শুক্রবার সাধারণত ছুটির সকালে ঘুম থেকে উঠে আলসেমিতে কাটে নগরবাসীর। নিয়মিত রুটিনে ২১ নভেম্বর শুক্রবারের ছুটির দিনটা ছিল ভিন্ন। বেশির ভাগ মানুষ বিছানায়, না হয় সাপ্তাহিক বাজারে। ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো পুরো দেশ। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৭, উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার পাশে নরসিংদীর মাধবদীতে।

২৬ সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূমিকম্পে প্রাথমিকভাবে আতঙ্ক ছড়ায়, বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসে মানুষ। এরপর আসতে থাকে প্রাণহানি আর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য। এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে শব্দযুগল উচ্চারিত হতে থাকে তা হলো—আজকেরটা ছিল ভয়ংকর।

সকালের ভূমিকম্পে সারা দেশে অন্তত ১০ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৪, নরসিংদীতে ৫ ও নারায়ণগঞ্জে একজন নিহত হয়েছেন। মাঝারি এই ভূমিকম্পে বিভিন্ন জায়গায় ভবন হেলে পড়া, ফাটল ধরার ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘরবাড়ি ধসে এবং অন্যান্য দুর্ঘটনায় হতাহতের খবরে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।

ঘুম ভেঙে যাওয়া

সকাল ১০টায় ঘুমের মধ‍্যে ছিলেন ব‍্যাংক কর্মকর্তা আকিব আরা। হঠাৎ ঝাঁকুনি শুরু হলে জেগে ওঠেন এবং কিছু বোঝার আগেই তার চারপাশের সব কিছু নড়তে শুরু করলে চিৎকার দিয়ে বাসার অন‍্যদের ডেকে এক জায়গায় বিমের নিচে দাঁড়ান। তিনি বলেন, ‘‘ভূমিকম্পে ঘুম ভেঙে যাবে, এটা আমার ৪৫ বছরের জীবনে ঘটেনি। এবারের ভূমিকম্পের পর যে ভয় জন্মেছে, আগে কখনও এমন হয়নি। আজকেরটা ছিল ভয়ংকর।’’

লিফটে আটকানোর অভিজ্ঞতা

ভূমিকম্পের সময় হাসনাত খান বাসার লিফটে আটকে যান বাজার করে ফেরার সময়। হুট করে একটা বড় ঝাঁকি দিয়ে লিফট মনে হয় কয়েক তলা নিচে নেমে গেলো, আবার মনে হলো উঠলো। তারপর চারপাশ অন্ধকার। ৫ মিনিট পর তিনি বের হতে পেরেছেন। হাসনাত খান বলেন, ‘‘আমার বয়স ৫৬। আমরা নেপাল, জাপানের ভূমিকম্পের ভিডিও দেখেছি। কিন্তু এত বছরের জীবনে কখনও এরকম অভিজ্ঞতা হবে ভাবিনি।’’

সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়া

ভূমিকম্প অনুভব করার সঙ্গে সঙ্গে বাসা থেকে খোলা জায়গায় বের হতে বলা হয়। কিন্তু যে বাসা ছয় বা দশ তলা, বা যে এলাকায় গায়ে গায়ে লাগানো বাসা, তারা বাসা থেকে বের হয়ে খালি জায়গা পাবেন কোথায়। এসব সময় ঘরের বাইরে না গিয়ে মাথায় বালিশ দিয়ে বসে থাকার কথা বলা হয়, বিমের নিচে দাঁড়িয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। শুক্রবার বাসাবাড়ির বয়োজ‍্যেষ্ঠরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সিঁড়ি দিয়ে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে ব‍্যথা পেয়েছেন। পায়ের লিগামেন্ট জটিলতায় পড়েছেন ৬৮ বছর বয়সী হাসিনুর রহমান। তার ছেলে পরিস্থিতি বিবরণ দিতে গিয়ে জানান, যখন চারপাশে চিৎকার শুরু হয়েছে, সবাই না বুঝে দৌড়ে নিচে নামতে গেছেন। অন্য ফ্ল‍্যাটের একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে বাবা পড়ে যেতে লাগেন, সামলে নিতে গিয়ে পায়ে আঘাত পান। এখন ১৫ দিন বিছানায় থাকতে হবে।

রাস্তায় গাড়িগুলো দুলছিল

গাড়িচালক সাচ্চু তার গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছিলেন একটা আবাসিক এলাকায়। গাড়ি প্রচণ্ড ঝাঁকি দিতে থাকলে নেমে তিনি হতবাক হয়ে যান। তিনি বলেন, ‘‘চোখের সামনে বাড়িগুলো এদিক-সেদিক দুলতে থাকলো। এরকম কিছু হতে পারে আমি জীবনেও দিখেনি। কেবল সাধারণ নাগরিকেরা নয়, ঢাকার এত কাছে গত কয়েক দশকে বড় ভূমিকম্প হয়নি।’’ কয়েক জেনারেশন এরকম ভূমিকম্প দেখেনি বলছেন বিশেষজ্ঞরাও। এমনকি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকায় ঝুঁকির মাত্রা নিয়েও সারা দিন নানারকম শঙ্কার কথা বলেছেন তারা। ঘটনার পরপর পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গণমাধ‍্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘‘প্রায় ৯০ ভাগ পুরোনো ভবনে বিল্ডিং কোড না মানায় ঢাকা ও পুরান ঢাকা ভূমিকম্পের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।’’ রাজধানীর মিরপুরে আদিবাসী খাদ্য ও শস্যমেলা উদ্বোধনের পর তিনি এসব কথা বলেন।

আসলেই এবারের ভূমিকম্প বেশি ভয়াবহ ছিল কিনা প্রশ্নে দুর্যোগ ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘‘কাগজের হিসাব তা-ই বলছে। বেশির ভাগ সময় যারা বলেন ‘কখন ভূমিকম্প হয়েছিল টের পেলাম না’, এবার সেরকম বলা মানুষের সংখ‍্যা কম। এত বেশি প্রবল যে প্রত‍্যেকে টের পেয়েছেন। ধরেন, ৫.৭ মানে তো প্রায় ৬। এটা অনেক বেশি এবং স্থায়িত্ব বেশি। চোখের সামনে ঝাঁকুনি দৃশ‍্যমান হয়েছে, শোঁ শোঁ শব্দও কানে লাগছিল অনেকে বলেছেন। ফলে এটা অন‍্য যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি তো বটেই।’’





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *