ইলিশ বঙ্গোপসাগর থেকে গঙ্গা নদীপথ হয়ে বারাণসী, প্রয়াগরাজ এবং তারও দূরবর্তী অঞ্চলে পরিযায়ী হিসেবে যাতায়াত করত। তবে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ফলে তাদের এই পরিযায়ী পথ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলে গঙ্গার মধ্য ও উজানের অংশে ইলিশের সংখ্যায় ব্যাপক ধস নামে এবং জীবিকার জন্য এই মাছের উপর নির্ভরশীল নদী-তীরবর্তী জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কয়েক দশক ধরে গঙ্গার মধ্য ও উজানের অংশে ইলিশের দেখা না মিললেও সম্প্রতি সেখানে এই মাছের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। একে নদী পুনরুদ্ধার এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ICAR-CIFRI)-এর তথ্য অনুযায়ী, উজানের অংশ থেকে এই প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাওয়ার প্রায় তিন দশক পর উত্তরপ্রদেশের চান্দৌলি জেলার মার্কণ্ডেয় মহাদেব মন্দিরের কাছে মোট ৭৪০ গ্রাম ওজনের দুটি ইলিশ পাওয়া গেছে।

ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ফলে তাদের এই পরিযায়ী পথ মারাত্মকভাবে ব্যাহত

ইলিশ বঙ্গোপসাগর থেকে গঙ্গা নদীপথ হয়ে বারাণসী, প্রয়াগরাজ এবং তারও দূরবর্তী অঞ্চলে পরিযায়ী হিসেবে যাতায়াত করত। তবে ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ফলে তাদের এই পরিযায়ী পথ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলে গঙ্গার মধ্য ও উজানের অংশে ইলিশের সংখ্যায় ব্যাপক ধস নামে এবং জীবিকার জন্য এই মাছের উপর নির্ভরশীল নদী-তীরবর্তী জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইলিশের পরিবেশগত, পুষ্টিগত, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে, ব্যারাকপুরের ICAR-CIFRI এবং ‘ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা’ (NMCG) যৌথভাবে এই প্রজাতিটিকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি হাতে নেয়।

প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ICAR-CIFRI একটি সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন করেছে। এই কৌশলের অন্তর্ভুক্ত ছিল—নদীতে মাছের পোনা ছাড়া (রিভার র‍্যাঞ্চিং), মৎস্য-ভাণ্ডার বৃদ্ধি, কৃত্রিম প্রজনন, নিষিক্ত ডিম ও হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনা অবমুক্তকরণ, ট্যাগিং (শনাক্তকরণ চিহ্ন লাগানো), অবমুক্তকরণের পরবর্তী পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণ।

৩ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি কমবয়সি ও পূর্ণবয়স্ক ইলিশ ছাড়া হয়

ফারাক্কা ব্যারাজের উজানের দিকে ৩ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি কমবয়সি ও পূর্ণবয়স্ক ইলিশ ছাড়া হয়। পাশাপাশি, ৪০ লাখেরও বেশি নিষিক্ত ডিম এবং প্রায় ৯ লাখ ৪০ হাজার হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনা (যাদের বয়স দুই থেকে ছয় দিনের মধ্যে) সেখানে ছাড়া হয়। ট্যাগিং এবং সুশৃঙ্খল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মাছের পরিযান, বেঁচে থাকার হার এবং চলাচলের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরিচালিত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে ইলিশগুলো উজানের দিকে মির্জাপুর পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা এই প্রজাতির ঐতিহাসিক বিচরণক্ষেত্র ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।

পরিযায়ী ও সংবেদনশীল প্রজাতি হিসেবে ইলিশের উপস্থিতি নদীর সংযোগ এবং বাসস্থানের উপযুক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত নির্দেশক। প্রতিষ্ঠানটি ইলিশের এই ফিরে আসাকে গঙ্গার পরিবেশগত কার্যকারিতা বা বাস্তুতান্ত্রিক অবস্থার উন্নতির লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ICAR-CIFRI-NMCG-এর এই যৌথ উদ্যোগ—যা মৎস্যবিজ্ঞান, নদী সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম এবং জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে একসূত্রে গেঁথেছে—তা প্রমাণ করে যে ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা, প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার এবং সহযোগিতামূলক সরকারি নীতির মাধ্যমে কী অর্জন করা সম্ভব। ইলিশের ফিরে আসা অন্যান্য দেশীয় ও পরিযায়ী জলজ প্রজাতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে আশার সঞ্চার করেছে। একই সঙ্গে এটি এই নীতিকেই জোরাল করে যে, নদীকে কেবল জল ব্যবস্থাপনার মাধ্যম হিসেবে না দেখে বরং একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবেই পরিচালনা করা উচিত।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *