কলকাতা: বিশ্বে জ্বালানির অভাব নেই। কিন্তু, রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে সরবরাহের পথ বন্ধ হলে তৈরি হতে পারে বড়সড় সমস্যা। বিশেষ করে এলপিজি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে কেন্দ্রের। কলকাতায় মার্চেন্টস চেম্বার অফ কমার্সের ইন্ডিয়াস এনার্জি সিকিউরিটি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে এমনই বার্তা দিলেন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী। হরমুজ প্রণালীতে সমস্যা তৈরি হলে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশ ধাক্কা খেতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিশ্বে তেলের অভাব নেই, সমস্যা কোথায়?

কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীর বক্তব্য, বিশ্বে জ্বালানির প্রকৃত ঘাটতি নেই। প্রতিদিন প্রায় ১০৪ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পাওয়া যায়। সেখানে দৈনিক ব্যবহার প্রায় ৯৪ মিলিয়ন ব্যারেল। অর্থাৎ উৎপাদন ও ব্যবহারের মধ্যে এখনও ব্যবধান রয়েছে।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হচ্ছে সরবরাহের রুট এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘিরে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে জানান পুরী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ ধাক্কা খেতে পারে। পাশাপাশি লোহিত সাগরে অস্থিরতাও জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এই ধরনের ঝুঁকি কমাতেই ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানির উৎস বাড়িয়েছে বলে জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁর দাবি, আগে ২৭টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪১।

LPG নিয়েই বেশি উদ্বেগ

তবে অপরিশোধিত তেলের তুলনায় এলপিজি সরবরাহ নিয়েই বেশি উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন হরদীপ পুরী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দেশে প্রায় ১৪ কোটি এলপিজি সংযোগ ছিল। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৩৩.৫ কোটিতে পৌঁছেছে। ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক পরিবার এখন রান্নার গ্যাসের উপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে, কাতার, আরব আমিরশাহী এবং সৌদি আরব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ এলপিজি সরবরাহকারী। হরমুজ প্রণালী ঘিরে অস্থিরতার সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগ থাকায় সংঘাতের আবহে দেশে এলপিজি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি।

দেশে বাড়ানো হয়েছে LPG উৎপাদন

পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের অভ্যন্তরে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীর। তাঁর দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, দৈনিক উৎপাদন প্রায় ৩৪ হাজার মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ৫৪ থেকে ৫৫ হাজার মেট্রিক টনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি এলএনজি-র ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে LPG-র সামগ্রিক চাহিদার উপরও কিছুটা প্রভাব পড়েছে বলে তাঁর দাবি। পুরীর বক্তব্য, বাস্তবে দেশে LPG সরবরাহ বন্ধ হয়নি। বরং রান্নার গ্যাসের ঘাটতি হতে পারে, এমন আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল।

৫২ লাখ থেকে বেড়ে ৯৪ লক্ষ সিলিন্ডারের চাহিদা!

এলপিজি নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৫২ লাখ ডোমেস্টি এলপিজি সিলিন্ডারের চাহিদা নথিভুক্ত হয়। কিন্তু LPG ঘাটতির আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ার পর সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৯৪ লাখে পৌঁছেছিল।

তেলের দাম বাড়লেও সাধারণ মানুষের উপর চাপ কমানোর চেষ্টা

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও তার পুরো প্রভাব যাতে দেশের সাধারণ মানুষের উপর না পড়ে, তার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শেষ দফায় পেট্রল ও ডিজেলের উপর লিটার প্রতি ১০ টাকা করে কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক কমানো হয়েছে। পুরীর দাবি, তেলের বিপণনকারী সংস্থাগুলির দৈনিক ক্ষতির অঙ্ক প্রায় ৫৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

‘আগামী এক সপ্তাহে কী হবে, বলা কঠিন’

বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অনিশ্চিত বলেও উল্লেখ করেছেন হরদীপ পুরী। তাঁর বক্তব্য, আগামী এক সপ্তাহ বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। সংঘর্ষবিরতি নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব সামনে এলেও সব পক্ষ রাজি না হলে তা কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়।

তবে এখনও পর্যন্ত ভারত এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ সামাল দিতে পেরেছে বলে দাবি তাঁর। ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহের অস্থিরতা থেকে দেশের সাধারণ মানুষকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী।

একইসঙ্গে তাঁর বার্তা, “প্রতিটি সংকটের মধ্যেই একটি সুযোগ থাকে।” সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার উপর জোর দেন তিনি। কারণ জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং দামের স্থিতিশীলতা, দুই-ই সাধারণ মানুষ ও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *