দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে পোশাক কেনা বাঙালির অন্যতম জরুরি পর্ব। মহালয়া পেরোলেই শুরু হয়ে যায় নতুন শাড়ি, জামাকাপড় বাছাই। ষষ্ঠী থেকে দশমী—প্রতিটি দিনের জন্য আলাদা পোশাক রাখার পরিকল্পনাও থাকে অনেকের। অনলাইনে কেনাকাটা বাড়লেও শাড়ি হাতে নিয়ে তার বুনন, রং, কাজ দেখে নেওয়ার আকর্ষণ এখনও কমেনি। তাই এ বার পুজোর কেনাকাটার গন্তব্য হতে পারে বাংলার তাঁতপাড়াগুলি।
শান্তিনিকেতন: কাঁথাস্টিচ থেকে বাটিক
কাঁথাস্টিচের শাড়ির জন্য শান্তিনিকেতনের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। সোনাঝুরি হাট থেকে শুরু করে বিভিন্ন দোকানে মিলবে হাতের কাজের শাড়ি, পাঞ্জাবি, স্টোল ও জ্যাকেট। কাঁথাস্টিচের পাশাপাশি বাটিক, খেস, কলমকারি এবং অ্যাপ্লিকের কাজের পোশাকও পাওয়া যায়। কাজ, কাপড় ও মান অনুযায়ী দাম কয়েকশো টাকা থেকে ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
– বিজ্ঞাপন –
কেনাকাটার পর কঙ্কালীতলা কিংবা রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন জায়গা ঘুরে নেওয়া যায়। শরতের কাশফুলে সাজা পথও এই সফরের অন্যতম আকর্ষণ। হাওড়া থেকে ট্রেনে অথবা কলকাতা থেকে সড়কপথে শান্তিনিকেতন যাওয়া যায়।
জিয়াগঞ্জ: তাঁতের শব্দের সঙ্গে সিল্কের খোঁজ
মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের তাঁতিপাড়ায় গেলে দোকানের পাশাপাশি তাঁতিদের কাজও কাছ থেকে দেখা যায়। পিওর সিল্ক, বালুচরী, মসলিন-সহ নানা ধরনের শাড়ি পাওয়া যায় এখানে। সদরঘাট থেকে টোটোয় সহজেই পৌঁছনো যায় তাঁতিপাড়ায়।
কেনাকাটার সঙ্গে জুড়ে নিতে পারেন হাজারদুয়ারি, আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ ও কাঠগোলার ঐতিহাসিক স্থাপত্য। রয়েছে জৈন মন্দির ও নানা পুরনো অট্টালিকাও। দু’দিন সময় হাতে রাখলে সফরটি আরও জমবে।
বিষ্ণুপুরে বালুচরীর সন্ধানে
টেরাকোটার মন্দিরের শহর বিষ্ণুপুর শাড়ির জন্যও সমান পরিচিত। বালুচরী, স্বর্ণচরী ও গরদ-সহ বিভিন্ন ধরনের সিল্কের শাড়ি পাওয়া যায় এখানে। চকবাজার, রঘুনাথপুর ও কৃষ্ণগঞ্জের তাঁতিদের এলাকায় গেলে শাড়ি তৈরির কাজও দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
কেনাকাটার ফাঁকে রাসমঞ্চ, জোড়বাংলা, শ্যামরাই, মদনমোহন মন্দির এবং দলমাদল কামান ঘুরে নিতে পারেন। হাওড়া থেকে ট্রেন কিংবা সড়কপথে বিষ্ণুপুর পৌঁছনো যায়।
ধনেখালি: খেজুরছড়ি পাড়ের শাড়ি
ধনেখালির তাঁতের শাড়ির পরিচয় তার বুনন ও বিশেষ নকশায়। আঁচলে ‘খেজুরছড়ি’ নকশা এখানকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মদনমোহনতলা, সোমাসপুর ও আশপাশের গ্রামগুলিতে রয়েছে বহু তাঁতিবাড়ি। সরাসরি সেখান থেকে শাড়ি কেনার পাশাপাশি তাঁত বোনার পদ্ধতিও দেখে নিতে পারেন।
কাছেই রয়েছে দশঘরার জমিদারবাড়ি। ধনেখালি ঘোরার সঙ্গে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিও সফরের তালিকায় রাখা যায়। হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনের বিভিন্ন স্টেশন থেকে বাস, টোটো বা অটোয় পৌঁছনো সম্ভব।
ফুলিয়া: টাঙ্গাইল ও শান্তিপুরের মেলবন্ধন
দেশভাগের পরে টাঙ্গাইল থেকে আসা দক্ষ তাঁতিরা ফুলিয়ায় নতুন বয়নধারার জন্ম দেন। শান্তিপুরের ঐতিহ্যের সঙ্গে টাঙ্গাইলের কারুকাজ মিশে তৈরি হয় ফুলিয়া টাঙ্গাইল শাড়ির নিজস্ব ঘরানা। এখানকার রেশম, তসর ও জামদানিরও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।
ফুলিয়ায় গিয়ে কবি কৃত্তিবাস ওঝার স্মৃতিবিজড়িত স্থান ঘুরে দেখা যায়। সময় থাকলে কাছের শান্তিপুরে রাত কাটিয়ে পরদিন শহরটিও ঘুরে নিতে পারেন। শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে ফুলিয়া যাওয়া যায়।
পুজোর শাড়ি কেনার জন্য তাই এ বার শুধু বাজার বা শপিং মলের উপর নির্ভর না করে পৌঁছে যেতে পারেন বাংলার তাঁতিদের কাছে। পছন্দের শাড়ির সঙ্গে তখন কেনাকাটার অভিজ্ঞতাটাও হয়ে উঠবে এক টুকরো শরৎ-ভ্রমণ।
