অভ্রবরণ চট্টোপাধ্যায়: ‘ঠিক করেছিলাম শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ব’। ভারতের বিশ্বজয়ের পর টিভিতে বলেছিলেন রিচা ঘোষ। অনূর্ধ্ব উনিশ বিশ্বকাপ জিতেছেন। ডব্লিউপিএল জিতেছেন। কিন্তু এই বিশ্বকাপ জয়ের ব্যাপারটা একেবারে আলাদা। সেই রিচার মা-বাবা এখনও যেন ঘোরের মধ্যে রয়েছেন। কেবল রিচা নয়, গোটা দলের জন্য তাঁরা গর্বিত। অপেক্ষা করছেন ঘরের মেয়ের ঘরে ফেরার। তাঁদের যে আর তর সইছে না। মধ্যরাতে বিশ্বজয়ের পর শিলিগুড়ি ফিরলে রিচাকে তাঁর পছন্দের পদে থালা সাজিয়ে দেবেন মা। আর তাঁর বাবা জানালেন, ধাপে ধাপে সিঁড়িতে চড়েই সাফল্যে পৌঁছেছেন তিনি।
নিজে ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন রিচার বাবা মানবেন্দ্র ঘোষ। খেলেছেন জেলা স্তরেও। কিন্তু বড় ক্রিকেটার হয়ে ওঠার স্বপ্ন সফল হয়নি। সেই তিনিই রিচাকে ছোটবেলায় ক্রিকেট মাঠে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে মানবেন্দ্রবাবু সাংবাদিকদের বলেন, “আমি সব সময় বিশ্বাস করি ‘সুস্থ শরীর সুস্থ মন তৈরি করে’। এই বিশ্বাস থেকেই ওকে প্রথম মাঠে নিয়ে যাই। চাইতাম, ও সব সময় খেলাধুলার মধ্যে থাকুক। এতে ওর সুবিধা হবে। সেখান থেকেই ওর ক্রিকেটের প্রতি টান। এরপর ওকে ক্রিকেট ক্লাবে ভর্তি করি। অত্যন্ত মনোযোগী হয়ে রিচা তা গ্রহণ করল। সেই দিন থেকে আমরাও স্বপ্ন দেখতে শুরু করি যে, ও একদিন বেঙ্গল খেলবে। পরবর্তীকালে সিএবি থেকে জেলা ক্রিকেটের ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাতে আমাদের সুবিধাই হয়। ও ক্যাম্পে জয়েন করল। প্রথমে আন্তঃরাজ্য ম্যাচগুলোতে ভালো খেলে। ধীরে ধীরে বাংলা দলে সুযোগও পায়। সেখান থেকে ভারতীয় দলে ডাক আসে। পুরো জার্নিটা কিন্তু ধাপে ধাপে এগিয়েছে। এই স্বপ্নটা কিন্তু দেখতে শিখিয়েছে ওরাই।”
কেবল ভারতের হয়ে খেলাই নয়, বিশ্বজয় করেছে তাঁদের মেয়ে। আর সেই ট্রফি ছুঁয়ে দেখেছেন রিচার মা-বাবাও। কেমন সেই অনুভূতি? মানবেন্দ্রবাবুর সংযোজন, “যত সময় যাচ্ছে, এই অনুভূতিগুলির প্রভাব আরও বাড়তে শুরু করেছে। সেই মুহূর্তে আমরা তো ঘোরের মধ্যে ছিলাম।” সেই সময় মানবেন্দ্রবাবুর পাশে বসা রিচার মা স্বপ্না ঘোষের চোখে জল দেখা যায়। নিজেকে সামলে তিনি বলেন, “এই অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না। ওদের জন্য গর্ব হচ্ছে। মেয়ের ঘরে ফেরার অপেক্ষা করছি। মেয়ের পছন্দের খাবার ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, চিলি পনির, মিষ্টি। সবই ওকে খাওয়াব। তবে কবে ও ফিরবে, এই মুহূর্তে আমরা জানি না।”
বিশ্বকাপ জয়ের পর রিচা বলছিলেন, “স্বপ্নপূরণের রাত। কখনও ভাবতে পারিনি জীবনে এমন একটা রাত আসবে। তবে আত্মবিশ্বাস ছিল। পরপর যখন কয়েকটা ম্যাচে হারলাম, তখনও কেউ প্যানিক করিনি। বরং জানতাম বিশ্ব সেরা হওয়ার ক্ষমতা আমাদের টিমের রয়েছে। বহুদিন অপেক্ষা করেছি। অনেক পরিশ্রম করেছি। শেষ পর্যন্ত আমরা পেরেছি। আজ মনে হচ্ছে সবকিছু সার্থক। আমরা সারা রাত সেলিব্রেশন করেছি। গোটা দেশও আমাদের সাফল্যে আবেগে ভেসে গিয়েছে। আমরা ভারতীয় সমর্থকের কাছে কৃতজ্ঞ। ওঁরা সবাই আমাদের উপর ভরসা রেখেছিলেন।’’ ভারত যে ম্যাচই খেলুক না কেন, শেষবেলায় শিলিগুড়ির ২২ বছর বয়সি তরুণীর ব্যাটের ঝড় ছাড়া যেন ইনিংস অসম্পূর্ণ। বিশ্বকাপে তিনি মোট ২৩৫ রান করেছেন। যার মধ্যে লিগে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাঁর সর্বোচ্চ ৯৪ রান ছিল। ফাইনালে ২৪ বলে ৩৪ রান করেন। অনেকেই হয়তো জানেন না, মানবেন্দ্রবাবু অনেক সময় তাঁর মেয়ের খেলা দেখতেন না টেনশনে। তবে অধরা স্বপ্ন মেয়ে রিচার মাধ্যমে পূরণ করতে পেরেছেন তিনি। এর থেকে বড় সাফল্য যে আর হয় না।
