চাঁদার অর্থ ওই বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। এ ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ সোহেলের সঙ্গে তার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোতালেব জাতীয় শ্রমিক লীগের সদস্য হিসেবে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোতালেবের ভাগ্যে আরও পরিবর্তন ঘটে। তিনি এনসিপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তিতে যোগ দিয়ে খুলনা বিভাগীয় আহ্বায়কের দায়িত্ব পান।

অভিযোগ উঠেছে, এনসিপি শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তিতে যোগ দিয়ে খুলনা জিরো পয়েন্টসহ বিভাগের বিভিন্ন পরিবহন রুটে ব্যাপকহারে চাঁদাবাজি করে অঢেল টাকার মালিক বনে যান। এখন তিনি নিজে ট্রাক চালান না, অন্যকে দিয়ে নিজের ট্রাক পরিচালনা করেন। এ বিষয়ে তদন্তে নেমেছে পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ।

এদিকে সামাজিক কর্মকাণ্ড পালনের কথা বলে সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে এই কর্মকাণ্ড ভালোভাবে না নেওয়ায় এনসিপির একাংশের নেতাদের সঙ্গে মোতালেবের বিরোধ সৃষ্টি হয়।

তবে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে জাতীয় শ্রমিক শক্তির খুলনা জেলা আহ্বায়ক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, আমাদের সংগঠন চাঁদাবাজি করে না। গত রবিবার নিজেদের টাকায় আমরা শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি। তবে মোতালেব শিকদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। মোতালেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *