সুব্রত গোস্বামী
৮০ বছরের স্বাধীনতার আলোয় কিছু জীবন আজও অন্ধকারে।
– বিজ্ঞাপন –
মাসখানেক আগেই আমরা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উদ্যাপন করেছি স্বাধীনতার ৮০ বছর। চারদিকে উৎসব, আলো, আনন্দ—স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের অর্জন, আমাদের অগ্রগতি, আমাদের সাফল্যের নানা কথা। কিন্তু সেই উৎসবের আবহ কাটতে না কাটতেই দিনকয়েক আগে পুরুলিয়ার তামাখুন, পয়সাগড়া ও ধরমপুরের শবরপাড়ায় গিয়ে যেন এক অন্য ভারতবর্ষকে দেখলাম। যে ভারতবর্ষের কথা শহরের আলোয় বসে আমরা খুব কমই ভাবি।
চোখের সামনে যা দেখলাম, তা শুধু দারিদ্র্যের ছবি নয়—এ যেন স্বাধীনতার ৮০ বছর পরেও আমাদেরই কিছু সহনাগরিকের জীবনে আটকে থাকা এক নির্মম বাস্তবতা। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন—মানুষ এ ভাবেও বেঁচে থাকে!
ভাঙাচোরা ঘর, অপ্রতুল খাদ্য, অনিশ্চিত জীবিকা, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, চিকিৎসার অভাব— সবকিছুর সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই। কোথাও যেন জীবনের ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। অথচ এই মানুষগুলিও আমাদেরই মতো এই দেশের নাগরিক। তাঁদেরও স্বপ্ন আছে, তাঁদেরও সন্তান আছে, তাঁদেরও উৎসব আসে, তাঁদেরও নতুন জামা পরার ইচ্ছে হয়।
কিন্তু তাঁদের জীবনে ‘আগামীকাল’ শব্দটির নিশ্চয়তা কতটুকু?
বিজ্ঞাপন

চরম দুর্দশার ছবি আর কী হতে পারে?
এই শবর জনজাতির পিছিয়ে পড়ার ইতিহাসও দীর্ঘ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বননির্ভর জীবন থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, জমির মালিকানার অনিশ্চয়তা, চাষযোগ্য জমির অভাব, অনিয়মিত দিনমজুরি, বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা, দারিদ্র্য, শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি—সব মিলিয়ে তাঁদের জীবনে তৈরি হয়েছে বঞ্চনার এক দীর্ঘ চক্র।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক বৈষম্য এবং ঐতিহাসিক অবহেলার ভার।
একটি শিশু যখন ক্ষুধার্ত থাকে, তার হাতে বই তুলে দেওয়া কঠিন।
একটি পরিবার যখন সারাদিনের খাবারের চিন্তায় থাকে, তখন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা আরও কঠিন।
আর যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষা ও সুযোগ থেকে দূরে থাকে, তখন দারিদ্র্যই হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার।
আসন্ন পুজোর আগে এই আত্মজনদের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই আমরা গিয়েছিলাম। শিশুদের জামার মাপ নিচ্ছিলাম। ছোটো ছোটও মুখ, নিষ্পাপ চোখ, লাজুক হাসি—সবকিছুর মধ্যে কোথাও যেন আমাদের নিজেদের সন্তানদের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম।

কী নিয়ে বাঁচছে শবরদের আগামী প্রজন্ম?
কিন্তু সেই জামার মাপ নিতে নিতে মনে হচ্ছিল— আমরা কি শুধু একটি নতুন জামা দিয়ে এদের জীবনের অভাবটুকু ঢেকে দিতে পারব? পারব না।
একটি নতুন পোশাক হয়তো একদিনের আনন্দ দেবে। কিন্তু তাদের প্রয়োজন শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, জীবিকার সুযোগ, নিরাপদ বাসস্থান এবং সর্বোপরি—সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।
ফিরে আসার সময় সঙ্গে নিয়ে এলাম কয়েকটি শিশুর জামার মাপ নয়, নিয়ে এলাম একরাশ হতাশা, অসহায়ত্ব আর কিছু করতে না-পারার গভীর বেদনা। মনে হচ্ছিল, এত কিছু করার পরও যেন কিছুই করা হল না।
তবু হয়তো এই সামান্য কাজগুলিই একদিন বড়ো কোনও পরিবর্তনের শুরু হতে পারে। কারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অর্থ সব সমস্যার সমাধান একদিনে করে দেওয়া নয়। কখনও কখনও তার অর্থ শুধু এতটুকুই— “তুমি একা নও, আমরা তোমার পাশে আছি।”
এই মানুষগুলিকে দয়া নয়, দরকার অধিকার। সহানুভূতি নয়, দরকার সুযোগ। একদিনের সাহায্য নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদি পাশে থাকা।

এই জীবনগুলোকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনার সামান্য প্রয়াস।
এই অভিজ্ঞতার জন্য আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই আমার সন্তান তথা বড়ো থানার আইসি তাপস ঘোষ এবং সমাজকর্মী ভীম মাহাতোদাকে। তাঁরা পাশে না থাকলে হয়তো জীবনের এই নির্মম বাস্তবতার এত কাছাকাছি পৌঁছোতে পারতাম না, এই মানুষগুলির জীবনকে এত গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম না।
তাঁদের হাত ধরেই যেন সে দিন আমার সামনে খুলে গেল আমাদের দেশের এক অচেনা অধ্যায়—যেখানে স্বাধীনতার ৮০ বছর পরেও কিছু মানুষ আজও বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারগুলির জন্য লড়াই করে চলেছেন।
আজ তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের কাছেই প্রশ্ন করি—স্বাধীনতার আলো যদি সমাজের শেষ প্রান্তে থাকা মানুষটির ঘরটুকুতেও না পৌঁছোয়, তবে সেই আলোর পূর্ণতা কোথায়?
আমরা হয়তো সবাই মিলে খুব বড় কিছু করতে পারব না— কিন্তু একজন শিশুর হাতে বই তুলে দিতে পারি; একটি পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারি; একটি মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারি; একটি শিশুকে স্কুলে ধরে রাখতে পারি; একটি পরিবারের জীবনে সামান্য হলেও নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিতে পারি। আর সেই ছোটো ছোটো কাজগুলোই হয়তো একদিন একটি প্রজন্মের ভাগ্য বদলে দেবে।
তামাখুন, পয়সাগড়া, ধরমপুরের সেই মুখগুলি তাই বারবার মনে পড়ছে। তাঁদের জন্য, তাঁদের সন্তানদের জন্য, তাঁদের আগামী দিনের জন্য—আমাদের আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। ৮০ বছরের স্বাধীনতার আলোয় কিছু জীবন আজও অন্ধকারে। সেই অন্ধকারে একটুখানি আলো হয়ে পাশে দাঁড়ানোই হোক আমাদের আগামী দিনের অঙ্গীকার।
ছবি: প্রতিবেদক
