দেশে উৎপাদিত কয়লার দাম আমদানি দরের প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় আপত্তি তুলেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সর্বশেষ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারদর হিসেবে অর্থাৎ আগের চেয়ে কম দামে বিল পরিশোধ করতে চায় সংস্থাটি। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) দাবি, সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দিতে হবে কয়লার দাম।

এই নিয়ে সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানের এ বিরোধের পাশাপাশি কয়লা খনি কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ ব্যয় ডলারে হবে, নাকি টাকায় সেটি নিয়েও চলছে তুমুল দ্বন্দ্ব। নিজেদের সপক্ষে পাল্টাপাল্টি যুক্তি আর চিঠি চালাচালি চললেও সুরাহা হয়নি প্রায় এক বছরেও। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বেশি দামে কয়লা উত্তোলনের কাজ দেওয়ায় এমন দ্বন্দ্বের সূত্রপাত বলেও অভিযোগ উঠেছে।

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অবস্থিত ওই খনি থেকে উত্তোলন করা কয়লা দিয়েই সেখানকার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে পিডিবি। খনির কয়লা উত্তোলনের কাজ করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়াম।

বিসিএমসিএলের কর্মকর্তারা জানান, ২০০১ সালে একনেক সভায় পিডিবির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহকৃত কয়লার বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬০ মার্কিন ডলার। পরে আরও পাঁচ দফা বাড়ানো হয় কয়লার দাম। এর মধ্যে সর্বশেষ ২০২২ সালের জানুয়ারিতে টনপ্রতি কয়লার দর ১৭৬ ডলার নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

তারা জানান, ওই দরেই পিডিবি কয়লা কিনে আসছিল। একপর্যায়ে তাদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে বিসিএমসিএলের চেয়ারম্যান ও বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজ আন্তর্জাতিক দর অনুযায়ী কয়লার দর নির্ধারণের সুপারিশ করেন। এখন পিডিবি ওই দরেই কয়লার দাম পরিশোধ করতে চায়।

বিসিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. আবু তালেব ফরাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই সুপারিশ এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন এবং এ-সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপনও জারি হয়নি। তাই আমরা জ¦ালানি বিভাগের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিল দাবি করছি।’ তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর সরকার যেভাবে বিল নির্ধারণ করবে, সেটিই হবে। তবে পিডিবি যে দাম দিতে চাচ্ছে তাতে কয়লা বিক্রি করলে কোম্পানির বিপুল পরিমাণ লোকসান হবে।’

পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অভ্যন্তরে যেসব তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনছে তাতে জাহাজ ভাড়া বাদে প্রতি টন কয়লার দাম পড়ছে সর্বনিম্ন ৭১ থেকে প্রায় ৭৭ ডলার পর্যন্ত। আর গড়মূল্য প্রায় ৭৫ ডলার। সেখানে দেশীয় কয়লার দাম পড়ছে ১৭৬ ডলার। অবশ্য আমদানিকৃত কয়লার চেয়ে দেশীয় কয়লার মান ভালো। সে বিবেচনায় আন্তর্জাতিক দর অনুযায়ী, বড়পুকুরিয়ার কয়লার দাম ৯১ টাকার কাছাকাছি হওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে দেশে আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র না থাকায় কয়লার মূল্য ও দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার সুযোগ কম ছিল। কিন্তু এখন একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ায় বিষয়টি বোঝা সহজ হয়েছে। সে হিসেবে আমরা দেখেছি আমদানিকৃত কয়লার চেয়েও বড়পুকুরিয়া কয়লার দাম অনেক বেশি। সেজন্যই উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ীই কয়লার দাম দিতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকটি বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি বিভাগের যৌথ বৈঠক ছিল। সেখানে সচিব থেকে শুরু করে বিসিএমসিএলের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত হয়, আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী মূল্য পরিশোধ করার। অর্থাৎ, বিশ^বাজারে দাম বাড়লে বাড়বে, আবার কমলে কমবে। এটি ছিল সিদ্ধান্ত। কোনো সুপারিশ নয়। এখন পিডিবি তো সর্বশেষ সিদ্ধান্তই আমলে নেবে। আগের প্রজ্ঞাপন এখানে আমলে নেওয়া হবে কীভাবে?’

পিডিবি চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘পিডিবি এমনিতেই লোকসান করছে। বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনা করলে লোকসান কিছুটা কমবে। তবে আমরা অন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানকে লোকসানে ফেলতে চাই না। আমরা চাই তারা কম মুনাফা করুক। তাতে পিডিবিরও লোকসান কমবে। সরকারের দুই প্রতিষ্ঠানই লাভবান হবে।’

এদিকে বিসিএমসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিসিএমসিএলের বার্ষিক সাধারণ সভার আয়োজনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তার আগে নিরীক্ষা হিসাব তৈরি করে কোম্পানির বোর্ডসভায় অনুমোদন নিতে হবে। আন্তর্জাতিক মূল্য ধরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অডিট রিপোর্ট তৈরির নির্দেশনা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যমান দর ১৭৬ ডলার ধরে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ফলে বোর্ডসভায় তা অনুমোদন মেলেনি। কয়লার দর কী হবে সেটি নিয়ে সুরাহা না হওয়ায় সর্বশেষ অর্থবছরের হিসাবও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে সাধারণ সভা করার বিষয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা।

বিষয়টি নিয়ে বিসিএমসিএল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে পেট্রোবাংলার এ প্রতিষ্ঠানটি দেড় দশক ধরে মুনাফা করছে। এখন বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের অজুহাতে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে কয়লা খনিকে বন্ধের চক্রান্ত চলছে।

তারা বলছেন, গত বোর্ডসভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বোর্ড চেয়ারম্যান কয়লার মূল্য দ্রুত পুনর্নির্ধারণ করে আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে বোর্ডসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। এখন নতুন করে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে তা অনুমোদনের পর বেঁধে দেওয়া সময়ে সাধারণ সভার আয়োজন বেশ দুরূহ। নির্ধারিত সময়ে করতে না পারলে জরিমানাসহ আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে প্রতিষ্ঠানটিকে। অবশ্য তার আগে আদালত থেকে সাধারণ সভা পেছানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি আদালতের দ্বারস্থ হয়নি।

বড়পুকুরিয়া কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটির কয়লার মূল্য যখন ১৭৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়, তখন বিশ্ববাজারে সমমানের কয়লার দাম ৪০০ ডলারের ওপরে ছিল। কিন্তু তখন বিসিএমসিএলকে পিডিবি সরকার নির্ধারিত দরে কয়লার দাম পরিশোধ করে। এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে সম্পাদিত চতুর্থ চুক্তি ২০২১ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিধায় ২০২২ সালে উত্তোলিত কয়লার পিডিবির কাছে বিক্রয়মূল্য ১৭৬ ডলার পুনর্নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে চুক্তিকালে ব্যয়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

লোকসানে পিডিবি, মুনাফায় বিসিএমসিএল : ২০২২ সালে প্রতি টন কয়লার দাম ১৩০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৭৬ ডলার নির্ধারনের পর ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিসিএমসিএলের মুনাফা হয়েছে যথাক্রমে ৪৪৪.২৯ কোটি ও ৫৮১.০৩ কোটি টাকা। উৎপাদিত কয়লার ভিত্তিতে প্রতি টনে মুনাফা হয় যথাক্রমে ৫৪.৯৯ ও ৫৭.৪৭ মার্কিন ডলার।

পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিসিএমসিএল মুনাফা করলেও কয়লার এ মূল্যবৃদ্ধিতে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এতে ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ যথাক্রমে ১০২৩ কোটি, ১১৯০ কোটি ও ৯৪০ কোটি টাকা। এই ক্ষতির বিপরীতে সরকার কোনো ভর্তুকি দেয়নি।

সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাসের কয়লার মূল্য গড়ে ৯৯.৫৮ ডলার হিসেবে পরিশোধ করছে পিডিবি।

কয়লার মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি প্রস্তাবিত প্রতি টন কয়লার দাম ২০১.৫৬ ডলার প্রস্তাব করেছে। যেখানে পিডিবির প্রস্তাব ১০৬.৫৩ ডলার।

এদিকে পিডিবি বলছে, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির ব্যয়ের শুধু বিদেশি ঠিকাদারের (কয়লা উত্তোলনকারী) বিল প্রতি টনে মার্কিন ডলার ৪৯.৮২ বৈদেশিক মূদ্রায় (ডলারে) পরিশোধযোগ্য। এর বাইরে বিসিএমসিএলের বেতন ভাতা, অবচয়, রয়্যালিটি, জমি অধিগ্রহণ, মুনাফা, আয়করসহ যাবতীয় ব্যয় টাকায় সম্পাদিত হওয়ায় কয়লা উত্তোলনকারীর ব্যয় ব্যতীত অন্যান্য ব্যয় ডলারের পরিবর্তে টাকায় নির্ধারিত হওয়া উচিত।

কয়লা উত্তোলনের ব্যয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ (প্রতি টন ৫৮ ডলার) কয়লা উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানকে বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করা হলেও, সম্পূর্ণ মূল্য ডলারে নির্ধারিত হওয়ায় সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ৮৪ থেকে বেড়ে ১২২ টাকা হওয়ায় শুধু বিনিময় হারের কারণে কোম্পানির স্থানীয় মুদ্রার ব্যয়ের বিপরীতে ৪৫.২৪ শতাংশ মুনাফা বৃদ্ধি হয়েছে।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *