যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিওনেল মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের ঘটনার আবহে বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে চেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি পাঠিয়েছিলেন অরূপ বিশ্বাস। মঙ্গলবার সেই ইস্তফা গৃহীত হয়েছে বলে ক্রীড়া দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে। আপাতত ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের দায়িত্ব অন্য কারও হাতে দেওয়া হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই এই দফতরের দায়িত্ব সামলাবেন।
অরূপ বিশ্বাস বর্তমানে রাজ্যের বিদ্যুৎ দফতরেরও মন্ত্রী। তবে তিনি শুধু ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতর থেকেই অব্যাহতি চেয়েছিলেন। তাঁর ইস্তফাপত্র গৃহীত হলেও তিনি মন্ত্রিসভায় বহাল থাকছেন।
ইস্তফাপত্রে অরূপ বিশ্বাস লেখেন, যুবভারতীকাণ্ডে মুখ্যমন্ত্রী যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন, তা যাতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে পারে, সেই কারণেই তিনি ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চান।
মঙ্গলবার অরূপের ইস্তফাপত্র প্রকাশ্যে আনেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ। চিঠিতে সোমবারের তারিখ (১৫ ডিসেম্বর) উল্লেখ ছিল। ইস্তফার চিঠি পাঠানোর পরেই ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের শীর্ষ আধিকারিকদের নবান্নে তলব করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে তাঁরা নবান্নে পৌঁছন। তার পরেই দফতর সূত্রে জানানো হয়, অরূপের ইস্তফা গ্রহণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, শনিবার যুবভারতীতে লিওনেল মেসির অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা ছড়ায়। গ্যালারি থেকে মেসিকে স্পষ্ট ভাবে দেখতে না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দর্শকেরা। মেসি মাঠ ছাড়ার পরই শুরু হয় ভাঙচুর। অভিযোগ ওঠে, মাঠে মেসি যতক্ষণ ছিলেন, ততক্ষণ তাঁর একেবারে কাছাকাছি ছিলেন তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। এই ছবি ও ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। যুবভারতীর গ্যালারি ছাড়িয়ে দলের অন্দরেও অরূপের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
ঘটনার পর থেকেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়—অরূপ কি পদত্যাগ করবেন, নাকি তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানো হবে? অরূপের ঘনিষ্ঠ মহলের ধারণা ছিল, মঙ্গলবার এসআইআর-এর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর যুবভারতীকাণ্ড আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যাবে। কিন্তু তার আগেই মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন অরূপ।
অন্যদিকে, যুবভারতীকাণ্ডে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীমকুমার রায়ের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। সেই কমিটি সোমবার রাতে নবান্নে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেয় এবং একাধিক সুপারিশও করে।
এর পরদিনই রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তা ডিজিপি রাজীব কুমারকে শো কজ় নোটিস দেন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ। একই সঙ্গে বিধাননগর পুলিশের কমিশনার মুকেশ কুমার, ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের প্রধান সচিব রাজেশ কুমার সিংহকেও শো কজ় করা হয়েছে। শনিবার মেসির অনুষ্ঠানে কেন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, বিধাননগর পুলিশের ডিসি অনীশ সরকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত চলাকালীন তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সিইও দেবকুমার নন্দনকেও পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। মুখ্যসচিবের দফতরের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে এই সমস্ত নির্দেশ জানানো হয়। তদন্ত কমিটির সুপারিশ মেনে গোটা ঘটনার তদন্তের জন্য সিট (বিশেষ তদন্তকারী দল) গঠন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে যুবভারতীতে মেসির অনুষ্ঠান ঘিরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক স্তরেও বড়সড় প্রভাব ফেলল। ক্রীড়ামন্ত্রীর ইস্তফা, শীর্ষ পুলিশকর্তাদের শো কজ় এবং সিট তদন্ত—এই ঘটনাক্রমে রাজ্য সরকারের কড়া অবস্থানই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন: যুবভারতীতে ভাঙচুর-কাণ্ডে কড়া পদক্ষেপ রাজ্যের, ডিজি রাজীব কুমার-সহ একাধিক শীর্ষ আধিকারিককে শো কজ
