বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অগ্রণী ভূমিকায় দেখা গেলেও, নিজ দেশে চলমান ফেডারেল শাটডাউন থেকে উত্তরণে এখনো সফল হতে পারেননি তিনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাসের দীর্ঘতম সরকারি অচলাবস্থার কারণে দেশটির বহু বিমানবন্দরে দেখা দিয়েছে তীব্র বিশৃঙ্খলা। শাটডাউনের কারণে বেতন না পেয়ে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। আর এরই জেরে দেশজুড়ে শত শত ফ্লাইট বাতিল ও হাজারো ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)। পাশাপাশি খাদ্য নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে দেশটির লাখ লাখ সরকারি কর্মী। গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়্যার-এর তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ হাজার ৭০০টির বেশি ফ্লাইট দেরিতে ছেড়েছে এবং ২ হাজার ২৮২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এমনকি সোমবারও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শিকাগো ও’হেয়ার, ডালাস ফোর্ট ওয়ার্থ, ডেনভার ও নিউ ইয়র্কসহ বড় শহরগুলোর বিমানবন্দরে আরও ৪ হাজার ফ্লাইট দেরিতে ছাড়ে এবং ৬০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়। এফএএ জানায়, সরকারের অচলাবস্থার কারণে তাদের ৩০টি বড় বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের অর্ধেকেই জনবল ঘাটতি দেখা দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোতে অনুপস্থিতির হার পৌঁছেছে ৮০ শতাংশে। আলজাজিরা বলছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে প্রায় ১৩ হাজার বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার আছেন, যারা ‘অপরিহার্য কর্মী’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় গত ১ অক্টোবর থেকে বেতন ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এফএএ বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে এই কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিমান চলাচলের সংখ্যা কমাতে হচ্ছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, অচলাবস্থার অবসান না হলে এটিসি কর্মকর্তারা প্রাপ্য বেতন পাবেন না এবং যাত্রীদের আরও বিলম্ব ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনে বিমান চলাচল সীমিত করা হবে, যার ফলে ফ্লাইট বিলম্ব বা বাতিলও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি গত রবিবার সিবিএস নিউজকে বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্লাইট চলাচলে বিলম্ব অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, আমরা ওভারটাইম কাজ করছি যাতে সিস্টেম নিরাপদ থাকে। প্রয়োজনে ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হবে। তিনি আরও জানান, কিছু এটিসি কর্মকর্তা জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প পেশায় কাজ করছেন, তবে তাদের বরখাস্ত করা হবে না। ডাফির ভাষায়, যখন কেউ পরিবারকে খাওয়ানোর জন্য দ্বিতীয় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন আমি তাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করব না। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি শাটডাউন বা অচলাবস্থা টানা ৩৫তম দিনে গড়িয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমান শাটডাউন ২০১৮-২০১৯ সালের অচলাবস্থার সমান দীর্ঘ হয়েছে এবং এটিই দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ শাটডাউন। বর্তমান এই অচলাবস্থায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬ লাখ ৭০ হাজার বেসামরিক ফেডারেল কর্মী বাধ্যতামূলক ছুটিতে রয়েছেন এবং প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার কর্মী বেতন ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
শাটডাউনে সবচেয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ফেডারেল খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি। যদিও গত শনিবার শাটডাউনের মধ্যেও খাদ্য সহায়তা দিতে ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে রোড আইল্যান্ড ও ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের আদালত। এর ফলে চার কোটিরও বেশি মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির জরুরি তহবিল থেকে অর্থ প্রদান করতে হবে ট্রাম্প প্রশাসনকে। বাজেট নিয়ে অচলাবস্থার জেরে ৬ বছর পর শাটডাউনের কবলে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সরকারি তহবিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সিনেট বাজেটের অস্থায়ী বিল পাসে ব্যর্থ হওয়ায় গত ১ অক্টোবর থেকে অধিকাংশ সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিছু অঙ্গরাজ্য ঘাটতি পূরণে নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে, তবে সেগুলো আর ফেরত দেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেছে ফেডারেল সরকার।
তহবিল বন্ধ থাকায় বহু সরকারি সংস্থা কার্যত স্থবির। বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে ভ্রমণ, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিম্ন আয়ের মানুষ। চলতি সপ্তাহে দেশটির কৃষি বিভাগ জানায়, তহবিলের অভাবে নভেম্বর মাসে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করতে পারবে না তারা। এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানান ডেমোক্র্যাট সিনেট নেতা চাক শুমার। চাক শুমার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কখনো এমন হয়নি। ডেমোক্রেটিক বা রিপাবলিকান যে প্রেসিডেন্টই হোক কারও আমলেই শাটডাউনের অজুহাতে স্ন্যাপ তহবিল বন্ধ হয়নি। স্ন্যাপের সুবিধাভোগীরা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পান, যা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ক্রয় করতে পারেন।
