দেশে এখনো বন্ডেড লেবার বা দাস-শ্রমিকপ্রথা ভয়াবহ মাত্রায় বিদ্যমান—এমনই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে সদ্য প্রকাশিত এক সমীক্ষা-রিপোর্টে। কার্যকর আইন থাকা সত্ত্বেও উদ্ধার, ক্ষতিপূরণ, অভিযোগ নথিভুক্তকরণ ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে কার্যত ভেঙে পড়েছে প্রয়োগব্যবস্থা।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই রিপোর্টটি প্রস্তুত করেছে তিনটি সংগঠন—ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন কমিটি ফর দ্য ইরাডিকেশন অফ বন্ডেড লেবার, মেহনতকশ অ্যাসোসিয়েশন, এবং ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির IDEAS অফিস। সমীক্ষায় ১৯টি রাজ্যের ৯৫০ জন উদ্ধার হওয়া দাস শ্রমিকের অভিজ্ঞতা ও তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আইন থাকলেও বাস্তবে সুরক্ষা নেই
রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে—১৯৭৬ সালের বন্ডেড লেবার সিস্টেম (অ্যাবলিশন) অ্যাক্ট অনুযায়ী যে-সব পদক্ষেপ বাধ্যতামূলক, তার প্রায় কোনোটাই সঠিকভাবে অনুসৃত হচ্ছে না।
রিপোর্টে বলা হয়েছে—
- উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের বয়ান নিরাপদ পরিবেশে রাখা হয় না
- অনেক ক্ষেত্রেই এনজিও বা সামাজিক সংগঠনকে উদ্ধার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয় না
- ২৪ ঘণ্টার মধ্যে FIR ও Release Certificate দেওয়ার নিয়ম প্রায় কোথাও মানা হয় না
- নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সারসংক্ষেপ বিচার (summary trial) হয় না
১.৮৪ কোটি দাস-শ্রমিক উদ্ধার করার লক্ষ্যে কোনও অগ্রগতি নেই
ভারত সরকার যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ১.৮৪ কোটি দাস-শ্রমিক উদ্ধার করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছিল, রিপোর্ট বলছে অগ্রগতি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
- উদ্ধার হওয়া কর্মীদের ৮০%–এর ক্ষেত্রেই FIR হয়নি
- ২০১৬ সালের আগে কোনও মামলায় একটিও দোষীসাব্যস্ত হয়নি
- ২০১6 সালের পরে দোষীসাব্যস্তের হার মাত্র ৩.৬%
মজুরি বকেয়া ঋণের চেয়েও ৬ গুণ বেশি
ধারণা থাকে, ঋণের চাপে মানুষ দাস শ্রমিক হয়ে যান। কিন্তু রিপোর্ট দেখিয়েছে—
- গড় ব্যক্তিগত ঋণ: ₹৫,২৮৩
- গড় বকেয়া মজুরি: ₹৩২,৫১৪
অর্থাৎ, জোরপূর্বক শ্রম ও বেতন বঞ্চনাই প্রধান কারণ। একজনও শ্রমিক বকেয়া মজুরি পাননি।
ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মারাত্মক ব্যর্থতা
রিপোর্ট অনুযায়ী—
- উদ্ধার হওয়া ২০১৬ পরবর্তী ৬৩% শ্রমিক কোনো অন্তর্বর্তী ভাতা পাননি
- উদ্ধার হওয়া শিশুদের ৫৩.৮% কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি
- মহিলাদের ৩৩% ক্ষতিপূরণ পাননি
- একটিও পুরুষ শ্রমিক ₹১ লক্ষ ক্ষতিপূরণ পাননি, যদিও তারা আইনের নিয়ম অনুযায়ী যোগ্য ছিলেন
মাত্র একজন মহিলা শ্রমিক ₹১–২ লক্ষ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন।
শিক্ষা-বঞ্চনা: দাসত্বের কারণ ও ফল দুইই
উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের ৬৭%–এর কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই—এমনটাই জানিয়েছে রিপোর্ট। উদ্ধার হওয়া ৫৫টি শিশুর মধ্যে মাত্র ১৪ জন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। অন্যদিকে ২০টি শিশু আবারও দাস-শ্রমিক চক্রে ফিরে গেছে, যা শিশুপুনর্বাসন ব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতা তুলে ধরে।
রিপোর্টের সুপারিশ
সমস্যা নিরসনে রিপোর্টে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছে—
- জেলা পর্যায়ে সার্ভে এবং তার ভিত্তিতে কঠোর ব্যবস্থা
- জেলা শাসকদের (DM) সরাসরি দায়বদ্ধ করা
- মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে সার্বিক পর্যবেক্ষণ
- বেতন সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রদান
- দায়িত্বহীন প্রশাসনিক আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডসংহিতা অনুযায়ী ব্যবস্থা
- Release Certificate জারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ₹৩০,০০০ অন্তর্বর্তী ভাতা
- সকল উদ্ধার হওয়া অভিবাসী শ্রমিককে দ্রুত রেশন কার্ড প্রদান
বিচারপতি ডি.এইচ. ওয়াঘেলার মন্তব্য
রিপোর্টের ভূমিকায় দেশের তিনটি উচ্চ আদালতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি.এইচ. ওয়াঘেলা লিখেছেন— “উদ্ধার করা শ্রমিকদের Release Certificate না দেওয়া মানে তাদের পুনর্বাসন অধিকার অস্বীকার করা…”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রিপোর্টের তথ্য “ভয়াবহ ও চক্ষু-উন্মোচক”—এবং এর ভিত্তিতে অবিলম্বে যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজন।
