ওসমান হাদির মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। জীবন, রক্ত আর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জুলাই অভ্যুত্থানের পর একটি রাজনৈতিক হত্যা এবং তার প্রতিক্রিয়া প্রত্যক্ষ করল বাংলাদেশ।  ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড যে ক্ষোভ এবং উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছিল, তার তীব্রতম প্রকাশ ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার রাতে। হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ নেমে পড়েছিল রাস্তায়। আওয়ামী লীগ এবং ভারতের প্রতি বিক্ষুব্ধতায় শুধু বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করেছে তাই নয়, তারা ভেঙেছে, আগুন দিয়েছে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পত্রিকা কার্যালয়, আগুন দিয়েছে উদীচী, ছায়ানট ভবনে। উত্তেজনায় মানুষ যা করে তার ব্যাখ্যা কঠিন। উত্তেজনার পারদ যখন ফুটতে থাকে, তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। যে ভয়াবহতা বারবার প্রত্যক্ষ করছে শুধু বাংলাদেশ না,  সারা বিশ্ব।

সামাজিক উত্তেজনা এবং অস্থিরতা রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে তো বটেই, বৈদেশিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলে। শ্রমিকের কাজ, মজুরি, নিরাপত্তা কৃষকের ফসল এবং কৃষি উপকরণের দাম, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা এবং কাজ, প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার, নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং অধিকার, আদিবাসী, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ও অধিকার, বৃদ্ধদের প্রতি দায়িত্ব বা আচরণ সবকিছু ভঙ্গুর হয়ে পড়ে অস্থিরতার কারণে। আড়াল হয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ। সরকার দায় এড়িয়ে যায় এবং ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট সুবিধা গ্রহণ করে। ফলে পুরো আঘাত বহন করে সমাজের শ্রমজীবী মানুষ। সমাজের অস্থিরতা অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়িয়ে তোলে, এ যেন এক চক্রে আবর্তিত হওয়া। বৈষম্য বিক্ষোভের জন্ম দেয়, বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বা অনিয়ন্ত্রিত বিক্ষোভ সমাজের সংহতিকে বিনষ্ট করে। আতংক যেন গ্রাস করে সমাজের সব অংশকে যা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমার জন্ম দেয়। জুলাই অভ্যুত্থান এক বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সমাজের আকাক্সক্ষা এদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের অপূর্ণ আকাক্সক্ষা এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জন্ম দিয়েছিল ২০২৪  সালের গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু প্রায় ১৭ মাস পরও আকাক্সক্ষার বাস্তবায়নের উদ্যোগ এবং পথরেখা না দেখায় যে হতাশা জন্ম নিয়েছিল, তা নানাভাবে বিক্ষোভ রূপে দেখা দিচ্ছে। ফলে অভ্যুত্থানের ফলে কী অর্জন হলো, এই প্রশ্ন এবং সংশয় দেখা দিচ্ছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় সে যাত্রা শুধু ব্যাহত নয়, প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। রাজনীতিতে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে এবং কী হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে, সে বিষয় নিয়ে ভাবনা সবার। সবাই কথা বলছে, বিতর্ক করছে, নিজের মতো এবং ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু অর্থনীতিতে যে সংকটের ছায়া, তা কি দুর্ভাবনা জন্ম দিচ্ছে না? দুর্নীতি যে সমাজের সংহতি নষ্ট করে দিয়েছিল, শোষণ ও লুটপাট অর্থনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল, ক্ষমতার প্রশ্রয়ে খেলাপি ঋণের অবাধ বিস্তার ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা এবং ব্যাংকগুলোর শক্তি ধসিয়ে দিয়েছিল, যাচাই এবং জবাবদিহি না করে বিপুল ঋণ দিয়ে অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছিল, তা বহুদিন আলোচনার বিষয় হিসেবে থাকলেও শিক্ষা কতটুকু নেওয়া হয়েছে তা নিয়ে সবাই একমত হবেন যে, আমরা দেখেছি যত সে অনুযায়ী শিখিনি কিছু।  

রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি কী হচ্ছে দেশে, কী আছে সামনের দিনগুলোতে এটাই এখন আলোচনার প্রধান বিষয়। এতদিন সংশয় ছিল নির্বাচন নিয়ে, মানুষ জানতে চাইত নির্বাচন কি হবে? এখন ঘরে-বাইরে একটাই আলোচনা চলছে নির্বাচন হবে কীভাবে? এসব রাজনীতির বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। রাজনীতি মানুষের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, চাইলেও কেউ আলাদা থাকতে পারবে না। কেউ যখন বলেন, আমি রাজনীতি বুঝি না, তখন সেটা তার সরল স্বীকারোক্তি। কেউ যখন দাবি করেন, আমি রাজনীতির মধ্যে নেই আমি বুঝি পেটনীতি, নিজে ভালো থাকতে চাই, নিরাপদে থাকতে চাই তখন একজন সহজ সরল মানুষ হিসেবে তার আকাক্সক্ষাকে বিবেচনা করা যেতে পারে। মানুষ তো চাইবেন সন্তান নিয়ে ভালো থাকতে। কিন্তু কেউ যখন ঘোষণা দিয়ে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে চান এবং বলেন, এখানে রাজনীতি চলবে না তখন শুধু তার অজ্ঞতা নয়, অসততা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। এ কারণেই বলা হয়, রাজনীতি বন্ধ করা সবচেয়ে বড় রাজনীতি। সংঘাত-সহিংসতায় রাজনীতিতে রক্তপাত ঘটে, এটা দেখা যায়। কিন্তু অর্থনীতিতে যে আঘাত আসে, তা সবসময় দেখা না গেলেও তার প্রভাব মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পায়। রাজনীতির ক্ষত এবং অর্থনীতির রক্তক্ষরণের মধ্যে সম্পর্ক অস্বীকার করা যাবে না। রাজনৈতিক কারণে যে দুর্বৃত্তরা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে, তা গিলে খায় সব অর্জন। এরা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করে তাই নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকেও কুক্ষিগত করে। যার অন্যতম দৃষ্টান্ত ব্যাংকিং খাত। জনগণের আমানত দিয়ে গড়ে তোলা ব্যাংকের টাকা যখন লুটপাট হয়, তখন ফোকলা হয়ে পড়ে অর্থনীতি। যার প্রমাণ সাম্প্রতিক ব্যাংকগুলোর চিত্র। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এই হিসাব নিয়েছিল বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি। ধারণা করা হয়, এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। কারও কারও ঋণের পরিমাণ ছিল অবিশ্বাস্য। ব্যাংকের আমানতের তুলনায় ঋণ কতটুকু দেওয়া যাবে তার একটা নিয়ম আছে কিন্তু ক্ষমতার এমন তাপ যে সব বেষ্টনী গলিয়ে দিতে পারে। তা না হলে ৪০ হাজার, ৫০ হাজার, ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে পারে কেউ। আর যারা এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে ব্যাংক শূন্য এবং অর্থনীতিকে চোরাবালিতে নিক্ষেপ করেছিল তাদের কী হবে এবং অর্থনীতি রক্ষার কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এটা জানতে চেয়েছিল দেশের মানুষ। জবাব কি পেল? বরং অভ্যুত্থানের পরও হু হু করে বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণ। এর একটা কারণ, চেপে রাখা তথ্যের প্রকাশ আর একটা কারণ ব্যবস্থা গ্রহণের দুর্বলতা। আওয়ামী লীগের সময় নানা ব্যবস্থা ও সুবিধা দিয়ে যেসব খেলাপি ঋণ আড়াল করে রাখা হয়েছিল, সেসব ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেখে, মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই এখন খেলাপি বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের মতো দেশে এটা কি চলতে দেওয়া যায়? দেশি-বিদেশি ঋণের জালে জর্জরিত এই দেশ, শ্রমিক কৃষকের শ্রম ঘামে গড়ে ওঠা দেশ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সে যে আর্থিক ভিত্তি গড়ে উঠে তা কি লুটপাটে ধ্বংস হতে দেওয়া যায়। এর উত্তর হচ্ছে, না। ফলে সামনে আরও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন আছে?

ব্যাংকের সঙ্গে একটি শব্দ দিয়ে জনগণকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে আমানত, রেমিট্যান্স সব মিলিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছিল ব্যাংকগুলো। কিন্তু বিগত সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি লুটপাটের শিকার হয় এসব ব্যাংক। পাশাপাশি প্রচলিত ধারারও কিছু ব্যাংক একইভাবে প্রশাসনিক লুণ্ঠনের শিকার হয়। ফলে এসব ব্যাংকের অধিকাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে যায়। ব্যাংকের মালিক নাম নিয়ে যে পারিবারিক সিন্ডিকেট তার কবল থেকে মুক্তি পায়নি কোনো বেসরকারি ব্যাংক। উদাহরণের অভাব নেই। যেমন দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ ইউনিয়ন ব্যাংকের, ৯৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এরপর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, পদ্মা ব্যাংকের ৯৪ দশমিক ১৭ শতাংশ ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ৯১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ ছাড়া এবি ব্যাংকের খেলাপির হার ৮৪ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৭৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ৭৩ দশমিক ১৮ শতাংশ ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৭১ দশমিক ১১ শতাংশ। বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭০ দশমিক ১৭ শতাংশ। আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপির হার ৬০  দশমিক ৬৩ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংকের ৫৮ দশমিক ২৪ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। প্রকাশ্যে এবং ধারাবাহিকভাবে এ ঘটনা ঘটে গেছে বছরের পর বছর। কেউ দায় নেয়নি, কাউকে দায়ী করা যায়নি, কিন্তু ব্যাংক ধ্বংসের বোঝা বহন করছে জনগণ। ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু সাধারণ গ্রাহক টাকা তুলতে পারছেন না। এখন আতঙ্কে আছে তাদের জমানো টাকা ফেরত পাবে কি না এই ভেবে? অর্থনীতি যেকোনো রাষ্ট্রের ভিত্তি আর রাজনীতি সমাজের পরিচালনাকারী শক্তি। অর্থনীতিতে লুণ্ঠন আর রাজনীতিতে দুর্বৃত্তপনা যদি হাত ধরাধরি করে চলে, তাহলে কি হয় তার দৃষ্টান্ত হতে পারে বাংলাদেশ। এর হাত থেকেই তো আমরা মুক্ত হতে চেয়েছিলাম। অভ্যুত্থানের পর অস্থিরতা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তা কত দিন চলতে পারে?

অভ্যুত্থানে উচ্চারিত দাবিগুলোর বাস্তবায়ন হবে কোন পথে? বিবেচনা করা হচ্ছে, নির্বাচন এবং জবাবদিহি এর অন্যতম সমাধানের পথ। নির্বাচন করার ক্ষেত্রে প্রস্তুতি সংকট আর নির্বাচন করতে না চাওয়ার ইচ্ছা একটা বাধা। অবশ্য এই বাধা অপসারিত হয়েছে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর। ফলে উত্তেজনা এবং অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দেশ নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কারণ নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তরের আর কোনো শান্তিপূর্ণ পথ নেই। হাদিকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, সন্দেহভাজন খুনিরা যেভাবে পালিয়ে গেছে এবং মৃত্যু পরবর্তী বিক্ষোভ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। একদিকে হাদির হত্যা-পরবর্তী উত্তেজনা, অন্যদিকে নির্বাচন সম্পর্কিত প্রস্তুতি এ নিয়ে সংকটকাল অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। এ থেকে উত্তরণের পথ বের করা কঠিন, কিন্তু প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর শুধু প্রত্যাশা নয়, দেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার জন্যই দরকার।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

[email protected]





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *