রাজশাহী অঞ্চলের আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা গত মৌসুমে চরম খারাপ সময় পার করেছেন। ভালো দাম না পেয়ে প্রায় প্রতিটি আলুচাষিই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। পুঁজি হারিয়ে হাহাকার অবস্থা। এরই মাঝে আলু চাষের সঙ্গে জড়িতরা নতুন করে আবাদে নেমেছেন ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আশায়। কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছেন চাষিরা। আলু চাষে গিয়ে তীব্র সার সংকটে পড়ে হতাশার মুখে পড়েছেন তারা। অনেকে সার না পেয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। আবার অনেকে বাড়তি দামে সার কিনে জমি রক্ষা করছেন। এতে আবাদ খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এবারও যদি প্রত্যাশিত দাম না পান, তাহলে তাদের পথে বসার উপক্রম হবে।
রাজশাহী অঞ্চলে আলুর আবাদ এখন অনেকটাই বাণিজ্যিক। চাষিরা ছাড়াও বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী এর সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন পেশার মানুষ ভালো লাভের আশায় আলু ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। তারা শত শত বিঘা জমি লিজ নিয়ে আলু চাষ করছেন। ফলে আলু নিয়ে ভাবনা এখন কৃষকদের চেয়ে ব্যবসায়ীদেরই বেশি। গেল কয়েক বছরে আলু চাষ করে অনেকে বিনিয়োগের কয়েক গুণ লাভ করেছেন। কিন্তু গত দুই বছরে তারা হোঁচট খেয়েছেন। গত বছর আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে নেমে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়েছেন। কয়েক বছরের আয় একেবারে খোয়া গেছে। বড় মাপের কৃষকরাও মূলধন হারিয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রাজশাহী জেলায় ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ১০ লাখ ৩০ হাজার ৫১৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। অথচ জেলার বার্ষিক আলুর চাহিদা মাত্র ১ লাখ ১৩ হাজার ১৪৫ টন। অর্থাৎ, প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৯ গুণ বেশি আলু উৎপাদিত হয় রাজশাহী জেলায়। মূলত বিগত বছরগুলোতে লাভের হিসাবে অনেকে বাড়তি আশায় অতিরিক্ত জমিতে আলু চাষ করেছেন। আগের বছরের তুলনায় গত বছর প্রায় ৩ হাজার ৫৪৫ হেক্টর বেশি জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে।
শুধু রাজশাহীতেই নয়, আশপাশের অনেক জেলায় আলুর আবাদ বেড়ে গিয়েছিল। ফলে অন্য বছর যেভাবে বাড়তি আলু রাজশাহীর বাইরের জেলায় যেত, গত বছর তা যায়নি। এর প্রভাবে আলুসংশ্লিষ্টরা অস্বাভাবিক লোকসান গুনতে হয়েছে।
রাজশাহী জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আহাদ আলী বলেন, অধিক উৎপাদন, হিমাগারে আলু পচে যাওয়া এবং দাম কম পাওয়া এ তিন কারণে অনেক আলুচাষি প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘এক কেজি আলু উৎপাদন খরচ, হিমাগার ভাড়া ও পরিবহন খরচসহ ৩৫ টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে হয়েছে ১০-১২ টাকায়। শেষ সময়ে এসে এটি হয় ১৭-১৮ টাকা। পাইকারি দাম কম হওয়ায় হিমাগার থেকে আলু তুলে বাজারে নেওয়ার খরচও ওঠেনি। গড়ে প্রতি কেজিতে ২২-২৫ টাকা লোকসান হয়েছে চাষিদের। এ লোকসানের পরও চাষিরা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় আলু চাষে নেমেছেন। কিন্তু শুরুতেই আবার হোঁচট খেয়েছেন। সার সংকটে কৃষকরা দিশেহারা।’
গত বছর আলু চাষে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছিলেন বাগমারা উপজেলার দেউলিয়া গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও আলু লাগাতে শুরু করেন তিনি। তবে বিপত্তি বেধেছে রাসায়নিক সার নিয়ে। স্থানীয় অনুমোদিত ডিলার পয়েন্টে ধরনা দিয়েও চাহিদামতো সার মিলছে না। ফলে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় রোপণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, কিছু মুনাফালোভী ডিলার রাতের অন্ধকারে সরকারি বরাদ্দের সার কালোবাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে ডিলার পয়েন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সার মিলছে না। আবার কোথাও সার মিললেও একজন কৃষককে এক বা দুই বস্তার বেশি দেওয়া হচ্ছে না, যা আলু ও শীতকালীন সবজি চাষের জন্য একেবারেই অপ্রতুল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ টন। চলতি মৌসুমে এ দুই বিভাগে ৩ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৮৪ লাখ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষকদের হিসাবে, প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষের শুরুতে প্রয়োজন প্রায় ২ বস্তা (১০০ কেজি) এমওপি, ১ বস্তা (৫০ কেজি) ডিএপি এবং ১ বস্তা টিএসপি। কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরাদ্দ দিচ্ছে বিঘাপ্রতি মাত্র ২৩.১৫ কেজি এমওপি, ৩৬ কেজি ডিএপি ও ১.৩ কেজি টিএসপি যা কৃষকদের মতে বাস্তব চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলা রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৫৫১ টন, ডিএপি ২৫ হাজার ২৮১ টন এবং টিএসপি ৯ হাজার ৫৭০ টন। চলতি ডিসেম্বরে চার জেলায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ১৫ হাজার ৩৮০ টন এমওপি, ২৯ হাজার ৪৫০ টন ডিএপি এবং ৯ হাজার ৪৬৬ টন টিএসপি।
বাগমারা উপজেলার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমার অন্তত ১৮ বস্তা সার দরকার। সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু এখনো একটি বস্তাও পাইনি। সামনে কয়েকশ মানুষ।’
বাগমারা উপজেলার বিএডিসি ডিলার হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমার তিন ট্রাক সার পাওয়ার কথা, কিন্তু মাসের শুরুতে পাচ্ছি মাত্র এক ট্রাক। তাই কৃষক পাঁচ বস্তা চাইলে দিতে পারছি এক বস্তা। সার কম পেয়ে তারা পরদিন আবার আসে, তখন চাপ আরও বাড়ে।’
এদিকে সংকটের কারণে বিকল্প উৎস থেকে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। তানোর উপজেলার কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, সরকারি দামে সার না পেয়ে বাইরে থেকে প্রতি বস্তা টিএসপি ও ডিএপি ১ হাজার ৭০০ টাকায় এবং এমওপি ১ হাজার ৩৫০ টাকায় কিনেছেন। অথচ সরকার নির্ধারিত মূল্য যথাক্রমে ১ হাজার ৩৫০, ১ হাজার ৫০ এবং ১ হাজার টাকা।
অন্যদিকে সংকটের কারণে অনেক কৃষক প্রয়োজনের চেয়ে কম সার দিয়েই আলু রোপণ করছেন। ফলে ফলন নিয়ে শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। তানোর উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘যতটা সার দেওয়ার কথা, তার চেয়ে কম দিয়েই বীজ লাগাতে হয়েছে। এতে ফলন কম হবে, এটা নিশ্চিত।’
অনেক কৃষক অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অনুমোদিত দোকান ও গুদামে না রেখে বাড়ি ও গোপন স্থানে সার মজুদ করছেন। পাশাপাশি মাছচাষিরা পুকুরে ইউরিয়া ব্যবহার করায় কৃষি খাতে সারের সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
সম্প্রতি রাজশাহীর বাগমারায় উপজেলা কৃষি অফিস ও পুলিশের যৌথ অভিযানে এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার বাড়ি থেকে ৪৪৪ বস্তা অবৈধভাবে মজুদ সার জব্দ করা হয়। পরে সেগুলো সরকারি দামে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির দায়ে মেসার্স হাসান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. হাসান আলীকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম না করার মুচলেকা নেওয়া হয়েছে।
অভিযানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি মূল্যে সার বিক্রি করছিল। পাশাপাশি দোকানে মূল্যতালিকা টানানো ছিল না এবং ক্রেতাদের রসিদ দেওয়া হচ্ছিল না।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, সার কেনার সময় অনেক দোকানে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা আদায় করা হয়। প্রতিবাদ করলে কখনো সার না দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে চাষাবাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
এদিকে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (বিএডিসি) উপপরিচালক সাবিনা বেগম বলেন, সারের তেমন কোনো সংকট নেই। অনেক কৃষক প্রয়োজনের তিন থেকে চারগুণ বেশি সার ব্যবহার করছেন। যেখানে জমিতে ৩০-৩৫ কেজি সার ব্যবহার করা দরকার, সেখানে অনেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত প্রয়োগ করছেন। ডিএপি সারে ফসফেট থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আলাদা টিএসপি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। তবু কৃষকরা ডিএপি ও এমওপি একসঙ্গে ব্যবহার করছেন। কৃষকদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। কিছু এলাকায় টিএসপি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা আইনবিরোধী। কৃষকরা ক্যাশ মেমো নিলে অতিরিক্ত দাম নেওয়া ঠেকানো যাবে।
