তপন মল্লিক চৌধুরী
অনেকেরই ধারণা, লোকসংগীত শিল্পী প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডের জীবনের একটি অত্যন্ত বিখ্যাত এবং রোমাঞ্চকর ঘটনা হল চিতা বা লেপার্ডের সঙ্গে লড়াই। যেহেতু প্রতিমা অসমের গৌরীপুরের রাজপরিবারের সন্তান ছিলেন এবং জঙ্গল, হাতি ও বন্যপ্রাণীর মাঝে বড় হয়েছিলেন এবং তরুণ বয়সে প্রতিমা তাঁর বাবা প্রকৃতীশ চন্দ্র বড়ুয়ার (লালজি) সঙ্গে জঙ্গলে শিকারে যেতেন, স্বভাবতই তিনি নিজেও একজন দক্ষ শিকারি এবং সাহসী নারী ছিলেন—এমন ধারণা অনেকেরই।
– বিজ্ঞাপন –
একবার জঙ্গলে একটি চিতাবাঘ হঠাৎ বাপ-বেটির ওপর আক্রমণ করলে পরিস্থিতির আকস্মিকতায় ভয় না পেয়ে প্রতিমা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে চিতাটির মুখোমুখি হন। আত্মরক্ষার্থে চিতাটিকে কাবু করতে তিনি নিজের খালি হাত এবং শারীরিক শক্তি ব্যবহার করে সেটির সঙ্গে লড়াই করেন। দু-একটি বিবরণ অনুযায়ী, চিতাটি যখন তাঁদের আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছিল, তখন প্রতিমা বা তাঁর বাবা অত্যন্ত নিখুঁত নিশানা ও সাহসিকতার সঙ্গে সেটিকে প্রতিহত করেছিলেন। এই ঘটনাটি প্রতিমার অসীম সাহস এবং বন্য পরিবেশের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগের এক অনন্য প্রমাণ। বলা বাহুল্য, এই সাহসিকতার জন্য লোকসমাজে প্রতিমার জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল।
কিন্তু বিখ্যাত গোয়ালপাড়িয়া লোকসংগীত শিল্পী প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডের জীবনের সঙ্গে বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে হাতি এবং চিতাবাঘের সঙ্গে আদৌ কোনো গভীর ও রোমাঞ্চকর সম্পর্ক ছিল কি? প্রতিমা বড়ুয়া গৌরীপুরের রাজপরিবারে জন্মেছিলেন বলেই কি চিতার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প তাঁর অনন্য ও সাহসী জীবনচরিত্রের পরিচয় দেয়?
প্রতিমা বড়ুয়া গৌরীপুরের বিখ্যাত হস্তী-বিশেষজ্ঞ ও শিকারি রাজকুমার প্রকৃতীশ চন্দ্র বড়ুয়ার কন্যা। শৈশব থেকেই রাজবাড়ির অরণ্যঘেরা পরিবেশ এবং বন্য পশুপাখির সান্নিধ্যে বড় হওয়া মানেই বন্য জীবজন্তুর মুখোমুখি হওয়ার সাহস তাঁর রক্তে ছিল—এ কথা যেমন বলা যায় না, তেমনি সংগীতজগতে ‘হস্তীর কন্যা’ হিসেবে বিপুল পরিচিতি পাওয়ার আগে তরুণ বয়সে তিনি একজন অত্যন্ত দক্ষ ও নিপুণ শিকারি ছিলেন, এ কথাও বলা যায় না। কারণ, রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি জঙ্গলে শিকারে যেতেন এবং তাঁর লক্ষ্য ছিল অব্যর্থ—এ কথা তিনি কোথাও বলেননি।
এমনকি পরবর্তীতে প্রতিমা বড়ুয়া বন্দুক ছেড়ে দোতরা হাতে তুলে নেন, পশুপাখিকে আঘাত করার চেয়ে মাহুতদের জীবন, হাতিদের ভাষা এবং মাটির গানকে ভালোবেসে তিনি লোকসংগীতের সাধনায় নিজেকে সঁপে দেন—এ কথাও তিনি কোনোদিন বলেননি। কারণ, প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডের সঙ্গে কোনো চিতার লড়াইয়ের সত্যি ঘটনা ঘটেনি।
বিজ্ঞাপন
তাহলে এই বিভ্রান্তি কী কারণে তৈরি হল?
প্রথমত, প্রতিমা বড়ুয়ার ছোট বোন পার্বতী ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা মাহুত বা ‘হস্তীকন্যা’। তিনি বন্য হাতি বশ করা, হাতিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বন-জঙ্গলে হিংস্র পশুদের মুখোমুখি হওয়ার মতো রোমাঞ্চকর কাজ করেছেন। পার্বতী বড়ুয়ার বন্যজীবনের রোমাঞ্চকর কাহিনির কারণে লোকমুখে গল্পটি প্রতিমা বড়ুয়ার নামে জড়িয়ে গিয়ে থাকতে পারে।
তাছাড়া প্রতিমা ও পার্বতী বড়ুয়ার পিসি নিহার বালা বড়ুয়া, যিনি গৌরীপুরের রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন, বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জঙ্গল এবং বাঘ শিকারের জন্য পরিচিত ছিলেন। কিন্তু চিতার সঙ্গে লড়াইয়ের যে লোককথা বা গল্প শোনা যায়, তা লোকসংগীত শিল্পী প্রতিমা বড়ুয়ার জীবনের কোনো সত্য ঘটনা নয়—এ কথা প্রতিমা বড়ুয়া আমাকে খুব জোর দিয়েই বলেছিলেন।
আসামের বিখ্যাত গোয়ালপাড়িয়া লোকসংগীত শিল্পী প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডে এবং কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের মধ্যে যে একটি গভীর ও নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সে কথাও আমি প্রতিমার মুখে শুনেছিলাম, যদিও সে কথা নানাজনে নানা ভাষায় এখনও বলে চলেছেন। তাঁদের এই প্রেম পরিণয়ের রূপ না পেলেও এটি বাংলা ও অসমিয়া সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
আসলে ঋত্বিক ঘটক তাঁর চলচ্চিত্রের কাজের প্রয়োজনে এবং লোকসংস্কৃতির প্রতি টানে অসমে যাতায়াত করতেন। সেই সূত্রেই প্রতিমা বড়ুয়ার গান এবং তাঁর সরল ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়েন ঋত্বিক। প্রতিমা বড়ুয়াও ঋত্বিক ঘটকের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিলেন। ঋত্বিক ঘটক প্রতিমা বড়ুয়াকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। তিনি সরাসরি প্রতিমার বাবা প্রকৃতীশ চন্দ্র বড়ুয়ার কাছে সেই প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিমা বড়ুয়া নিজেই এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, “ঋত্বিক ঘটক আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। বাবাকে বলেছিলেন।”
কিন্তু বিয়ে না হওয়ার কারণ কী?
ঋত্বিক ঘটকের বিয়ের প্রস্তাব প্রতিমা বড়ুয়ার বাবা প্রকৃতীশ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। রাজপরিবারের রক্ষণশীলতা এবং ঋত্বিক ঘটকের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও মদ্যপানের অভ্যাসের কারণেই প্রকৃতীশ এই বিয়েতে সম্মতি দেননি। প্রকৃতীশ ঋত্বিককে বলেছিলেন, “বিয়ে দিলে তো মেয়েকে খাওয়াতে হবে, তুমি তো নিজেই মদ খেয়ে সব উড়িয়ে দাও।”
প্রকৃতীশের অমতের কারণে তাঁদের প্রেম পূর্ণতা পায়নি। পরবর্তীতে প্রতিমা বড়ুয়ার বিয়ে হয় গঙ্গারঞ্জন পাণ্ডের সঙ্গে এবং তিনি ‘প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডে’ নামে পরিচিত হন। অন্যদিকে ঋত্বিক ঘটক বিয়ে করেন সুষমা ঘটককে। বিয়ে না হলেও তাঁদের মধ্যকার পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার টান আজীবন রয়ে গিয়েছিল।
ঋত্বিক ঘটকের সৃষ্টিশীল মননে প্রতিমা বড়ুয়ার সেই ‘মাহুত বন্ধু’ গানের সুর এবং তাঁর কণ্ঠ আজীবন এক বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছিল। ঋত্বিক তাঁর ‘বগলার বঙ্গদর্শন’ ছবিতে প্রতিমা বড়ুয়াকে দিয়ে আটটি গান গাইয়েছিলেন। ছবিটি শেষ না হওয়ায় ঋত্বিকের আফসোসের অন্ত ছিল না।
