পুরসভা ও খাদ্য দফতরের অভিযানে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, ভেজাল খাবারের স্থায়ী সমাধান কোথায়? সাময়িক পুলিশি অভিযান, নামমাত্র জরিমানা, বা লাইসেন্স বাতিল করে কি সত্যিই এই সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব? সুজনকুমার দাস

​উৎসবের মরশুম দোরগোড়ায়। দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে যখন চারিদিকে সাজো-সাজো রব, ঠিক সেই সময়েই শহর থেকে জেলা—সর্বত্র রেস্তোরাঁ ও শপিং মলের ফুড কোর্টে হানা দিয়ে পুরসভা ও খাদ্য দফতর যে-ছবি তুলে এনেছে, তা আক্ষরিক অর্থেই শিউরে ওঠার মতো। কোথাও ফ্রিজে মজুত ছত্রাক ধরা পচা মাংস, কোথাও-বা মেয়াদ-উত্তীর্ণ রাসায়নিক মেশানো খাবার। ২০১৮ সালের কুখ্যাত ‘ভাগাড় কাণ্ড’-র স্মৃতি উসকে দিয়ে সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণ করছে যে, জনস্বাস্থ্য নিয়ে অসাধু কারবারিদের ছিনিমিনি খেলা বিন্দুমাত্র বন্ধ হয়নি।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এর স্থায়ী সমাধান কোথায়? সাময়িক পুলিশি অভিযান, নামমাত্র জরিমানা বা লাইসেন্স বাতিল করে কি সত্যিই এই সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব? অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, এই ধরনের অপরাধ নিছক আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা ব্যবসায়িক দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি বাজার ব্যবস্থার এক গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতা বা ‘মার্কেট ফেলিওর’। তাই এর স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে অর্থনীতিরই নিয়মে– এমন একটি সুপরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে, যেখানে পচা খাবার বিক্রির চেয়ে টাটকা খাবার বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের কাছে আর্থিকভাবে বেশি লাভজনক হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন:

​অর্থনীতির পরিভাষায় এই সমস্যার মূল কারণ হল– ‘ইনফরমেশন অ্যাসিমেট্রি’ বা ‘তথ্যগত অসাম্য’। একজন ক্রেতা যখন রেস্তোরাঁয় সুসজ্জিত টেবিলে বসে, তখন রান্নাঘরের ভেতরের অবস্থা বা ব্যবহৃত কাঁচামালের মান সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র ধারণা থাকে না। বিক্রেতা ঠিক এই অজ্ঞতারই সুযোগ নেন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জর্জ অ্যাকার্লফ তাঁর বিখ্যাত ‘মার্কেট ফর লেমন্‌স’ তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, ক্রেতারা যখন ‘ভাল’ এবং ‘খারাপ’ মানের পণ্যের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না, তখন বাজারে ‘খারাপ’ মানের পণ্যই রাজত্ব করে। কারণ, যে সৎ ব্যবসায়ী টাটকা এবং ভাল মানের কাঁচামাল ব্যবহার করছে, তার উৎপাদন-খরচ বেশি। কিন্তু ক্রেতা যেহেতু ভাল-খারাপের তফাত বুঝতে পারছে না, তাই বেশি দাম দিতেও রাজি হয় না। ফলে সৎ ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে ছিটকে যায়, বা প্রতিযোগিতায় টিকতে বাধ্য হয়ে মান নামিয়ে আনে। ​এই দুষ্টচক্র ভাঙতে গেলে ক্রেতার কাছে রেস্তোরাঁর গুণগত মান স্পষ্ট করতে হবে, যাকে অর্থনীতিতে বলা হয় ‘সিগনালিং’। খাদ্য সুরক্ষা দফতরকে প্রতিটি রেস্তোরাঁর জন্য একটি বাধ্যতামূলক ‘হাইজিন রেটিং’ (যেমন– A, B, C) চালু করতে হবে, যা মেনু কার্ড এবং প্রবেশদ্বারে দৃশ্যমান থাকবে। যে রেস্তোরাঁ ‘A’ গ্রেড পাবে, ক্রেতারা নির্দ্বিধায় সেখানে যাবে এবং গুণমানের জন্য কিছুটা বেশি দাম বা ‘প্রিমিয়াম’ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না।

নজরদারি ব্যবস্থায় গতি আনতে রান্নাঘরের কর্মীদের জন্য ‘হুইসলব্লোয়ার নীতি’ বা গোপন তথ্যদাতার সুরক্ষা নীতি চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ, কোনও কর্মী যদি পরিচয় গোপন রেখে পচা খাবার রান্নার প্রমাণ প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়, তবে তাকে আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করা হবে।

​তবে এখানেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ থেকে যায়। একবার ‘এ’ রেটিং পেয়ে যাওয়ার পর, রেস্তোরাঁগুলো যে সেই মান দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখবে, তার নিশ্চয়তা কী? ‘রেটিং’ পাওয়ার পর মান নামিয়ে দিয়ে মুনাফা বাড়ানোর এই প্রবণতাকে অর্থনীতিতে বলা হয় ‘মোরাল হ্যাজার্ড’। এই ঝুঁকি এড়াতে রেটিং ব্যবস্থাকে একটি স্থির শংসাপত্রের বদলে চলমান নজরদারির আওতায় আনতে হবে। রেটিং কখনওই আজীবন মেয়াদের হওয়া উচিত নয়। সর্বাধিক ৩ থেকে ৬ মাস অন্তর পুনর্মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সরকারি পরিদর্শকদের অতর্কিত অভিযান বা ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ চালু রাখতে হবে। এছাড়াও, বিলে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে ক্রেতাদের সরাসরি অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখতে হবে।

এছাড়াও নজরদারি ব্যবস্থায় গতি আনতে রান্নাঘরের কর্মীদের জন্য ‘হুইসলব্লোয়ার নীতি’ বা গোপন তথ্যদাতার সুরক্ষা নীতি চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ, কোনও কর্মী যদি পরিচয় গোপন রেখে পচা খাবার রান্নার প্রমাণ প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়, তবে তাকে আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করা হবে। মালিক যখন বুঝবে যে তার নিজের কর্মীরাই প্রশাসনের চোখ ও কান, তখন তিনি আর দুর্নীতি করার সাহস পাবে না। এই নজরদারির ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলির রেগুলেটরি মডেল আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের ‘ফুড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সি’ অত্যন্ত সফলভাবে ‘নেম অ্যান্ড শেম’ বা নাম করে লজ্জিত করার নীতি প্রয়োগ করে। সেখানে পরিদর্শনের পর রেস্তোরাঁগুলোকে ‘০ থেকে ৫’-এর মধ্যে রেটিং দেওয়া হয় এবং ওয়েলসের মতো জায়গায় সেই রেটিং স্টিকার রেস্তোরাঁর সদর দরজায় লাগানো আইনত বাধ্যতামূলক। ক্রেতারা ঢোকার আগেই রেটিং দেখতে পায় বলে খারাপ রেটিং পাওয়া রেস্তোরাঁগুলোর ব্যবসায় ধস নামে। ফলে মালিকরা বাধ্য হয়ে ৫ রেটিং ধরে রাখার চেষ্টা করে।

অন্যদিকে, আমেরিকার নিউ ইয়র্ক বা লস অ্যাঞ্জেলসের মতো শহরে রেস্তোরাঁর মান নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কড়া ‘লেটার গ্রেডিং’ ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নিউ ইয়র্ক শহরে স্বাস্থ্য দফতরের সমস্ত পরিদর্শনের রিপোর্ট ইন্টারনেটে উন্মুক্ত বা ‘ওপেন ডেটা’ হিসাবে রাখা হয়। যে কোনও ক্রেতা অ্যাপের মাধ্যমে দেখতে পারে যে, ওই রেস্তোরাঁয় ঠিক কী কারণে ‘গ্রেড’ কাটা গিয়েছে। স্বচ্ছতার এই মডেল অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য এক বিরাট আতঙ্ক। ​নজরদারির ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের মডেলটিও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে ট্রাফিক আইন ভাঙলে যেমন পয়েন্ট কাটা যায়, রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রেও একই ‘ডিমেরিট পয়েন্টস’ সিস্টেম ব্যবহৃত হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বেশি পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স সাসপেন্ড বা বাতিল হয়ে যায়।

কোনও আইনি বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ সফল হবে না, যদি-না বাজারের মূল চালিকাশক্তি– অর্থাৎ, ক্রেতা নিজে– সচেতন হয়। ক্রেতা-সচেতনতাই বাজারের সবচেয়ে বড় নজরদারি ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষকে তাদের ‘ভোক্তা অধিকার’ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হবে।

নজরদারির পাশাপাশি জরিমানার দিকটিও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা প্রয়োজন। অসাধু ব্যবসায়ীরা পচা বা মেয়াদ-উত্তীর্ণ কাঁচামাল ব্যবহার করে যে বিপুল অঙ্কের মুনাফা করে, ধরা পড়লে জরিমানার অঙ্ক তার তুলনায় নিতান্তই সামান্য। অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকারের ‘অপরাধের অর্থনীতি’ তত্ত্ব অনুযায়ী, অপরাধের সম্ভাব্য খরচের চেয়ে সম্ভাব্য লাভ বেশি হলে অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। তাই প্রথাগত ৫ বা ১০ হাজার টাকার জরিমানার বদলে ‘রাজস্ব-ভিত্তিক জরিমানা’ বা টার্নওভারের উপর ভিত্তি করে আর্থিক দণ্ড চালু করতে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসার আর্থিক ঝুঁকি নেওয়ার সাহস ব্যবসায়ীরা চিরতরে হারিয়ে ফেলে। আধুনিক যুগে ফুড ডেলিভারি অ্যাপগুলি রেস্তোরাঁ ব্যবসার এক বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার যদি আইন করে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমের সঙ্গে সরকারি হাইজিন রেটিং এবং রিয়েল-টাইম ক্রেতা ফিডব্যাক যুক্ত করে দেয়, তবে অভাবনীয় ফল মিলবে। মান খারাপ হলে অ্যালগরিদম স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেস্তোরাঁকে পিছনের সারিতে ঠেলে দেবে, যার ফলে ব্যবসায়ীরা অনলাইনের বিশাল ক্রেতাবাজার নিমেষে হারিয়ে ফেলবে।

সবশেষে, কোনও আইনি বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ সফল হবে না, যদি-না বাজারের মূল চালিকাশক্তি– অর্থাৎ, ক্রেতা নিজে– সচেতন হয়। ক্রেতা-সচেতনতাই বাজারের সবচেয়ে বড় নজরদারি ব্যবস্থা। সাধারণ মানুষকে তাদের ‘ভোক্তা অধিকার’ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হবে। রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাবারের মান নিয়ে সন্দেহ হলে প্রশ্ন করার সাহস, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে জানার আগ্রহ এবং প্রয়োজনে সরকারি হেল্পলাইন বা পোর্টালে নির্ভয়ে অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। ক্রেতারা যদি নিজেদের অধিকার বুঝে নিয়ে নিম্নমানের খাবার বর্জন করতে শুরু করে, তবে চাহিদার দিক থেকে এমন এক প্রবল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে, যা অসাধু ব্যবসায়ীদের বাজার থেকে মুছে ফেলতে বাধ্য করবে।

ক্রেতার সতর্কতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধই হতে পারে এই ‘মার্কেট ফেলিওর’ ঠেকানোর সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। ​খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু পুলিশের লাঠি বা স্বাস্থ্য আধিকারিকের নোটিশ দিয়ে সম্ভব নয়। যে সমস্যা জন্ম নিয়েছে অতি-মুনাফার লোভ থেকে, তার মোকাবিলা করতে হবে অর্থনীতির মোক্ষম অস্ত্র দিয়েই। ক্রেতা-সচেতনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মানের রেগুলেটরি মডেল এবং কঠোর অর্থনৈতিক জরিমানার মেলবন্ধনে এমন একটি বাজার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সততাই হবে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায়িক কৌশল। তবেই রেস্তোরাঁর প্লেট থেকে এই বিষ অনেকটাই দূর করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *