“আমার জীবনে যে সামান্য কয়েকটি ছবি করেছি সেগুলো যদি পাল্লার একদিকে রাখা হয়, আর মাস্টারি যদি আরেক দিকে রাখা হয় তবে মাস্টারিটাই ওজনে অনেক বেশি হবে।”

ঋত্বিক ঘটকের এই স্বীকারোক্তির পেছনে ছিল এক গভীর সত্য- তিনি শুধুই এক জন নির্মাতা ছিলেন না, ছিলেন এক জন শিক্ষক, যিনি সিনেমাকে বেঁচে থাকার এক মাধ্যম হিসেবে চিনেছিলেন, এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া (এফটিআইআই)–এ যোগ দেওয়ার পর তিনি পেয়েছিলেন তরুণ একদল শিক্ষার্থী। যাদের মধ্যে ছিলেন মণি কাউল, কুমার সাহানি ও কে কে মহাজনরা। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সমান্তরাল সিনেমার যে বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক ধারা গড়ে ওঠে, তার মূলেই ছিলেন এই তিনজন। আর সেই শিকড়ের নাম- ঋত্বিক ঘটক।

২০১৯ সালে ঢাকায় এসে কুমার সাহানি যখন চ্যানেল আই অনলাইনের মুখোমুখি হন, তখন প্রায় প্রতিটি কথাতেই ফিরে এসেছে তাঁর শিক্ষক ঋত্বিক ঘটকের নাম। তিনি বলেছিলেন—“ঋত্বিকদা মানুষ হিসেবে দারুণ ছিলেনতো বটেই, শিক্ষক হিসেবেও অসাধারণ। আমি এফটিআইআই-তে ভর্তি হয়েছিলাম তাঁর যোগদানের আগে, কিন্তু যখন শুনলাম তিনি আসছেন, আমি যেন এক নতুন প্রাণ ফিরে পেলাম।”

ঋত্বিক ঘটকের শিক্ষাদান কখনো প্রচলিত ক্লাসরুমের ভেতর বন্দী ছিল না। তিনি শিখিয়েছিলেন সিনেমাকে জীবনের সম্প্রসারণ হিসেবে ভাবতে, কেবল ফর্ম বা টেকনিক নয়— চিন্তার এক ধারাবাহিক বিপ্লব হিসেবে।

তিনি জানতেন, তাঁর অনেক ছাত্র হয়তো পরে সিনেমা করবে না, কিন্তু তারা শিখবে কেমন করে বাস্তবকে দেখার চোখ পাল্টে দেওয়া যায়।

সাহানির স্মৃতিতে অমলিন এক দৃশ্য আমৃত্যু ছিলো। ২০২৪ সালে সাহানি প্রয়াত হন, ২০১৯ সালে সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে সাহানি বলেছিলেন,“এক সন্ধ্যায় ঋত্বিকদা আমাকে ডেকে বলেছিলেন, ‘কুমার, সাউন্ড থিয়েটারে এসো তো, ম্যাজিকাল একটা জিনিস দেখাবো।’ সেটিই ছিল সাহানির জীবনের প্রথম সাউন্ড মিক্সিং সেশন।

“সেই রাতে আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল। শব্দ কেবল সংলাপ নয়—এটা আবেগ, আন্দোলন, ইমেজের ভেতরে আরেকটা মাত্রা যোগ করে। সেদিনই আমি বুঝেছিলাম, মিনিমাল ভিজ্যুয়াল আর মাল্টি-ডাইমেনশনাল সাউন্ডের ভিতরেই সিনেমার গভীরতা লুকিয়ে আছে।” এই এক অভিজ্ঞতা থেকে সাহানি নিজের পুরো নন্দনতত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন— যা পরবর্তীতে তার নির্মিত বিখ্যাত সিনেমা ‘মায়া দর্পণ’–এ প্রতিফলিত হয়।

অর্থাৎ শিক্ষক ঋত্বিক কেবল তথ্য দেননি, দিয়েছেন অভিজ্ঞতা, যেটা ছাত্রদের বোধ ও চেতনার ভিত নেড়ে দিয়েছিল।

ঋত্বিক ঘটক একসময় বলেছিলেন,“কাশ্মীর থেকে কেরালা, মাদ্রাজ থেকে আসাম পর্যন্ত সর্বত্র আমার ছাত্র-ছাত্রীরা আজকে ছড়িয়ে গেছে। তাদের জন্য আমি যে সামান্য অবদান রাখতে পেরেছি সেটা আমার নিজের সিনেমা বানানোর থেকেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ!’ —এই উচ্চারণ এক শিক্ষকসত্তার পরিপূর্ণতা। তাঁর জীবনের ব্যক্তিগত সংগ্রাম, একাকীত্ব, রাজনৈতিক টানাপোড়েন সবকিছুর মাঝেও তিনি বিশ্বাস করতেন- যে জিনিস তিনি দিতে পারেন তা হলো দৃষ্টিভঙ্গি।

তিনি কখনো শিক্ষার্থীদের কেবল পরিচালক বানিয়ে দিতে চাননি; তিনি চেয়েছিলেন তাদের মধ্যে একটা বিপ্লবী মন জাগিয়ে তুলতে।

আজ, জন্মশতবর্ষে যখন ঋত্বিক ঘটক আলোচনায়, তখন তাঁর নির্মিত সিনেমাগুলো নিয়ে যেমন নতুন করে আলাপ হচ্ছে, তেমনি নতুন করে আলোচনায় রাখা উচিত তাঁর শিক্ষকসত্তাও। যে মানুষটি দেশভাগের বেদনা, ইতিহাসের ক্ষত আর মানবিকতার আর্তি নিয়ে সিনেমা বানিয়েছিলেন, সেই মানুষটাই হয়তো সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন শিক্ষার মুক্তিদায়ী শক্তিতে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *