উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ মহকুমার চারটি বিধানসভা কেন্দ্র জুড়ে লক্ষাধিক ভোটারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে। মঙ্গলবার খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা গিয়েছে, প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার ভোটারকে শুনানির নোটিস পাঠানো হতে পারে। এই ভোটারদের অধিকাংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের, যাঁরা বাংলাদেশ থেকে এসে দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করছেন। সমস্যার মূল কারণ—তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও বাবা-মা বা পূর্বপুরুষের নাম ভোটার তালিকায় ‘প্রোজেনি ম্যাপিং’-এ মিলছে না।
নির্বাচন দফতরের সূত্রে জানা গিয়েছে, তালিকাভুক্ত এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ তাঁদের কাছে নাগরিকত্বের শংসাপত্র আছে। তাঁদের মধ্যেই একজন অবসরপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী প্রমথনাথ বিশ্বাস। বাগদার হেলেঞ্চার বাসিন্দা প্রমথবাবু ২০০৯ সালে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ থেকে ভারতে আসেন। সিএএ-র আওতায় নাগরিকত্বের আবেদন করে গত নভেম্বরে তিনি শংসাপত্র পেয়েছেন। তবে তাঁর অনেক প্রতিবেশী এখনও উৎকণ্ঠায়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে এসএমএস এলেও হাতে নাগরিকত্বের কাগজ পৌঁছবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে জানান তাঁরা।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের পরিচালিত নাগরিকত্ব শিবিরগুলিতে ভিড় বাড়ছে। হাজার হাজার মানুষ সেখানে গিয়ে নিজেদের শংসাপত্রের খোঁজখবর নিচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় আতঙ্ক তাঁদের মধ্যে, যাঁরা এখনও সিএএ-র আওতায় আবেদনই করেননি। ঠাকুরনগরের বাসিন্দা সুবোধ বিশ্বাস বলেন, “নির্বাচন কমিশন যে ১১ ধরনের নথির কথা বলছে, আমাদের কাছে তার একটিও নেই। শুনানিতে গেলে কী জমা দেব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”
মতুয়া সম্প্রদায়ের এক নেতা স্বপন গোসাইয়ের অভিযোগ, “আমরা ১৫ বছর ধরে ভোট দিচ্ছি। ইপিক কার্ড আছে, আধার আছে, শেষ লোকসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছি। এখন যদি পরিবারের সদস্যদের শুনানিতে ডাকা হয়, কোনও নথিই দেখাতে পারব না। কী করব জানি না।”
তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক সুকেশ চৌধুরীর দাবি, “নির্বাচন কমিশনের চাওয়া নথি অধিকাংশ মতুয়া পরিবারের কাছেই নেই। শুনানিতে নথি দিতে না পারলে নাম কাটা যাবে। নোটিস না আসা পর্যন্ত মানুষ জানতেই পারছেন না কার নাম ‘ডাউটফুল’ বা ‘আনম্যাপড’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গোটা সম্প্রদায় আতঙ্কে রয়েছে।”
এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ মহাসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক সুখেন গায়েন বলেন, “ডাউটফুল ভোটার শ্রেণি কোনও বিশেষ সম্প্রদায়কে নিশানা করে তৈরি হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি দেখবেন।”
উল্লেখ্য, বনগাঁ মহকুমায় ৪ লক্ষ ৮২ হাজার ২০৭ জন ‘প্রোজেনি ভোটার’ রয়েছেন—যাঁরা বাবা-মা বা আত্মীয়ের নাম উল্লেখ করে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছিলেন। রাজ্যজুড়ে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তারই ধারাবাহিকতায় এদের প্রায় অর্ধেককে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে মতুয়া সম্প্রদায়। সূত্রের মতে, এই মহকুমার প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোটারই মতুয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
খসড়া তালিকা প্রকাশের পর এখন শুনানি ও নোটিস ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে বনগাঁ মহকুমা জুড়ে। ভোটাধিকার বজায় থাকবে কি না, সেই প্রশ্নে আপাতত চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটছে লক্ষাধিক মানুষের।
আরও পড়ুন: খসড়া ভোটার তালিকায় নাম আছে? ইসিআইনেট অ্যাপে যাচাই করে নিন, আর কী ভাবে দেখবেন?
