নয়াদিল্লি: নির্বাচনে কার্যত নামমাত্র অংশগ্রহণ। অথচ এক বছরে অনুদান বাবদ আয় প্রায় ১,৭০০.৭৮ কোটি টাকা। গুজরাতভিত্তিক ছ’টি নিবন্ধিত কিন্তু অচেনা রাজনৈতিক দলের আয় ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে বিবিসি হিন্দির একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে অবশ্য স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ওই দলগুলির বিরুদ্ধে কোনও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হচ্ছে না। তবে বিপুল অনুদান এবং নির্বাচনী কার্যকলাপের মধ্যে যে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এই ছ’টি দলের মোট অনুদান পাঁচটি জাতীয় রাজনৈতিক দল—বিজেপি বাদে কংগ্রেস, সিপিএম, আম আদমি পার্টি, বিএসপি এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টি—মিলিত আয়ের থেকেও প্রায় ২০০ কোটি টাকা বেশি। ওই পাঁচ জাতীয় দলের মোট আয় ছিল ১,৪৮০.৪৩ কোটি টাকা।
– বিজ্ঞাপন –
বিবিসির অনুসন্ধান অনুযায়ী, গুজরাতের এই ছ’টি দল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মিলিয়ে মাত্র ১৫ জন প্রার্থী দিয়েছিল। সেখানে বিজেপি বাদে ওই পাঁচ জাতীয় দল মিলিয়ে প্রার্থী দিয়েছিল ৮৯৩ জন।
শীর্ষে আম জনমত পার্টি
সবচেয়ে বেশি অনুদান পেয়েছে আম জনমত পার্টি। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে দলটির অনুদান বাবদ আয় ৬২০ কোটি টাকা। আগের অর্থবর্ষে যা ছিল ২১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটি মাত্র এক জন প্রার্থী দিয়েছিল।
২০২০ সালে পটনায় অনামিকা পাসওয়ানের নেতৃত্বে দলটির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। পরে দলটির সদর দফতর গুজরাতে স্থানান্তরিত হয় বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনামিকা পাসওয়ান বর্তমানে বিজেপির বিহার ইউনিটের সহ-সভাপতি। বিবিসিকে তিনি জানিয়েছেন, দলটি আহমেদাবাদে চলে যাওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করেন।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় স্থানে সত্যবাদী রক্ষক পার্টি
অনুদান পাওয়ার নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে গুজরাতের আনন্দে অবস্থিত সত্যবাদী রক্ষক পার্টি। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে দলটি ৩৩০.৫৫ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া দলের অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রায় ৮.৪৮ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল। আরও প্রায় ৩১৬ কোটি টাকা সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। এই দলও লোকসভা নির্বাচনে মাত্র একজন প্রার্থী দিয়েছিল।
বাকি চারটি দলের মধ্যে স্বতন্ত্রতা অভিব্যক্তি পার্টি পেয়েছে ২১৯.৬৯ কোটি টাকা, নিউ ইন্ডিয়া ইউনাইটেড পার্টি ২০০.৬৯ কোটি, ভারতীয় ন্যাশনাল জনতা দল ১৯১.৬১ কোটি এবং গরিব কল্যাণ পার্টি ১৩৮ কোটি টাকা।
অধিকাংশ দলই কার্যত নিষ্ক্রিয়?
বিবিসির অনুসন্ধানে ওই দলগুলির বেশিরভাগ অফিস বন্ধ পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অনেক পদাধিকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি, আবার কেউ কেউ মন্তব্য করতে চাননি।
এমন পরিস্থিতিই বিপুল অনুদান এবং সীমিত নির্বাচনী কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (ADR)-এর আগের রিপোর্টেও এই ধরনের দলের আয় বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছিল।
ADR-এর ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাঁচটি গুজরাতভিত্তিক নিবন্ধিত অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত আয় ছিল প্রায় ২,৩১৬ কোটি টাকা। ওই দলগুলি দুইটি লোকসভা নির্বাচন এবং একটি বিধানসভা নির্বাচনে মিলিয়ে মাত্র ১৭ জন প্রার্থী দিয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল।
দেশে প্রায় ২,৮০০টি নিবন্ধিত অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশ নিজেদের আর্থিক হিসাব প্রকাশ করেনি বলেও ADR-এর রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল।
‘এই অর্থ কোথায় খরচ হচ্ছে’, প্রশ্ন বিরোধীদের
বিপুল অনুদান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের লোকসভা সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রশ্ন, যে দলগুলির কোনও সাংসদ বা বিধায়ক নেই, তারা এত বিপুল অর্থ কোথায় খরচ করছে?
আরজেডির রাজ্যসভা সাংসদ ও জাতীয় মুখপাত্র মনোজ কুমার ঝাও বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বিষয়টি শুধু আয়কর দফতর, ইডি বা সিবিআইয়ের তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
তবে এই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াগুলি মূলত প্রশ্ন ও অভিযোগের আকারে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ছ’টি দলের বিরুদ্ধে আর্থিক অপরাধের কোনও প্রমাণ বিবিসির প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
আগেই সতর্ক করেছিল আয়কর দফতর
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় প্রত্যক্ষ কর পর্ষদ (CBDT) নিবন্ধিত অথচ অজানা রাজনৈতিক দল এবং কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভুয়ো আয়কর রিফান্ডের দাবির বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছিল।
CBDT-র বক্তব্য ছিল, তদন্তে এমন কিছু RUPP-এর সন্ধান মিলেছে যেগুলি কার্যত নিষ্ক্রিয়, নিজেদের ঠিকানায় পরিচালিত হয় না বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নয়। তাদের মাধ্যমে অর্থ ঘোরানো, হাওয়ালা লেনদেন, সীমান্তপারের অর্থ পাঠানো এবং অনুদানের ভুয়ো রসিদ দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথাও জানিয়েছিল CBDT।
তবে গুজরাতের ওই ছ’টি দলের বিরুদ্ধে CBDT-র ওই অভিযোগ সরাসরি প্রযোজ্য—এমন দাবি এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে করা হয়নি। ফলে বিপুল অনুদান, সীমিত নির্বাচনী উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক দলের আর্থিক স্বচ্ছতা—এই তিনটি বিষয়ই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
