তপন মল্লিক চৌধুরী

বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানোর প্রধান কারণ দেবশিল্পীর কারিগরি বিদ্যা এবং তাঁর উড়ন্ত রথ বা আকাশযান নির্মাণের স্মৃতিকে সম্মান জানানো। আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোকে সেই প্রাচীন আকাশযান বা রথ নির্মাণের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। অষ্টাদশ শতকে কলকাতা-সহ আশপাশের অঞ্চলে জমিদার ও রাজপরিবারগুলির মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কালক্রমে সেটিই বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অঙ্গ হয়ে ওঠে।

– বিজ্ঞাপন –

ভাদ্রের শেষে বর্ষা বিদায় নিয়ে শরৎ এলে আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং ঘুড়ি ওড়ানোর উপযোগী অনুকূল বাতাসও বয়। বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুড়ি ওড়ানো তাই শুধু একটা খেলা নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং আবেগের এক সুন্দর মিশেল।

কিন্তু বহুতলের ভিড়ে যেভাবে আকাশ ঢাকা পড়েছে, তাতে আড়া, ছয়দশ, পেটকাঠি, চাঁদিয়াল, মোমবাতিরা কি আর নিজেদের মতো করে উড়তে পারে? স্কুলের রুটিন, সিলেবাসের চাপ, সকাল-সন্ধে টিউশন, কম্পিউটার, ক্রিকেট কোচিং, সাঁতার, জুডো-ক্যারাটে ইত্যাদির পর লাটাইয়ে গোটানো মাঞ্জা সুতোর সঙ্গে বাঁধা চৌরঙ্গী, চাপরাসরা যে চেত্তা খেতে খেতে উড়ে যাবে, তার অবকাশ কোথায়!

তাই এখন আর ঢিলা-ভলকা-টাইট-খিঁচ-গদ্দা—এসব প্যাচে ভোকাট্টা খেলা হয় না। টাংকিবাহার কিংবা লাটাইগোরির চলও লুপ্ত হয়ে গিয়েছে।

আগেকার সেইসব মাঞ্জাবিদও আর নেই, যাঁরা আবহাওয়া বুঝে শান দেওয়া মাঞ্জার প্রেসক্রিপশন দেবেন। উত্তর বা মধ্য কলকাতার ছাদে ঘুড়িয়ালদের মস্তানিও আর দেখা যায় না। উন্মাদনা একেবারেই ঝিমিয়ে পড়েছে। নেই মূল বা ধুতি বাঁশ থেকে বানানো বুক ও কাঁধকাঠির তৈরি আধা, সোয়া, একতের রমরমাও।

বিজ্ঞাপন

তবে আকাশে যে ঘুড়ি ওড়ে না, তা-ও নয়। দু’-চারখানা গোত্তা খায়, চিনে মাঞ্জার সুতোর সঙ্গে বাঁধা বেরঙিন ঘুড়ি, বেসুরো ভোকাট্টা ধ্বনি…।

ঘুড়ির জন্মকথা

এই ঘুড়ি প্রথম উড়েছিল চিনের আকাশে, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে। চৈনিক দার্শনিক মোজি বা মোদি এবং লুবাংবা গংশুমানের সময়ে। ভীষণ ঝড়ে গাছের পাতা উড়তে উড়তে বহুদূর পর্যন্ত চলে যাচ্ছে—এমন একটি দৃশ্য দেখেই নাকি তাঁদের মাথায় ঘুড়ির কল্পনা এসেছিল।

এরপর যেসব ঘুড়ি আকাশে ওড়ানোর চেষ্টা করা হয়, সেগুলিই ছিল গাছের বিভিন্ন আকারের পাতার আদলে। এর অনেক পরে আসে কাগজের ঘুড়ি। মোটামুটিভাবে কাগজের ঘুড়ির প্রচলন হয় আনুমানিক ৫৪৯ খ্রিস্টাব্দে।

ঘুড়ির জন্মকথা নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা গল্পকথা প্রচলিত আছে। তবে প্রাচীন ও মধ্যযুগে চিনে ঘুড়ি ওড়ানো হত দূরত্ব পরিমাপ করতে, বাতাসের গতিপ্রকৃতি আন্দাজ করতে, সংকেত আদান-প্রদান এবং সামরিক কার্যকলাপে যোগাযোগ রক্ষা করতে। আরও কয়েকটি দেশে ঘুড়ি ওড়ানো হত বিপদসংকেত জানাতে কিংবা বন্দি মুক্তির মতো বার্তা পাঠাতেও।

এমন কথাও ইতিহাসে পাওয়া যায় যে, শত্রুশিবিরের দূরত্ব আন্দাজ করতে হান রাজবংশের রাজত্বকালে হিউয়েন সাং নিজেই ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন। সেই সময়কার চিনের ঘুড়িগুলি ছিল আড়াআড়ি, আকৃতিগতভাবে আয়তক্ষেত্রাকার এবং তাতে একটি লম্বা লেজ থাকতই।

পরবর্তীকালে ঘুড়ির সেই লেজ যেমন খসে পড়ে, তেমনই আয়তক্ষেত্রাকার আকৃতিরও বেশ খানিকটা পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে চিনের ঘুড়িগুলিতে পৌরাণিক দেবদেবী, ধর্মীয় নানা সংকেত, অঙ্কন, অলংকরণ ইত্যাদির ছবি লক্ষ্য করা যায়। বেশ কিছু ঘুড়িতে আবার এমন একটি জিনিস আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া হত, যাতে বাতাস লাগলে সেটি বাঁশির মতো বাজত।

ঘুড়ি শুধু খেলা নয়

পৃথিবীর প্রায় সব দেশের আকাশেই ঘুড়ি ওড়ে। তবে এশিয়ার দেশগুলিতে এর চল বেশি। নানা রঙের ঘুড়ি যেমন দেশ-বিদেশের আকাশে ওড়ে, তেমনই সেইসব ঘুড়িকে ঘিরে রয়েছে প্রচুর বিশ্বাস ও রীতি-নীতি।

যেমন, থাইল্যান্ডের মানুষ ঘুড়ি উড়িয়ে আরাধ্য দেবতার কাছে প্রার্থনা জানায়, যাতে সময়মতো বৃষ্টি হয় এবং ফসল ভাল হয়। কোরিয়ায় কোনও পরিবারে শিশু জন্মগ্রহণ করলে সেই পরিবার থেকে ঘুড়ি উড়িয়ে সুতো কেটে দেওয়া হয়। বিশ্বাস, ঘুড়িটি উড়তে উড়তে যত দূরে চলে যাবে, ততই শিশুটির জীবনের অশুভ দূর হয়ে যাবে। এরকম বিশ্বাস প্রায় সব দেশেই রয়েছে।

এ দেশে কবে, কোথায় প্রথম ঘুড়ি উড়েছিল, তা সঠিক করে বলা মুশকিল। রাজা-বাদশা-আমির-ওমরাহদের জমানায় যেমন ঘুড়ি উড়ত, তেমনই চল ছিল নবাবি আমলেও। গল্পকথায় মেলে, মাথার টুপি হাওয়ায় উড়ে যেতে দেখেই ঘুড়ি ওড়ানোর ভাবনা এসেছিল।

পণ্ডিতদের মতে, ১৫৫২ সালের ভারতীয় সাহিত্যে ঘুড়ির সমার্থক একটি শব্দ ‘পতঙ্গ’-এর উল্লেখ রয়েছে। এমনকি প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে ‘মাঞ্জা’ শব্দটিরও উল্লেখ মেলে। তবে সেটি অন্যের ঘুড়ি ভোকাট্টা করার জন্য সুতোকে যেভাবে ধারালো করা হয়, সেই মাঞ্জাই কি না, তার উত্তর পাওয়া যায় না।

ঘুড়ির সঙ্গে যুদ্ধ ও বিজ্ঞান

পৃথিবীতে মানুষের সমাজ ও সংস্কৃতির বিবর্তনের মতো ঘুড়িরও বিবর্তন হয়েছে। ভারতবর্ষে আসা দুই চৈনিক পরিব্রাজক ফা হিয়েন এবং হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় মেলে যে, ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হূণ সাম্রাজ্যের সেনাপতি হানসিন প্রায় হাজার দুয়েক লণ্ঠন জ্বালানো কাঠের ঘুড়ি শত্রুপক্ষের আকাশ দিয়ে উড়িয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

পরবর্তীকালে ঘুড়ি হয়ে ওঠে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষারও অন্যতম মাধ্যম। বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার উইলসন ঘুড়ির গায়ে থার্মোমিটার লাগিয়ে বিভিন্ন উচ্চতার তাপমাত্রা পরীক্ষা করেছিলেন। এর ঠিক পরের বছরই বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে প্রমাণ করে ফেলেন, বজ্রপাত এক ধরনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ।

লরেন্স হারগ্রেভ যে বক্স কাইটের পরিকল্পনা করেছিলেন, বলা যায় সেখান থেকেই রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এরোপ্লেনের ভাবনা পেয়েছিলেন। আকাশে ওড়া ঘুড়ির হাত ধরেই একে একে এসেছে হ্যাং-গ্লাইডিং, কাইট এরিয়াল ফোটোগ্রাফি, কাইট সার্ফিং, কাইট ল্যান্ডবোর্ডিং-এর মতো নানা আধুনিক প্রয়োগ।

তবু আজকের বহুতল-ঢাকা শহুরে আকাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা থেকেই যায়—পেটকাঠি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, চাপরাসরা কি সত্যিই আকাশ থেকে বেপাত্তা হয়ে যাচ্ছে?



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *