ছবির উৎস, Getty Images
মার্কিন সেনাসদস্যদের বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকার করার আহ্বান জানিয়ে ভিডিও প্রকাশের পর ছয়জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে ‘মৃত্যুদণ্ডযোগ্য রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণের’ অভিযোগ এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
“এটা সত্যিই ভয়াবহ আর আমাদের দেশের জন্য বিপজ্জনক। তাদের কথাগুলো কোনোভাবেই আমলে নিতে দেওয়া যাবে না। বিশ্বাসঘাতকদের রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ!!! তাদের জেলে ঢোকাবো???,” সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন ট্রাম্প।
এই ছ’জন আইনপ্রণেতাদের সবাই সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেছেন। তারা ট্রাম্পের মন্তব্যকে বিপজ্জনক বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এগুলো নির্বাচিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হুমকির সামিল।
যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, “কোনো হুমকি, ভয় বা সহিংসতার আহ্বান আমাদের সেই পবিত্র দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে পারবে না”।
ছবির উৎস, Getty Images
মিশিগানের সিনেটর এলিসা স্লটকিনের শেয়ার করা ডেমোক্র্যাটদের সেই ভিডিওটিতে অংশ নিয়েছেন অ্যারিজোনার সিনেটর মার্ক কেলি এবং পেনসিলভেনিয়ার প্রতিনিধি ক্রিস ডেলুজিও, নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রতিনিধি ম্যাগি গুডল্যান্ডার, পেনসিলভেনিয়ার প্রতিনিধি ক্রিসি হুলাহান এবং কলোরাডোর প্রতিনিধি জেসন ক্রো।
নৌবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকারী ও সাবেক মহাকাশচারী সিনেটর কেলি বলেন, “আমাদের আইন স্পষ্ট। আপনি বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকার করতে পারেন”।
ভিডিওতে আইনপ্রণেতারা বলেন, “কেউই এমন কোনো আদেশ পালন করতে বাধ্য নন যা আইন বা আমাদের সংবিধান লঙ্ঘন করে”।
“এই প্রশাসন আমাদের ইউনিফর্মধারী সামরিক ও গোয়েন্দা পেশাজীবীদের আমেরিকান নাগরিকদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আমাদের মতো আপনাদেরও এই সংবিধান রক্ষা ও পালনের শপথ রয়েছে। বর্তমানে আমাদের সংবিধানের প্রতি হুমকি শুধু বিদেশ থেকে নয়, বরং এখানেই ঘরের ভেতর থেকেও আসছে”।
বৃহস্পতিবার সকালে ট্রুথ সোশালে ধারাবাহিক পোস্টের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্প।
তিনি লেখেন, “এটাকে বলা হয় সর্বোচ্চ স্তরের রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ। আমাদের দেশের এই প্রতিটি বিশ্বাসঘাতককে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। তাদের কথাগুলো কোনোভাবেই আমলে নিতে দেওয়া যাবে না — এভাবে চলতে থাকলে আমাদের দেশ আর টিকবে না!!! উদাহরণ স্থাপন করতেই হবে”।
তিনি আরও লেখেন, “এটি সত্যিই ভয়াবহ এবং আমাদের দেশের জন্য বিপজ্জনক। তাদের কথাকে কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যাবে না। বিশ্বাসঘাতকদের রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণ!!! তাদের জেলে ঢোকাবো???”
তৃতীয় পোস্টে তিনি লেখেন, “রাষ্ট্রদ্রোহী আচরণের শাস্তি মৃত্যু!”
ট্রুথ সোশ্যালে আরও একটি পোস্ট শেয়ার করেন ট্রাম্প, যেখানে লেখা ছিল, “ওদের ফাঁসি দাও জর্জ ওয়াশিংটন তাই করতো!!”
ট্রাম্প কংগ্রেস সদস্যদের মৃত্যুদণ্ডের আহ্বান জানাচ্ছেন এমন ধারণা অবশ্য বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রত্যাখ্যান করেছেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট।
তিনি বলেন, “এখানে উপস্থিত অনেকেই প্রেসিডেন্টের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলতে চান, কিন্তু কী কারণে প্রেসিডেন্ট এভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হলেন, সে বিষয়ে নয়,” এবং অভিযোগ করেন যে ওই ছ’জন আইনপ্রণেতা সামরিক সদস্যদের “বৈধ আদেশ অমান্য করতে” উৎসাহ দিচ্ছেন।
ছবির উৎস, Getty Images
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে তীব্র উদ্বেগ
ট্রাম্প কি কংগ্রেস সদস্যদের ‘ফাঁসি দিতে’ চান কি না–– বৃহস্পতিবার দুপুরে হোয়াইট হাউসের এক সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি সাথে সাথে ‘না’ জবাব দেন।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের উচিত আইনপ্রণেতাদের নিজেদের মন্তব্যের ওপর মনোযোগ দেওয়া।
“তারা আক্ষরিক অর্থেই সক্রিয় দায়িত্বে থাকা ১৩ লাখ সেনাসদস্যকে বলছেন যেন তারা চেইন অব কমান্ড অমান্য করে, বৈধ আদেশ না মানে,” বলেন লেভিট।
পরে তিনি আরও বলেন, “এটি আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য হতে পারে”।
যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নেতারা জানিয়েছে, তারা ক্যাপিটল পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাম্পের পোস্টগুলোর কেন্দ্রে থাকা আইনপ্রণেতা ও তাদের পরিবারকে যথাযথ সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন।
ডেমোক্র্যাটিক হাউসের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফরিজ ট্রাম্পের মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই “কাউকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার আগেই তার সহিংস ভাষ্য প্রত্যাহার করতে হবে”।
অন্যদিকে রিপাবলিকান হাউসের স্পিকার মাইক জনসন প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করে বলেছেন, ট্রাম্প কেবল “রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করেছেন”। একইসাথে ডেমোক্র্যাটদের ভিডিওটিকে তিনি ‘অত্যন্ত অনুপযুক্ত’ এবং ‘খুব বিপজ্জনক’ বলে আখ্যায়িত করেন।
তিনি জানান, ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস বা বিচার বিভাগ ও পেন্টাগন বিষয়টি পর্যালোচনা করবে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময় এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক হামলা নিয়ে উদ্বেগ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গত অক্টোবরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন এমন সহিংসতা বাড়ছে—একই প্রবণতা প্রতিফলিত হয়েছে নভেম্বরে পলিটিকো ও পাবলিক ফার্স্ট’র এক জরিপেও।
ট্রাম্প নিজেও দুটি কথিত হত্যাচেষ্টার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন—যার একটি ছিল গত বছর তার নির্বাচনী প্রচারের সময় চলা সমাবেশে। সেখানে একজন নিহত এবং ট্রাম্পসহ উপস্থিত আরও কয়েকজন আহত হন।
এ বছর ইতোমধ্যে দেশটিতে বেশ কয়েকটি উচ্চপদস্থ ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে রক্ষণশীল মন্তব্যকার চর্লি কার্ককে হত্যা, পেনসিলভেনিয়ার ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর জশ শাপিরোর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং মিনেসোটার এক ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতা ও তার স্বামীর হত্যাকাণ্ড।
কার্কের হত্যার পর ট্রাম্পসহ বহু রক্ষণশীল ব্যক্তি ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে সরব হন এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য তাদের দায়ী করেন।
রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিন সম্প্রতি বলেছেন, কিছু নীতি প্রশ্নে ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোর পর থেকে তিনি আরও বেশি হুমকি পাচ্ছেন। গত সপ্তাহে একাধিক পোস্টে ট্রাম্প তাকে ‘উন্মাদ’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলার পর তাদের বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে।
স্থানীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনের ছেলেও মৃত্যুর হুমকি পেয়েছে।
ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের একজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও রয়েছেন, যিনি রিডিস্ট্রিকটিং বা অঙ্গরাজ্যের নতুন জেলাবিন্যাসের বিষয়ে নিজের অবস্থানের কারণে ট্রুথ সোশ্যালে প্রেসিডেন্টের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন।
