পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-কে ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে উঠে এল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। রাজ্যের ১৯টি বিশেষ আপিল ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া প্রায় ৩৮ লক্ষ আপিলের মধ্যে মাত্র ৭ লক্ষ আপিল এসেছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের তরফে। বাকি প্রায় ৩১ লক্ষ আপিলই ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে করা হয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর SIR-সংক্রান্ত আপিলের সংখ্যা ও প্রকৃতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চাইল শীর্ষ আদালত।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এই তথ্য পেশ করেন সিনিয়র আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন এবং আইনজীবী-অন-রেকর্ড নেহা রাঠি। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনা।
– বিজ্ঞাপন –
কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ SIR সেলের চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ বসের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে শঙ্করনারায়ণন জানান, কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরীর করা RTI-এর জবাবে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর এই তথ্য জানিয়েছে।
আদালতে জানানো হয়, ৩৮ লক্ষ আপিলের মধ্যে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮২ হাজারের নিষ্পত্তি হয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার, অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ ক্ষেত্রে ভোটার তালিকায় নাম পুনর্বহালের পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
শঙ্করনারায়ণনের বক্তব্য, ট্রাইব্যুনালগুলিতে বিপুল সংখ্যক আপিল জমে থাকায় নাম বাদ পড়া ভোটারদের আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর দাবি, SIR-এর পরে নাম বাদ যাওয়া প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ আগের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। কলকাতা ও হাওড়ার পুরভোট ডিসেম্বরে হওয়ার কথা থাকায়, দ্রুত ব্যবস্থা না হলে সেখানেও তাঁদের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
কী তথ্য চাইল সুপ্রিম কোর্ট?
বিজ্ঞাপন
নির্বাচন কমিশনের হয়ে সওয়াল করা সিনিয়র আইনজীবী ডি. শেষাদ্রি নাইডুকে ট্রাইব্যুনালগুলির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বর্তমানে ট্রাইব্যুনালগুলিতে কতগুলি আপিল বিচারাধীন রয়েছে।
- কতগুলি আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং সেই আপিলগুলির ধরন ও চাওয়া প্রতিকারের বিস্তারিত তথ্য।
- ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আপিলের পৃথক হিসাব।
- কতগুলি আপিল মঞ্জুর হয়েছে এবং তার ভিত্তিতে ভোটার তালিকার তথ্য সংশোধনে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে।
- দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, তৃণমূলের কয়েকজন নেতার হয়ে সওয়াল করা সিনিয়র আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থীদের জয়ের ব্যবধান তাঁদের নিকটতম তৃণমূল প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় SIR-এ বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম।
তবে এই দাবির ভিত্তিতে নতুন করে নির্বাচন করার নির্দেশ দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি জানতে চান, ওই ৩১টি কেন্দ্রে নির্বাচনী মামলা দায়ের করা হয়েছে কি না। জবাবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কয়েকটি ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ করা হয়েছে।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, কোনও কেন্দ্রে জয়ের ব্যবধান এবং বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, যখন ওই কেন্দ্রগুলিতে SIR-এ নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আপিলের তথ্য সামনে আসবে।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় উদাহরণ দিয়ে জানান, মুর্শিদাবাদের একটি কেন্দ্রে ২৭ হাজারেরও বেশি নাম বাদ পড়েছে, অথচ সেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ১৫ হাজার ভোট। তাঁর অভিযোগ, নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এই বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অন্য একটি কেন্দ্রে প্রায় ৭,৮০০ জনের নাম বাদ পড়লেও জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৩৬৫ ভোট।
এই প্রসঙ্গে বেঞ্চ জানায়, ওই ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন আপিলগুলির তথ্যও খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি, SIR-সংক্রান্ত আপিলগুলি দ্রুত নিষ্পত্তির পক্ষে মত দেয় আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, পরবর্তী নির্বাচন, বিশেষ করে পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের অনেক আগেই সমস্ত বিষয় নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
ফলে এখন নজর থাকবে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বিস্তারিত রিপোর্ট এবং ১৯টি বিশেষ আপিল ট্রাইব্যুনালে SIR-সংক্রান্ত আবেদনের প্রকৃত চিত্রের দিকে।
